জলশ্যাওলার বিরহকথা
জলশ্যাওলার বিরহকথা
দীপংকর রায়
৪র্থ পর্ব
যেহেতু এই দেশ, এই মাটি পথিকের কাছে একেবারে রোজকার জল-ভাতের মতো, এর সমস্ত প্রকৃতি পাঠ যেমন তার কাছে ' জল পড়ে পাতা নড়ে '- র মতন কণ্ঠস্থ, ঠিক তেমনই এর উলটো পিঠে বাস করে জয়ের পরিবার। তবু এখন কিছুটা প্রচার ব্যবস্থার দৌলতে, তথাকথিত শিল্প সংস্কৃতির আনা নেওয়ায় সেই দুঃসময়ের গল্পগুলি কিছুটা হয়তো ফিকে হয়েছে, তবু জয়ের এদেশে আসা নিয়ে যথেষ্ট উদাসীন ছিল না তার বাবা-মা বা পরিবারের লোকজন। অনেক কষ্টে জয়ের বাবা-মাকেও বুঝিয়েছিল মুনাই। এবং নিয়ে এসেছিল তাকে। বাকি স্বপ্নের গল্পগুলো পথিকই বলেছিল জয়কে নিভৃতে তার টয়োটা গাড়িতে বসে বসে।
দু’হাজার দুই বা তিনের এরকমই একটি অঘ্রাণ-কার্তিকের দুপুরে তারা সকলে মিলে বেরিয়েছিল সাগরদাঁড়ি। গাড়ি ভাড়া করা হয়েছিল এদেশের টয়োটা , এরা যাকে বলে মাইক্রো। আসন সংখ্যা সর্বমোট আট। ড্রাইভারের পাশের আসনটি বাদ দিয়ে আরো দুটি আসন থাকে ভাঁজ করা। সে, তার তিন শ্যালিকা, এক শ্যালক এবং এই গতি মাসিকে নিয়ে মোটমাট তারা তিন দল। এই মিলে কয়েক হাজারে গাড়ি ভাড়া মিটমাট করে শ্বশুর বাড়ির শালা-শালিদের নিয়ে এই এত বছরের মধ্যে এই প্রথম বেড়াতে বেরিয়েছিল সে। পথের মাঝে জয় এতটাই আন্তরিক হয়ে গেল সকলের কাছে যা দেখে কিছুটা সংশয় জেগেছিল। কিন্তু ঘটনা তাইই, পরদিন গতির মুখেই প্রথম জানতে পারলো যে জয়কে তার ভীষণ ভালো লেগেছে। এবং এই বিষয় নিয়ে ইতিমধ্যে তাদের মধ্যে একটা ভাব বিনিময়ও হয়ে গেছে। পথিক তার ভাগ্নেকে সমস্তটাই খুলে বললো। জয়ের সঙ্গেও একাকী কথা হল এই বিষয় নিয়ে তার। তবে যতটা আবেগ গতির মধ্যে ছিল, জয়ের আবেগে কোথায় যেন একটা ফাঁক দেখতে পেয়েছিল সে। যেমন থাকলে এমন এমন কথা শোনা যায়, ' বিয়েটা আমার হাতের মধ্যে সবটুকু নেই মামা। এর অনেকটাই বাবা মায়ের উপরে….. ' এরকমের বেশ কিছু কথা।
তার খুব খারাপ লেগেছিল। মনে মনে বলেছিল, তাহলে এত নাচতে চাইছ কেন বাবা? এখানে তোমার সেই খনিকের খেলাধুলোর নাচ-গান চলবে না যেন, এরা ওসব বন্ধু টন্ধু বোঝে না। বোঝে বন্ধু মানে বিয়ে। প্রেম? তার মানেও বিয়ে। ওসব কলকাতা, নাকি হলিউড স্টাইল? ওসব এখানে চলবে না।
