প্রথম বর্ষ ।। অষ্টম ওয়েব সংস্করণ ।। ৭ অগ্ৰহায়ণ ১৪২৭



     

             উৎসর্গ: কবি অলোক রঞ্জন দাসগুপ্ত



                                ছবি : সন্দীপ কুমার


১৮ ই নভেম্বর:২০২০


দুর্গা দত্ত


হরিণ টিলা-য়
একা একা উড়ে গেল বুধুয়ার পাখি ...

দূরে দূরে হাওয়ায় হাওয়ায়
ছুঁয়ে গেল অলৌকিক
ভাদরিয়া ঝুমুরের বোল

দেশজ বৈষ্ণব মৃদু করতালে
সহজিয়া সুরে
সাঁওতাল পাড়ায় আর শান্ত রিখিয়ায়
ধরিত্রীর নীবিবন্ধে
চরাচরে আনাচে কানাচে
গান ধরে চিরজীবিতের --

বোল ওঠে আকাশ সীমায়

----------------------------------------
*হরিণ টিলা -- জার্মানির হাইডেলবার্গ শহর সংলগ্ন হির্শবার্গ -- এর অলোকরঞ্জনকৃত বাংলা নামকরণ ।



কথাবার্তা-১


মধুপর্ণা কর্মকার


আমাদের সমাজের দিকে যদি তাকাই তাহলে দেখতে পাব মেয়েদের স্বাধীন জীবন যাপনে পিতৃতন্ত্রের বেজায় আপত্তি। জীবন যাপন, চালচলন, পােশাক আশাক, রুচি অভ্যাস সবই করতে হবে" নিয়ম মতে"। আসলে এই নিয়মের সূত্রগুলাে যদি খােলার চেষ্টা করি তাহলে আমরা দেখতে পাব মেয়েদের কাছ থেকে সমাজ যা চায়, তা হল পরিষেবা। তাই তাকে বেঁধে রাখতে হবে কঠিন শাসনে। পুরুষের ইচ্ছা, প্রয়ােজন মেটানাের জন্য তাকে বানিয়ে নেবে সমাজ, আর শিখিয়ে নেবে তার নিয়মাবলি। তার শারীরিক ও মানসিক শ্রমকে কাজে লাগিয়ে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ পােক্ত করবে তার ভীত। তাকে ব্যবহার করবে নিজেদের ইচ্ছে মত। তাই তাকে ব্যক্তি মানুষ হতে দিলে চলবে না। পূর্ণ মানুষ হিসাবে তাকে সমাজে চলা ফেরা করতে দেবে না। শুধু হিসাব কষে রাখা আছে তার কাছ থেকে কি পেতে পারে পিতৃতান্ত্রিক সমাজ। সেই হিসাবের পান থেকে চুন খসলে কি হতে পারে তা আমরা দেখছি সমাজের যত্রতত্র। 
               এখন প্রশ্ন হল সমাজের অর্ধেক অংশকে এইভাবে অবদমন করে রেখে কি ধরনের মােক্ষলাভ হচ্ছে। পিতৃতান্ত্রিক সমাজ পালিশ করে নিচ্ছে তার অহং । জন্মসুত্রে তারা সমাজের কাছে যে ক্ষমতার ছাড়পত্র পেয়েছে তাতে তারা শান দিয়ে নিতে পারছে। আর সমাজ তাতে পিছিয়ে পড়বে তা অবধারিত। নারী বিদ্বেষ , নারীর প্রতি বৈষম্য এক ধরনের যুক্তিহীনতা যা আমাদের সমাজ কাঠামাের রন্ধ্রে রন্ধ্রে রয়েছে। এই অন্ধত্ব, অযৌক্তিকতার চর্চা আমাদের সমাজে চলছে যে সমাজ যে সংস্কৃতি নিয়ে আমাদের গর্ব। সেই গর্বে খানিকটা যুক্তি থাকলে বােধ হয় ভাল হত। সেখানে একটি মাত্র স্বরের আধিপত্য আর সেই স্বরকেই যুক্তি বলে ঘােষণা করার মধ্যে দৈন্য আছে, সমৃদ্ধি নেই।নারীকে ব্যক্তি ভাবা , তার প্রতি ব্যবহারে বদল আনা, সমাজে সংস্কারে বদল আনার পর সমাজ-সংস্কৃতি নিয়ে না হয় গর্ব করা যাবে, ততদিন মুলতুবি থাক। সমাজের সব স্তরের নারীকে উপযুক্ত শিক্ষা, বাঁচার রসদ দেওয়া হােক যাতে তার নিজের ইচ্ছা, অনুভূতি, স্বাতন্ত্র তৈরী হয়। যখন তারা অন্যের ইচ্ছায়, অন্যের চাপিয়ে দেওয়া ইচ্ছায় দাগ বােলাতে নারাজ হবে, অকপটে নির্ভয়ে তখন তারা নিজেদের ব্যক্তি মানুষ হিসাবে চিনবে। সেদিন না হয় সমাজ নিয়ে সংস্কৃতি নিয়ে গর্ব করা যাবে। অবদমনকে ভিত্তি করে যে ইমারতই গড়া হােক তার উচ্চতা, ঔজ্বল্য মােহিত করতেই পারে কিন্তু জেনে রাখা ভাল তার স্থায়িত্ব বেশি দিন নয়। ধীরে হােক, খুব নীরবে হােক, একটি প্রক্রিয়া চলতে থাকে যা এই ভিত্তিকে নাড়িয়ে দেবে।নারীকে নির্ভয়ে প্রশ্ন করতে দাও, নির্ভয়ে বাতিল করতে দাও যা কিছু তার অপছন্দ, বেছে নিতে দাও যা কিছু তার ইচ্ছায় সে লালন করে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চাপা পড়ে থাকা আত্মবিশ্বাসের পুনােরােদ্ধার হােক। অন্য কোথাও থেকে ধার করে নয়, নিজের ভিতর থেকে শক্তি উৎপাদন করে তাকে আত্মস্থ হতে হবে। যদিও এই প্রক্রিয়ার পুরুষতান্ত্রিক সমাজের ভূমিকা শুধু ভয়ংকর পাথরগুলাে যা তারা এতদিন চাপিয়ে রেখেছিল সেইগুলাে তার উপর থেকে নামিয়ে নেওয়া। বাকি উজ্জীবনের কাজ তারা নিজেরাই করবে। 
               নারীকে এটা দাও সেটা দাও বলছি বটে কিন্তু মনে হয় এই বয়ানের খানিকটা বদল প্রয়ােজন। তােমরা বরং নিজেদের মাথায় ঢুকিয়ে নাও যে কি কি ব্যবহার নারীর সংগে করা যাবে না, যায় না। কারণ সে নারী বলে নয়। তােমাদের মস্তিস্কে যুক্তি থাকাটাও দরকার। অযৌক্তিক কাজ করা যায় না বলে নারীর ওপর থেকে অবদমন সরিয়ে নিতে হবে। পিতৃতান্ত্রিক সমাজকে শিক্ষিত যুক্তিশীল হতে হবে যাতে তার গা থেকে "পিতৃতান্ত্রিক" শব্দটা খসে পড়ে। ক্ষমতা আছে বলে এই শব্দটা মানুষজন সমীহ করে চলে, আসলে এই কাঠামাের ভিত্তি হল অশিক্ষা, যুক্তিহীনতা আর অসংবেদনশীলতা। এই তিনটি একত্রিত হয়ে পিতৃতান্ত্রিক সমাজের তথাকথিত মহিমার নির্মাণ। তাই অযথা সমীহ করার কোন কারণ তাে দেখি না। বরং যুক্তি দিয়ে সংবেদনশীলতা দিয়ে সংস্কার করার প্রয়ােজন আছে বলেই মনে হয়। প্রশ্ন চারিদিকে, প্রশ্নের ক্যাকোফনি বিস্তর। প্রশ্নের নির্দিষ্ট অভিমুখ প্রয়ােজন। পিতৃতন্ত্রকে প্রশ্ন করা হােক, জবাব নেই সে কথা সবাই জানে। প্রশ্ন তাকে নিজেকে বদলে ফেলার জন্য। পিতৃতন্ত্রের ফাঁকা অহং এর প্রকণ্ঠে প্রতিধ্বনি হয়ে ঘুরে বেড়াক প্রশ্ন গুলাে। উত্তর খোঁজা বৃথা। এই ক্রমাগত প্রশ্ন করতে করতে এর ভিতর থেকে ভিন্ন পরিসর তৈরি হবে আশা করা যায়।