তবু প্রতিদিন সন্ধ্যায় গানের আসর বসেছে। খাওয়া-দাওয়া, আদর-আপ্যায়ন সবই---- । লুকিয়ে-চুরিয়ে ভাব বিনিময়, অশ্রুপাত, তাও। উপহার সামগ্রী দেওয়া-নেওয়াও হয়ে গেছে। তখন পথিককে ভীষণ চিন্তিত মনে হয়েছে, সে যেন একাকী বলেছে বিড়বিড়িয়ে, এরা তো মনে মনে ভীষণ কষ্ট পাবে একদিন ! বেশি করে কষ্ট হয়েছিল সেদিন গতির জন্যেই। জয় তো ভুলে যাবে। কলকাতার পথে চলতে চলতে একদিন ভুলেই যাবে সবই।
এ পর্বের সমাপ্তি নামতে আরো অনেক ঘটনা--- গতি যেমন হাব-ভাবে, কায়দায় আরো গভীর আকর্ষণ তৈরি করবার চেষ্টা করে চলেছে, জয়ও তেমন কোনোটাই ভুলছে, কোনোটায় আবার ক্ষেপে যাচ্ছে , এদের রীতি-রেওয়াজ আদপ-কায়দার ধরণ দেখে।
গতি ইতিমধ্যে তার ক'জন পছন্দের ছেলেপেলে নিয়ে এসে একটা বিপরীত প্রতিক্রিয়া তৈরি করবার চেষ্টাও করেছে। তার মধ্যে একজন তার তবলচী। একদিন ঘটা করে স্থানীয় মন্দিরে সকলে মিলে বেড়াতে যাবে বলেও ভ্যানে চড়ে বসল। সেদিন জয়কে সাজিয়ে দিল গতির দিদি।
পথিক কোথাও গেছিল। যাবার আগে কথা দিয়ে গেছিল ঠিক সময়েই এসে পৌঁছবে। সে ঠিক তাদের বেরোবার পূর্বমূহূর্তেই পৌঁছেছিল। কিন্তু যদিও ততক্ষণে এরা ভ্যানে চড়ে বসেছে। বেশি দূরে না তো, তাই হাঁটা পথেই সে যাবে বলে এদের ছেড়ে দিয়েছিল। কিন্তু মুনাই, সে কোথায়? সে আস্তে আস্তে কেন একা হয়ে যাচ্ছে আরো ? এ রহস্যের হিসাব যেন পাবার নেই। এত বন্ধুত্বের মধ্যে এই গরমিল কোথায় ? পথিক এদের দু'জনের কাউকেই জিজ্ঞাসা করেনি কিছু, মনে মনে ভেবেছে, ঠিক আছে, যে যেভাবে যেমন থাকতে চায় থাক না ; মুনাই আছে মাছধরা নিয়ে। বাড়ির কচিকাঁচাদের সঙ্গে নিয়ে ।যদিও এই এড়িয়ে যাওয়া হয়তো অন্যকিছু, একথা পথিকের কাছেও ধরা দেয়নি তেমন করে খুব একটা। জয়ের এই আপ্লুত হবার পেছনের পটভূমিতে সম্ভবত এমন কিছু ঘটনা আছে যা সেই জানে, এবং সে জন্যই সে যখনই একা হয়েছে তখনই এই কথাটাই বলেছে, পদ্ধতিটা এবারে না হয় পাল্টা। সব জায়গায় একই কায়দা প্রয়োগ করিস না!
এই ঘটনা বা এই পর্বের শেষ নামার আগে সে পথিকের সঙ্গে এমন ভাবে মিশে গেছে, এমনই সে অনুভূতি পর্বগুলি , এই যেমন, মামা কি সিগারেট খাবে, কী পছন্দ করে, মামা কোথায় গেলে একটু একা একা, নিভৃতে, এলোমেলো বাতাস লাগাতে পারে গায়, লাগানো যায় ধানগাছের হাওয়া, লাগানো যায় খোলাপথের নির্মল বাতাস, নদীর পাড়ে, বাঁশবনের ছাওয়া, তার বাল্যভূমির পথে পথে, নবগঙ্গার বাঁকে বাঁকে , নদীর কোনো এক পাড়ের ধারে নৌকা নিয়ে গিয়ে চুপচাপ বসে থাকা, খেয়া ঘাটে নিভৃত একটি দুপুরবেলায় টোঙকরা চায়ের দোকানে বসে দু'জনে দুটি সিগারেট ধরিয়ে আপন মনে বসে থেকে যখন পথিক ভাবে হয়তো, এই দুপুরবেলার এমন অধরা এপার ওপারের এই রূপটি এ জীবনে এমনভাবে কেন হারালাম? এতটাই কি প্রয়োজন ছিল এদেশ থেকে চলে যাওয়ার? কই , এখনো তো এদেশে দুকোটির উপরে হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষজন রয়ে গেছে, তারা তো বেঁচে আছে নাকি? তাহলে তাকে চলে যেতে হল কেনই বা?
পথিকের এই জায়গাগুলো নিয়ে একাকীত্বের শূন্যস্থানের খোঁজটা সে এই ক'দিনে পেয়ে গেছিল। আর সেই আগুনে সে হাওয়া দিয়ে তাকে ঝিমুতে সাহায্য করে। যদিও পথিকের এইসব অনুভবের সহজ সত্যে কঠিন আলোড়নের উপর্যুপরি তত্বে, পরিসংখ্যানে, সামাজিক গড়িষ্টতা ভাগে, দ্বিজাতিতত্বের গোড়ার কথায়, ব্রিটিশ উপনিবেশের গভীর চক্রান্তের ক্ষমতা, লড়াই নিয়ে কোন্ বনে কত বাঘ ছিল, কেন তারা মহারাজার আদেশ শিরোধার্য করে দল বেঁধে দেশান্তরিত হলো, এসব কথায় সে যে সত্য উপলব্ধি করে, সে কথা সে কাউকে বলে অশান্তি বাড়াতে চায় না। তবে সে এটা খুব গভীর ভাবেই জানে বা বোঝে এই ক্ষোভ খুব একটা সহজ ভাবে আসেনি। এসেছে নানা উৎকন্ঠায় ,আবেগে, দারিদ্রে , একে অন্যের অধিকার বোধ থেকে, ক্ষমতার লড়াই-এ। তাই, কেন চলে যেতে হলো এ প্রশ্ন আজ আর ভালোলাগে না। যেতে হলো, এবং একভাবে থাকাটার অনুভব আর আজকের অনুভব, তার প্রকৃত চিত্রটা, এসব আর এক করে দেখতে ইচ্ছা করে না। আজকের ভালোবাসা, ফিরে আসার কথায় সে সত্যের কিছুরই স্বাভাবিক উত্তর সে মেলাতে চায়ও না। যা হয়তো মিলবে, তার অনেকটাই হয়তো এককেন্দ্রিক, না হলে কেন্দ্র ছাড়া ! বৃত্তচ্যুত অন্য রেখায় এলোমেলো পথ সেসব। যা সে দেখলো, যা সে সাতচল্লিশে দেখতে পায়নি। অথচ স্বাধীনতা মানে যে স্বাধীনতা কাম্য ছিল, তা তো এরাও পাইনি ! ভারতবর্ষ কি পেয়েছিল? পেয়েছিল কি এই ভূখণ্ডের একটি মানুষও টুকরো করে তার মাতৃভূমি ? তাই, এখন যখন সে তার বাল্যভূমির পথে পথে ঘোরে, তাকে জন্মভূমি বলবার তার কোনো অধিকার নেই। সে তার জন্মভূমি নয়, বাল্যভূমি। তার কৈশোর, তার যৌবনের এক একটি অধ্যায় জুড়ে অগাধ ভাবাবেগে, প্রেমে, যে সব ঘটনা পরম্পরা লেগে আছে, তা ওই ঝুমকো-জবা বনে, পথের ধারে অবহেলায় মোড়া আঁশটেল বনে, ধুলো ওড়া পথের ধারে সে যে কি মধুর সংগীত শোনায় ; দেখায়, শিমুলে, পলাশে , ছাতিম গাছে , কদমফুলের সমারোহে যে প্রেম জাগায় আজও তাকে সে নষ্ট করতে চায় না। তাকে সে প্রতিবছর এমনভাবে স্বার্থপরের মতন দু'হাত জোড় করে গণ্ডুষে পান করতে চায় বুক ভরে।