__________________________________

বাঁদনা পরবের গান
__________________________________

তপন পাত্র


আমাদের দেশে ঠিক কবে গো-বন্দনা শুরু হয়েছিল, তা সঠিকভাবে বলা বড়ো মুশকিল , তবে একথা সত্যি যে গরু পরম কল্যাণকারী বলেই মানুষ তাকে দেবতারূপে পূজা করতে শুরু করে এবং এখনো করছে । যতদূর সম্ভব কৃষিজীবী সমাজের পক্ষে গো-জাতি বিশেষ উপযোগী বলেই তার ওপর দেবত্ব আরোপিত হয়েছে । পশ্চিম-সীমান্ত-বাংলায় কার্তিক মাসের অমাবস্যা তিথি গো-বন্দনার তিথি রূপে চিহ্নিত হয়ে আছে । অমাবস্যার রাতে ধমসা-মাদল বাজিয়ে গান গেয়ে গোরুকে অভিনন্দন জানানো হয় । এই গানই "অহিরা গান" স্থানভেদে "আহিরা গান" আবার "বাঁধনা পরবের গান" নামেও পরিচিত । আর গো-বন্দনাকারীদের বলা হয় --"ধাঙ্য'ড়া" বা "ধাঙড় দল" অমাবস্যার রাতে গ্রামের বাড়ি বাড়ি ঘুরে গোয়াল এর কাছে গিয়ে তারা গান করে । এর জন্য পায় ---পয়সা , পিঠে , মুড়ি । এসকল নেহাতই প্রীতি-উপহার বা ভালোবাসার দান । মহুয়া মদের নেশায় হেলে দুলে সুর করে তারা যে সকল গান গেয়ে ওঠে প্রশ্নোত্তরের ভঙ্গিমায় , সেই সমস্ত গানগুলির মধ্যে কয়েকটি এখানে তুলে ধরা হচ্ছে ---
------------------------------------------
(১) অহি রে ---
সবু দিন ত মাগে ভালা ভাট্অ ভিখারি রে ,
আজু ত মাগে ভালা দশ ভাই ‌।
(আর) দশ ভাইকে দিলে ভালা জলে নাহি পড়ে গ ,
যুগে যুগে রহি যাইত নাম রে।।

অহি রে ---
থোড়া না মাগে ভালা , ঢের না মাগে রে ,
মাগে তো পাঁচ্অ টাকার ল'ট্
আর নাহি যদি জুটত , নাহি যদি আঁটত
হাঁসিমুহে কর ত বিদাই রে ।।

(২)
অহি রে ---
কিয়া ফুলের ভালা ওহীরলং পহিরলং ,
কিয়া ফুলে হইত ভজন রে ? (আর) কিয়া ফুলে রে ভালা অঙ্গ দেহি মাঁযত
কিয়া ফুলে রাংল সংসার রে ?

অহি রে ---
কাপাসেকা ফুলে ভালা অহীরলং পহিরলং ,
ধানফুলে হইত ভজন রে ।
(আর) সরিষাকা ফুলে ভালা অঙ্গদেহী মাঁযত
সিঁদুর ফুলে রাংল সংসার রে ।।

(৩)
অহি রে ---
কিয়া বিনু মালিনী অঙ্গ মলিন রে ,
কিয়া বিনু ঝবরলাই কেশ ?
 কিয়া বিনু মালিনী আঙ্গিনা যে শূন-অ 
কিয়া বিনু শয়ন আঁধার ?

অহি রে ---
অন্ন বিনু মালিনী অঙ্গ তোর মলিন রে , 
তেল বিনু ঝবরলাই কেশ ।
পুতি বিনু মালিনী আঙ্গিনা তোর শূন যে , 
সঁয়া বিনু শয়ন আঁধার ।।

(৪)
অহি রে ---
কাঁহা হি উপজলই সারি বল্  সুআ গ ,
কাঁহা হি উপজলই ধান রে ?
(আর) কাঁহা হি উপজলই চুয়া চন্দন গ  ,
কাঁহা হি উপজলই গুয়া পান রে ?

অহি রে ---
বনে বনে উপজলই সারি বল সুআ গ ,
বেড়া ভুঁইয়ে উপজলই ধান রে ।
 (আর) রাজা ঘরে উপজলই চুয়া-চন্দন গ 
বাবু ঘরে উপজলই গুয়া পান রে ।

(৫)

অহি রে ---
কে তরে দেইত ভালা ধেনু দুধা'ল গাই গ ,
 কে তরে দিত ঝিলিমিলি শাড়ি যে ?
(আর) কে তরে দেইতো ভালা দু'কানের সনা গ ,
কে তরে দেইত সিঁথায় সিঁদুর রে ?

অহি রে ---
বাপে ত দেল ভালা ধেনু দুধা'ল গাই গ ,
মায়ে ত দিল ঝিলিমিলি শাড়ি যে ।
 (আর) ভাই এত দিল ভালা দু কানের সনা গ
 পরের পুতায় দেই-ত সিঁথায় সিঁদুর রে ।

(৬)
অহি রে ---
কাঁহা পাওবে বাবা , রেশমকা জুতা , 
কাঁহা পাওবে চাদর ?
কাঁহাহি পাবে ভালা দুই হাতের বালা রে 
কৈসে চরাব ধেনু গাই ?

অহি রে ---
মুচি ঘরে পাব ভালা রেশমকা জুতা রে
সদা ঘরে পাব রে চাদর
কাম'ল্যা ঘরে পাব ভালা দুই হাতের বালা রে ,
নিশচিনতি চরাবি ধেনু গাই ।

(৭)
অহি রে
কাঁহাবি রাখব বাবা রেশমকা জুতা যে ,
কাঁহা ছি রাখব চাদর ?
কাঁহা হি রাখব ভালা দুই হাতের বালা গ
কৈসে চরাব ধেনু গাই ?

অহি রে ---
আঁঙনাহি রাখবে ভালা রেশমকা জুতা গ
টাঁঙনাহি রাখবে চাদর ।
বাসকায় রাখিবি ভালা দুই হাতের বালা গ
নিশচিনতি চরাবি ধেনু গাই ।
___________________________________


যৌথতা ভেঙে যায় (পঞ্চম কিস্তি)