কিন্তু যে প্রেমের হাতছানিতে জয় তুমি মজতে চাইছো তা তো তুমি গ্রহণ করতে পারবে না ! সে মাটি এ মাটির চারাতে, অঙ্কুরে, বীজে অন্য সারের প্রয়োজন। সে সতেজতা নিভৃতে ঝরে যাবে যখন, যা তুমি একবার হলেও ভাবছ, এই হঠাৎ মুগ্ধতায় ,পরবাসে !
হ্যাঁ, পরবাস বললাম এই জন্যে, এটি আজ আর তোমার সঙ্গে মিশবে না। যে বাবা তোমার বাঙাল কথায় সদা সর্বদা সংসার আলো করেন, তাকে সেও এখন নিজের করে নিতে পারবে না। যখন দেখবে তোমার টয়োটা গাড়ি, কোটি কোটি টাকার ব্যবসায়, তার নানান ধরনের আভিজাত্যের অহঙ্কারে কখন সিঁদুরের রঙ আর শুধুই লাল নেই, তা গোলাপী, পাটকেল রঙে কোন্ আঁধারে জটিল হয়ে বসে রয়েছে। হয়তো সে কথার প্রকৃত সত্য খুব সচেতন ভাবে তোমার বাবাও জানেন না।
এ পর্ব থেকে ফিরে আসার সময় সে যে কি নাটকীয়তা, সে যে কি মুগ্ধতায় চোখে জল চলে আসা, সে সব কথা ভাবার আগে মনে পড়ে যায় গতির হাতে বানানো পানের একটি ঠোঙা বোঝাই হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলে পথিক তুমি জয়ের দিকে। বলেছিলে, 'গতির উপহার , নাও ধরো….। '
সে পান সমস্তটা পথ নানান সময়ের কথা বললো তার দাঁতে-- জিভে--- মুখের ভেতর ঢোক চাপতে চাপতে ; বললো, এতগুলি দিনের কথা নানা অবসর পর্বে। কিন্তু একথা বললো না একবারটিও, জয় তুমি এরই মাঝে আর এক মায়া চাদর বিছিয়ে রেখে এসেছ যে, আর তারই প্রকাশ ঘটলো ফিরে আসার দু'দিন পরে।
আজও সেই এলবাম বলছে সে সব পর্বের নানা কথা ---- সাগরদাঁড়ির পথে, শিলাইদহের পথে, নলডাঙার নিভৃত কোনো এক কোনে, তুমি যে আরো এক পালা রচনা করে এসেছিলে ; আসলে এ তোমার বেলা। তুমি যত পারো গায়ে এইসব রোদ্দুর মেখে নাও
ফিরে আসার দু'দিন পরে জয়ের মা তার কাছে প্রস্তাব রাখলো, গতি নয়, তার দিদির মেয়ে শ্রাবণীকে তাদের পছন্দ। অর্থাৎ যে পথিকের শ্যালিকা। অর্থাৎ গতির মেজদির যে সম্পর্ক ধরে পথিকের এই আত্মীয়তা। যে সূত্রে শ্রাবণী গতির মাসি।
ক্ষোভে, দুঃখে, অভিমানে অত্যন্ত জটিল এই সম্পর্কের প্রস্তাব শুনে বেশ উঁচু গলায় সে এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করল। কিন্তু করে কি হবে, বাস্তবতা তাকে নানা হিসাব বোঝাতে লাগলো। বললো, জয়ের মতো ছেলে হাতছাড়া করে কী করবে, তার মতো সামর্থ্যবান ছেলে তোমায় সম্পর্কের বাঁধনে বাঁধতে চাইছে, আর তুমি কিনা চেঁচামেচি করছো ? ভেবে দ্যাখো একটুখানি। পরিবার পরিজনেরাও বোঝালো, এমনকি সাথিও এ প্রস্তাবে সমর্থন জানালো !