নির্মল হালদার


আমি খুব রবীন্দ্রনাথ রবীন্দ্রনাথ করি----রবীন্দ্রনাথের কি পড়েছি----আমার সমসাময়িক কবি বন্ধুর প্রশ্নের উত্তর আমি দিইনি। কবি বন্ধু না বলে সতীর্থ বলাটাই সংগত। তার কণ্ঠস্বরে ছিল বিদ্রুপ। তো তিনি আরেকবার প্রশ্ন করেছিলেন আমাকে,আমি মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যায়ের নাম শুনেছি কিনা। তখনো আমি নীরব ছিলাম।
           অনেক ঠাট্টা বিদ্রুপ গায়ে মেখেছি। মাখছিও।
হেঁটেও যাচ্ছি আজ। আজও শান্তিনিকেতনের প্রতি
এক অমোঘ টান অনুভব করি। ৪০ বছর ধরে আসা-যাওয়া করছি।
            পুরুলিয়ার তুলনায় শান্তিনিকেতনের প্রকৃতি কী খুব উদার খুব আকর্ষণীয়? না। একেবারেই না।একটা মানুষের একক উদ্যোগের কর্মভূমি। কর্মের পিঠস্থান। সেই মাটিতে পা দিলেই,  মনে জোর পাই।
নিজে কিছুই করতে পারিনি, করতে পারবো না আর। শুধু একটা মানুষের বিশাল কর্মকাণ্ডের কাছে এসে নত হই।
          আমার সঙ্গে যে সমস্ত তরুণরা নানা সময়ে যুক্ত হয়েছে, তাদের নিয়ে বারবার শান্তিনিকেতন গেছি। বিশেষ করে বসন্ত উৎসবের সময়। রং খেলা যে শুধু হুল্লোড় নয়, কতটা নান্দনিক হতে পারে, রবীন্দ্রনাথের পরিকল্পিত বসন্ত উৎসব সবাই দেখলে ও জানলে হয়তো বা কিছুটা জানতে পারবে।
          বর্তমান সময়ে বিশেষ কিছু জনগণের কারণে, রাজনৈতিক কারণে, বসন্ত উৎসবের মেজাজ পাল্টে গেলেও রবীন্দ্রনাথের পরিকল্পনা ও গান পাল্টে যাবে না।
           একটা গাড়ি ভাড়া করে গাদাগাদি করে শান্তিনিকেতন যাওয়া, কি যে আনন্দের ছিল এক সময়। প্রথমদিকে বাসুদেব বাউলের আশ্রমে থেকেছি। আমি কুনাল সোমু ও রামপ্রসাদ যাতায়াত করেছি বাসে। থেকেছি বিভিন্ন জায়গায়, তার মধ্যে আরেকটা জায়গা পীযূষ মুখোপাধ্যায়ের হোস্টেল।
          যখন একা একা গেছি তখন বাবলিদি ও প্রভাতদার বাড়িতে। তখন বসন্ত উৎসবে এত ভিড় এত হুল্লোড় ছিল না।
           একরামকে পেয়েছি বরাবর। বাবলিদির জন্যেই শান্তিদেবের বাড়িতে তার গান শুনতে যাওয়া।শিবনারায়ণ রায় যখন বিশ্বভারতীতে কর্মরত তখন তার ডাকে অনেকবার শান্তিনিকেতন। তিনি আমার জন্য চেষ্টা করেছিলেন, যদি কোনো কাজে যুক্ত করতে পারেন ।
            হায়, আমার কপালে জোটেনি কিছুই। কেবল মনে আছে মনে থাকবে, শিব বাবুর অন্তরের সহযোগিতা। তার কোয়ার্টারেও থেকেছি কত। পরের দিকে আমাদের শিল্পী বন্ধু প্রদীপ মহান্ত ও রুমুনির 
বাড়িতে ১০--১২ জন  প্রতিবছর গেছি। অত্যাচার করেছি তাদের উপর।
           একা একা গেলে কোনো ঝামেলা নেই। দায়দায়িত্ব নেই। কিন্তু পারিনি। সবাইকে নিয়েই তো থাকা। সবাইকে নিয়েই তো বাঁচতে চাওয়া।
            সে কি আর হয়। সবাই তো আর সবাইকে নিয়ে থাকতে চায় না। একা থাকা বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকাটাই আজকের দিনের প্রধানতম লক্ষ্য।
            আমাদের পরিবারের ভাইপোদের অনুপ্রাণিত করেছি বসন্ত উৎসবে যাওয়ার জন্য। আমার বড়দার টান ছিল রবীন্দ্রনাথের গানের প্রতি। তার এক ছেলের বিয়ে দিয়েছে শান্তিনিকেতনের দিকে। মেয়েটি রবীন্দ্রনাথের গান করে বলেই, দাদার পছন্দ হয়েছিল খুব।
           রবীন্দ্রনাথকে জানলেই, কেউ অন্তরে সুন্দর হয়ে উঠবে এমন আশা করি না। কেবল আমার কথা, বিশেষ করে যারা কবিতা চর্চায় আছেন, তারা জানুক  চিনুক, একা মানুষের লড়াই।
           আমি চাইলেই কি পাবো?
           রবীন্দ্রনাথ যে  জীবনযাপনের ক্ষেত্রে 
এক আদর্শ হতে পারে, বলতে গেলে আমার কাছে ছুটে আসবে তীর: আপনি রবীন্দ্রনাথের কী পড়েছেন? কী?


দিলীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতা

১.
অশ্বথামা


মণি আর নেই। জটায় ঢেকে গেছে মস্তক ও ললাট। চোখে জন্মান্তরের প্রশান্তি। বদ্রিকা আশ্রমের অদূরে একটি প্রাচীন বদরীবৃক্ষের তলায় তিনি বসেছিলেন। সঙ্গে তপস্যারত ঋষিগণ। 

তিনি কি অমরত্ব উদযাপন করছেন? তিনি কি একটি বদরীফলের অন্তস্তলটিকে দেখার প্রত্যাশায় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছেন তার চারপাশ? নাকি শত-সহস্রবার এক নিদ্রিত শিবির আর এক প্রেরিত যুবকের নিকষ অন্ধকারকে বুঝতে চাইছেন? 

তাঁর শ্মশ্রু-গুম্ফময় শুভ্র কান্তির কোনাে অন্তরাল তাে নেই আজ। হিমালয়ের দীর্ঘ সান্নিধ্য আর মস্তকের মণিক্ষত থেকে উপজাত বেদনা তাঁর সব বৰ্ম ও বিষাদ থেকে তাঁকে মুক্ত করেছে। তাই পান্ডবেরা যখন এলেন আর একবার নিরস্ত্র, ব্যথাতুর— তিনি নিবিড় আবেগে জড়িয়ে ধরলেন তাঁদের। সদ্যমৃতা পাঞ্চালীর জন্য অশ্রুপ্লুত হলেন। 

তাঁর কি মনে পড়ছিল পাঁচজোড়া কিশাের চোখের মৃত আর্তি? মনে পড়ছিল ক্রদ্ধা পাঞ্চালীর প্রয়ােপবেশন, ভীমসেনের মুক্ত কৃপাণ?

না বােধ হয়, অশ্বথামা সেদিন কেবল পাঞ্চালীর কথা ভেবেছিলেন, সেই কৃষ্ণা দ্রৌপদীর কথা। যার মৃত্যুর পর অমরত্ব বােঝা হয়ে দাঁড়ায়।

২.
ভাইরাস


খাঁটি বাটপাড়ের মনােভাবের মতাে সে নিজেকে অদৃশ্য রাখে। আর যখনই বুঝতে পারে তােমার সেনা-সামন্ত কম, কিংবা অপ্রস্তুত, সে তােমার গড়ে ঢুকে পড়ে দখল নেবে তােমায়। এরপর তুমি একজন ভাইরাস-চালিত মানুষ। তােমার উন্নত মাথা, তােমার হাত-পা-শিক্ষা-দীক্ষা সবই তখন তারই জন্য নিবেদিত। মৃত্যুভয়ের মতাে অমােঘ আর আদিম তার ঘেরাটোপ।

সব থেকে আশ্চর্য তার জীবন। সে জীব অথচ জড়। জীব হয়ে সে ঝাঁপিয়ে পড়ে আমাদের দেশ-কাল-ইতিহাসের ওপর। আর জড় হয়ে টিকে থাকতে পারে যুগ যুগান্ত, মানুষের মনের অচেনা কোনায় পড়ে থাকা কার্নিভাল ইচ্ছার মতাে, মৃত্যুদৃশ্য, হত্যাদৃশ্য, নির্মম ধর্ষণদৃশ্য দেখার গােপন বাসনার মতাে। 

ফলে দেশ বনাম রাষ্ট্রের লড়াইয়ে ভাইরাসের নির্ণায়ক ভূমিকাই আবহমান।



কৌশিক চক্রবর্তীর কবিতা


মনপদাবলি ৩


মন বললে তাে সেই একটাই
তরুছায়া বললে অনেকগুলাে হতে পারত
আবার কিছু না-ও

দিনের ছিটকাপড় উড়ে যায়
তাদের সঙ্গে কথা নেই
ভাবাে-
একটা বারান্দা থাকা না থাকার মধ্যে
অনেকগুলাে ভাের দেখা হারিয়ে যায় কেমন -
রঙ তুলির শব্দ...
             রঙ বললে ছবি
             টং বললে – দূর গুফার ঘন্টা জুড়ে সন্ধে নামে

সেই তখন থেকে
কোন রঙ যে কোথায় বৃষ্টি নামিয়ে চলেছে-
              চলতে চলতে
              কোথায় যে থামবে গিয়ে

থামার কথাও কি?
এই তাে সবে আলাে-
আরও কতবার সে বেজে উঠবে
চাঁদে
                সে নিজেই জানে না


মনপদাবলি ৪


মন বললে তাে সেই একটাই
তরুছায়া বললে অনেকগুলাে হতে পারত
আবার কিছু না-ও

হাসিগুলাে ফুলঝুরি হয়ে বাজে নরম ঘিরে রাখার বাগানে
আলােগুলাে আলাে হয়
অনেকখানি রাত করে রাত নামে

অচেনায় গেলাম
আঁকা পথ
বাঁকা রাস্তার ঝিলমিল
তােমাদের ছাদে রিমি কস্তুরী খসে যায়

নিজেকে বলছি না - কেন?
                নিজে জানি?
তােমার নামের চাঁদ উঠছে।
কিছু কিছু আকাশ নীল হয় এখনও তখনও –
ঋতু ফসকে ভেসে যায় ঘুড়ি-লাটাইয়ের ক্ষমা 