হবু আত্মীয়তা পর্বের সেইসব উপঢৌকন তোমার পেটের ভেতর হুড়পাড় করতে লাগলো। কেন না, সে কথা তুমি ছাড়া আর কে জানে ভালো করে ?
গতির স্বপ্ন আকাঙ্ক্ষা যখন আপন মনে টয়োটা গাড়ির সাউণ্ড- বক্সে বেজে চলেছে । বাজছে গতির উপহার দেওয়া রেজয়ানা চৌধুরীর গলায় গাওয়া তার পছন্দের গানগুলি ---- রবীন্দ্রসঙ্গীতের মূর্ছনায় আউটট্রাম ঘাটের পাশ দিয়ে, গঙ্গার ধারে টয়োটা গাড়ি চালাতে চালাতে জয় তুমি শুনেছো না বার কয়েক, শুনিয়েছো না তোমার মোচ ঝুলে পড়া বাবাকে? বলোনি, বলেছো, 'এ গানগুলি কেমন শুনতে বলো তো বাপি ? '
কালিচরণ বলেছিল,' এ কার গলা? '
তুমি দুটি নামই বলেছিলে। একটি নাম শোনার সঙ্গে সঙ্গে কালিচরণের গোঁপের নিচের ঠোঁটটি একটু উঁচুতে উঠে নাকের মাথা ছুঁয়েছিল যেন, কারণ তারও পছন্দে গতি নয় যে, শ্রাবণী!
কিন্তু সে পছন্দই বা বাস্তবের মাটি ছুঁলো কই ?
সে পর্বেরও শেষ নামলো যেভাবে, যে নাটকীয় কায়দায়, জয় তুমি নিজেই বলো না সে সব !
জহুরীর চোখ সদাই খোঁজে খাঁটি সোনা ! কোন্ সোনায় কতটা খাদ আছে তা সেই জানে। জানে আরো অনেক কিছু। যেমন জানে, কে তার পায়ের কাছে কুঁই কুঁই করবে। সেসব তার থেকে আর কেউ ভালো জানে না। তাই সে পর্বেও কারো কিছুই করার থাকে না। তুমি কাটিয়ে দিলে জ্যোতিষীর দোহাই দিয়ে, এ সম্পর্কে মিল নেই বলে।
এবার শ্রাবণী কাঁদলো ।
কান্নার সরণী বেয়ে এরপর উঠে এল এবারে যে, তার ঘর-ভরা রূপ দেখে অন্য কোনো কথা মনে রাখতে পারল না জয়।
পথিক জয়ের বিবাহের আগেই কলকাতা ছাড়ল। কিন্তু কেন? সে কথা কেউ জানতে চাইল না। মনুষ্যত্বের নানান পর্যায়, নানা পর্বগুলি দেখে দেখে এক এক সময় তার নিজের সঙ্গে নিজেরই কথা বলতে মন চায় না। তখন সে একেবারেই একলা পথের পথিক একজন। এবং খানিক এলোমেলো। তালশূন্য । পরিকল্পনাবিহীন হাঁটতে থাকে ফাঁকা পথে একা একা।
জয় অর্থাৎ জয়দ্বিপ, মুনাই ,গতি, গতিদের বাড়ি, সুধীর ডাক্তার, গোয়ো, সমীর মামা। তাদের বাড়ির প্রকৃতি, রবীন্দ্রনাথের গান, সবকিছুর মধ্যে জয়দ্বিপ ?