যা কিছু ভাববার ভাষা
আজ দেখি এই রাস্তা দিয়েই
অন্যমনে হেঁটে হেঁটে আমায় আসছে-



                                                ছবি : দীপাংশু মাহাত


দীপাবলির আলো

ডরোথী দাশ বিশ্বাস


মাঠের ফসল কেটে ঘরে তোলার পালা শেষ। এবারে পাড়ি দিতে হবে ডুয়ার্সে। শ্যাম মাহাতোর মাথায় চিন্তা।প্রতি বারের মতো এবারও কি সেই চেনা পরিবেশ পাবে তারা ? ডুয়ার্সের মঙ্গলবাড়ি হাটের মানুষ এই হেমন্তের শিরশিরে শীতের প্রারম্ভে সেই আগের মতোই তাদের উষ্ণ সম্ভাষণ জানাবে ? মানুষ যে এখন মনে মনে বেশ বদলে গেছে। অতিমারীর দাপটে ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে চলছে সবাই। তবু পেট তা মানবে না। যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ আশ। চালসার মতি নন্দীকে একবার ফোন করে দেখলে হয়। সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে দেরী হয়ে গেলো বড্ড। সেই জুলাইতে ফোন করেছিলো সে, তখন জেনেছিলো, ডুয়ার্সে এবারে ঘোরতর বর্ষা।অসময়ে এতো বৃষ্টি ধানের আশানুরূপ ফলনে দাঁড়িয়েছে বাধা হয়ে। সরকারের তরফে কৃষকদের যে বীজধান দেওয়া হয়, তাও এসে পৌঁছতে দেরি হয়েছিলো। বীজধানের দামও প্রায় দ্বিগুন বেড়েছে। পয়সা দিলেও নাকি অনেক জায়গায় বীজধান মেলেনি। হতাশ কৃষকরা নাকি ধানের বদলে গম চাষের দিকে ঝুঁকছেন। কিন্তু দক্ষিণ দিনাজপুরে হরিবাবুর সাথে কথা বলে তেমন হতাশাব্যঞ্জক কিছু পায়নি সে। বরং উনি অনেক আশার কথা শুনিয়েছেন। ফোন ধরে ছাড়তেই চান না উনি। ধান নিয়ে তাঁর গবেষণার কথা শুনিয়েছেন।
এবারে পঁচাত্তর রকম বীজধানের চাষ করেছেন। গতবছর এ সংখ্যাটি ছিলো তেষট্টি। তিনি একজন ধান সংরক্ষক। নতুন কোন ধানের সন্ধান পেলেই সেই ধানের বীজ সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করেন তিনি। বেশ কয়েকটি স্থানীয় ধান, বাংলাদেশে ফলে এমন কিছু ধান এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সংরক্ষণ করা ধানের চাষ করেছেন তিনি। প্রধানতঃ শ্রী-পদ্ধতিতে ও জৈবিক পদ্ধতিতে ধান চাষ করেন। শ্রী কোন বাংলা শব্দ নয়, ইংরেজী সিস্টেম ওফ রাইস ইনটেন্সিফিকেশন পদ্ধতিকে সংক্ষেপে এস. আর. আই. বা শ্রী বলা হয়। স্বল্প উপকরণে এইভাবে ধান চাষ করা হয়। এই পদ্ধতিতে দুই পাতাযুক্ত চারা বেশী দূরত্বে প্রতি গুচ্ছতে একটি করে রোপণ করা হয়।বীজতলার বয়স আট থেকে বারো দিন হলেই তা রোপণযোগ্য হয়ে ওঠে। অধিক জৈব সারের (কম্পোস্টের) ব্যবহার করা হয় এক্ষেত্রে। চল্লিশ কুইন্ট্যাল পরিমান প্রতি একরে প্রয়োজন। রাসায়ণিক প্রয়োগে ধানগাছের স্বাস্থ্যের অবনতি হয়। পোকামাকড়ের আক্রমণও বেড়ে যায়। তাই উনি রাসায়নিক সার ব্যবহারই করেন না। এভাবে চাষ করলে নাকি জমিতে অল্প জল থাকলেই চাষ করা সম্ভব। দক্ষিণ দিনাজপুর ডুয়ার্সের তুলনায় খরাপ্রবণ বেশী। বর্ষা শেষ হতেই ভৌম জলস্তর নেমে যায় চল্লিশ ফুটের নীচে । শ্রী পদ্ধতিতে চাষ করলে ধানগাছের পাশকাঠির পরিমাণ বৃদ্ধি পায়, ফলে গোছ বাড়ে এবং শীষের দৈর্ঘ্য এবং সংখ্যাও বৃদ্ধি পায়। এমন শিক্ষিত কৃষকের কথা মন দিয়ে শোনে শ্যাম। বড়ো কৌতূহল হয়, পঁচাত্তর রকমের ধানগাছগুলির নাম জানতে। ফোনেই জেনে নেয় কয়েকটি ধানের নাম ... পাকিস্তানী বাসমতি,দেশী মাশুড়ি, পাথরকুচি, কৃষ্ণভোগ, কালোকৃষ্ণভোগ, কাঠারিভোগ, কালোননিয়া, কেরালাসুন্দরী, তুলাইপাঞ্জি, লালভাত, কালোভাত, কলাবতী, লালআউশ, আমনবোরো, তুলসীমঞ্জরী, চিনিআতপ, কনকচূড়, কুদরত, ডি.আর. কে, স্বর্ণ, যমুনা - কতো নাম। হরিবাবুর সাথে কথা বলে শ্যাম অনেককিছু জানতে পারে।
             বাড়িতে মজুত ধানের আঁটি থেকে ধান ঝাড়াইয়ের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে আমগুঁড়ি, মন্ডলঘাট, খড়িবাড়ি, নকশালবাড়ি, আবুতারা, তিলন গ্রামের অনিল, মতিন, সোনাই, বাবলু, ভুবনবাবু, হরিবাবু, রামানুজের পরিবারসহ সমগ্র গ্রামবাংলার মানুষ। এই ধান ঝাড়াই করে সারাবছরের জন্য মজুত করা হবে গোলাঘরে বাঁশের তৈরী বিভিন্ন মাপের ডুলিতে। ওই ডুলিতেই পরবর্তী ফসল ঘরে না ওঠা পর্যন্ত থাকে ধান। প্রয়োজনমতো ঐ ডুলি থেকে ধান বের করে তা দিয়েই চাল তৈরি হয় খাবারের জন্য। এই সময়েই তো ডুলির চাহিদা বাড়ে। ডুয়ার্সের এক একটি হাট থেকে কৃষক পরিবারগুলি ডুলি সংগ্রহ করে নেয়। শ্যাম মাহাতো, পরমেশ্বর, নাজিমেরা বংশপরাম্পরায় এই ডুলি তৈরীর কারিগর। যদিও ডুলি তৈরী করে জনপ্রতি সাত থেকে আট হাজার টাকা আয় হয়, তা দিয়ে তো সম্বৎসরের খোরপোষ চলে না, তাই বছরের অন্যান্য সময় ক্ষেতমজুরের কাজ করতে হয়। ডুলি তৈরীর বাঁশ তারা স্থানীয়ভাবেই সংগ্রহ করে। এক একটি বাঁশের দাম গড়ে একশো কুড়ি টাকা করে পড়ে ।  
               বিহারের ছাপরা জেলার মোথারামপুর গ্রাম থেকে রাজকুমার, খগেশ্বর, দীননাথদের সাথে প্রতিবছর শ্যাম এই সময়ে চালসাতে চলে আসে। মঙ্গলবাড়ি, বাতাবাড়ি, চালসা - মূলতঃ চা-বাগান অধ্যূষিত এলাকা হলেও এখানে ধান, আলু, ভূট্টা, তামাক, সর্ষে, পাট, তিল ও অন্যান্য শাকসব্জির চাষও হয়। একত্রিশ নং জাতীয় সড়কের কাছে চালসাতে মতি নন্দীর পাঁচকাঠা জমির ওপর একপাশে একচালা ছয়টি কক্ষবিশিষ্ট লম্বা ঘরটিই শ্যাম মাহাতোদের দশজনের অস্থায়ী ডেরা। সেখানেই ফাঁকা জায়গায় তাদের ডুলি তৈরীর ঋতুভিত্তিক কারখানা।"নভেম্বরে দীপাবলির আগেই আসবো" - মতি নন্দীকে ফোনে জানিয়ে দিলো শ্যাম। মতি নন্দীও জানে, নভেম্বর ও ডিসেম্বর এই দু'মাস পড়ে থাকা এই একচালার ভাড়া বাবদ দশ হাজার টাকা বছরে তার বাড়তি আয়। শ্যাম মাহাতোর বয়স হয়েছে। ছেলে সুবল গ্র্যাজুয়েট। এবারের এই করোনা পরিস্থিতিতে বাবাকে সে ডুয়ার্স যেতে দিতে নারাজ। শ্যামের স্ত্রী শ্রীমতীও বাদ সেধেছে এ যাত্রায়, স্বামী দেশান্তরে যাক তা সে চায় না এবারে। কিন্তু শ্যামের মন ছুটে গিয়েছে। বিগত প্রায় বিশ বছর ধরে তার সম্পর্ক ডুয়ার্সের মঙ্গলবাড়ির মানুষের সাথে। প্রতিবছর একটানা দু'মাস ডুয়ার্সে থাকার ফলে স্থানীয় মানুষদের সাথে একটা আত্মীয়তার টান অনুভব করে সে। তাই ডুলি তৈরীর কাজ সেরে সবাইকে ছেড়ে আবার যখন ফিরে যায় দেশের বাড়িতে তখনও মনখারাপ হয়ে যায় তার। শিবু মনা মতিবাবু - এদের কাছ থেকে বিদায় নেয় চোখের জলে। সেই থেকে অপেক্ষা শুরু হয় আগামী বছরের জন্য, কখন ডুয়ার্সে এসে ডুলি বানাবে, কিছু বাড়তি উপার্জন হবে, আবার দেখা হবে আত্মার আত্মীয়দের সাথে। শ্রীমতীকে প্রবোধ দিয়ে শ্যাম বললো, "ভয় কি, ট্রেনে তো মাত্র একদিন, সাথে রাজকুমার, খগেশ্বর, দীননাথ তো আছেই। সবাই মিলে একসাথে মতিবাবুর ঘর ভাড়া করেই থাকবো, একসাথে রান্না খাওয়া, ডুলি তৈরীর কাজ। ছয় হাত ডুলি বিক্রি করলে তিনশো টাকা, সাত হাতের দাম চারশো থেকে সাড়ে চারশো টাকা, আট হাত ডুলির দাম ছয়শো থেকে সাড়ে ছয়শো টাকা। এই দু'মাস যদি গ্রামের সংসার ছেড়ে থাকি, তাহলে কতো বাড়তি উপার্জন হবে বলো তো ? প্রয়োজনে টাকা তো পাঠাবোই, বাড়তি কিছু টাকা জমিয়ে লক্ষ্মীর জন্য কয়েকগাছা সোনার চুড়ি গড়িয়ে রাখবো। দেখতে দেখতে ডাগরটি হয়ে উঠছে মেয়েটা। সুবলের ওপর লক্ষ্মীর দায়িত্ব চাপিয়ে দিতে চাই না যে। টানা এতোদিন সংসার ছেড়ে থাকতে মন চায় না ঠিকই। সারাদিনের পরিশ্রমের পর রাত আটটায় যখন সবাই একসাথে হবো, তখন যে যার বাড়িতে ফোন করে খবর নেবো। এমন একটা সময় গেছে শ্রীমতী, মনে করে দেখো, ছোট দুটো বাচ্চা ও বৃদ্ধ শ্বশুরকে নিয়ে তুমি একা। তখন না ছিলো ফোন, না ছিলো এমন উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা। পরিজনের ঘনিষ্ঠতার স্বাদ এখন মোবাইল ফোনেই নেওয়া যায়। তাই মন খারাপ কোরো না। দেখতে দেখতে সময় কেটে যাবে।" শ্রীমতী অগত্যা শ্যামের চাদরের খুঁটে চিঁড়ের মোয়া আর মুড়কি যত্ন করে বেঁধে দিলো আর আঁচলের খুঁট দিয়ে নিজের ঝাপসা হয়ে আসা চোখদুটো মুছে নিলো।