জয় পারল না। পারল না শ্রাবণী। সাগরদাড়ির পথ, কপতাক্ষে মুনাই-এর চিৎকার করে 'কপতাক্ষ নদ ' কবিতাটি পাঠ করা ; মধু কবির বংশধর, যার সঙ্গে পথিকের এক আত্মীয়ের বিবাহ হয়েছে, তাকে খুঁজে বের করা, তার সঙ্গে একের পর এক ছবি তোলা, শ্যালিকা বেষ্টিত পথিক, শ্রাবণীর অন্তরঙ্গ সংলাপ। গলা জরিয়ে ধরে কেমেরা বন্দী হওয়া থেকে শুরু করে পথের মাঝে হঠাৎ দাঁড়িয়ে যাওয়া, ছবি তোলা একলা পথিক, ধান গাছ জড়িয়ে ধরে মুনাই ও জয়। এসব গল্প এখন স্মৃতি হয়ে গেছে। স্মৃতি হয়ে গেছে ঢাকার পথ। জয়দ্বিপের বাবার মামাতো ভাই-এর সদরঘাটের বাড়ি। সাগর কলা দিয়ে আপ্যায়ন। সদরঘাট ঘুরিয়ে দেখানোর জন্য শুখনো নেমতন্য, এবং জয়ের এড়িয়ে যাওয়া। সে দেখলো, তার বাড়ির সামনে দাঁড়িয়েছে বলে ট্রাক বোঝাই ধনেপাতার গাড়ি, তাই তাকে ধমক দিয়ে, একবোঝা ধনেপাতা নিয়ে নেওয়া, জয় সে সংলাপ মুখস্তও করে রেখেছিল ক'দিন ধরে বেশ, মাঝে মাঝেই আওড়াতো, ' এই, কি হইত্যাছে কী….. দেহি, কেমন ধুন্নেফাতা , দ্যাও দেহিনি …….' তারপরে তার পুরুষালী চেহারার ডাক্তার মেয়ের অস্ট্রেলিয়াবাসি জামাই-এর টেলিফোনে সংলাপ বিনিময় যা শুনে জয়দ্বিপের বেশ খানিকটা ঘৃনা জন্মালো। সে সব সব পেছনের , অনেক পেছনের কথা। প্রথম পদ্মা দর্শনে উভয়ের যে চাঞ্চল্য, সে সব, যেসব ছবিতে ধরা আছে , তাকে কী করে ভুলবে এরা ? বারবারই সেসব কথা বিনিময় হয় আজও।
কুড়িদিনের বাংলাদেশ ভ্রমণ। কতো ঘটনার ঘনঘটায় জীবন যে কীভাবে ভরে ওঠে, মানুষ তার কল্পনায় তাকে হঠাৎ হঠাৎ কত রূপেই না রাঙিয়ে তোলে, তারপর তাকে হঠাৎ একদিন কালের চক্র তারই পথে নিয়ে যায়, যেখানে শুধু স্মৃতিই পড়ে থাকে, একটি ছেড়ে যাওয়া সাপের খোলোসের মতো । একদিন ফিরে এসে সেই পথে সেই মানুষগুলি যদি তাকিয়ে থাকে সময়ের সেই সরীসৃপের ফেলে যাওয়া শুখনো খোলোসের দিকে, তাহলে কি চিনতে পারবে, এটা কোন সাপের খোলস?
চলবে...
আমরাও যেন নিবিড় এক ভ্রমণের ভিতর বিচরণ করলাম। আত্মীয়তার বন্ধন দৃঢ় হল।
উত্তরমুছুন