              কোচবিহারের ভুবনবাবুর গ্রামের বাড়ি আবুতারার সাথে দক্ষিন দিনাজপুরের হরিবাবুর গ্রাম তিলনের মাটির আশ্চর্য মিল খুঁজে পেয়েছে শ্যাম। আবুতারা বানিয়াদহ নদীর তীরে আর তিলন আত্রাই নদীর তীরে - পলল দোঁয়াশ মাটি দিয়ে তৈরী দু'টো গ্রাম, যে মাটি শুকোলে শক্ত পাথর হয়ে যায়। ধানের জন্য প্রয়োজনীয় জল ধরে রাখতে পারে এ মাটি। ধান কাটার পরের গল্পে শ্যামের ডাক এলেও ধানই যে লক্ষ্মী, শ্রীমতী বাড়িতে তাই মাটির ডোয়ায় পিটুলিগোলা দিয়ে লম্বা টান দিয়ে মা-এর পুজোর সূচনা করে। এবারও করেছে।ডুয়ার্সের চেয়েও কোচবিহার ও দক্ষিন দিনাজপুরে ধানের ফলন ভালো হওয়ায় পরমেশ্বরের দল লক্ষ্মীপুজোর আগেই রওনা হয়েছে আবুতারায়,ঐ একইদিনে নাজিমের দলও রওনা হয়েছে তিলনে। শ্যাম আর দেরি করলো না, লক্ষ্মীপুজোর পরের দিনই দলবলসহ রওনা হয়ে গেলো মঙ্গলবাড়ির উদ্দেশ্যে। চৌদ্দদিন পর ...আজ ভোরে চোখ খুললো শ্যাম, তন্দ্রাচ্ছন্ন, কোথায় সে, স্তব্ধ শুনসান এ কোন জগত ? শরীর জুড়ে ক্লান্তি। একটু একটু করে মনে পড়ে তার, প্রখর মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মনে হয়েছিলো, মৃত্যু যেন এ যাত্রায় ফিরিয়ে নেয় মুখ, শরীর চাইছিলো বিশ্রামের কাছে আত্মসমর্পণ করতে। অথচ প্রথম প্রথম দিন পনেরো দিনরাত এক করে কাজ করলে তবেই অর্ডার অনুযায়ী ডুলি তৈরীর কাজ শেষ করতে পারা যায়।এবারে নভেম্বরের প্রথম দিন থেকেই শীতটা বেশ জাঁকিয়ে বসেছিলো, ট্রেনে ঠান্ডা লেগে সামান্য সর্দিকাশি,গলাব্যথা, জ্বর জ্বর ভাব যে এভাবে তাকে কাবু করে ফেলতে পারে এ তার ধারণার বাইরে। সে বেশ বুঝতে পারছিলো,পৃথিবীতে যেন দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে অক্সিজেন। এ যেন তার নিজের ছেড়ে আসা গ্রাম নয়, চেনা ডুয়ার্সও নয়। যেন এক অন্য জগত। ধীরে ধীরে চেনা পৃথিবীর প্রতিটি কপাট যেন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বাতাসে নেই কোন গন্ধ, ভোরের শিশিরে যেন বিষ - এসব ভাবতে ভাবতে যেন পা-এর তলার মাটি সরে সরে যাচ্ছে, সে যেন কোথায় তলিয়ে যাচ্ছে .. সে বুঝতে পারছে, জীবনীশক্তি তার শেষ হয়ে আসছে ...
কিন্তু আমি যে মরতে চাই ধানক্ষেতের পাশে, আমি যে মরতে চাই চেনা পথের ধুলো মেখে ... এ কংক্রীটের দেওয়ালে যে মৃত্যুর ছায়া লেপ্টে আছে ...
            "এ যাত্রায় বেঁচে গেলেন" - আচমকা অচেনা গলায় এ কথা শুনে শ্যাম তাকিয়ে দেখে, অদ্ভুত পোশাক পরা একজন তাকেই বলছে ..."এখুনি রিপোর্ট এলো, ভালো খবর, দীপাবলির দিনই ঘরে ফিরবেন।" 
             আজ তবে দীপাবলি। শ্রীমতি হয় তো এতোক্ষণে মাটির প্রদীপে তেল সলতে দিয়ে সন্ধ্যায় জ্বালবে বলে গুছিয়ে রেখেছে ...
             শীত শীত বিষাদের দিনে সাঁঝের শিকলে বাতাসের কাঁপন, ডাল পাতা জড়ো করে আগুন জ্বাললে পাওয়া যাবে খানিকটা উত্তাপ। বাতাস যেন পৌঁছে দেয় তার ঘরে ছাতিমফুল আর সলতে পোড়া গন্ধের সাথে খানিকটা আগুনের ফুলকি দীপাবলির রাতে ...






সম্পাদক : উত্তম মাহাত
সহযোগিতায় : অনিকেতের বন্ধুরা
যোগাযোগ- হোয়াটসঅ্যাপ ৯৯৩২৫০৫৭৮০
ইমেইল- uttamklp@gmail.com

মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ছবি প্রদর্শ-শালা ।। আলোকচিত্র ।। মোহন পরামানিক

ছবি প্রদর্শ-শালা ।। আলোকচিত্র ।। শঙ্কর মন্ডল

ছবি প্রদর্শ-শালা ।। আলোকচিত্র শিল্প ।। মুকেশ কুমার মাহাত