প্রথম বর্ষ ।। ত্রয়োদশ ওয়েব সংস্করণ ।। ১৮ মাঘ ১৪২৭
যারা সবার মুখে দু'মুঠো অন্ন তুলে দেওয়ার কাজে সব সময় ব্যস্ত থাকে, যাদের সাজগোজ করা, স্নান করা, খাওয়া দাওয়া করার জন্যও এতটুকু ফুরসৎ থাকে না, তাদের দিনের পর দিন ফসল ফলানোর সব কাজ ফেলে দিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যেতে হচ্ছে এবং তাদের দাবি মেনে না নিয়ে সরকারকে সেই আন্দোলন ঠেকানোর জন্য নানাভাবে সচেষ্ট হতে দেখা যাচ্ছে এর থেকে লজ্জাজনক ঘটনা কিই বা হতে পারে?
আমরা এক দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে চলেছি বলেই দেশের অন্ন সংগ্রহকারী কৃষকদের নিজের দাবি আদায়ের জন্য আন্দোলনের মুখে যেতে হচ্ছে এবং মাসের পর মাস আন্দোলন করতে গিয়ে জীবন হারাতে হচ্ছে।
কৃষকের সংখ্যা অসংখ্য বলে শতাধিক কৃষকের আত্ম বলিদানে কোনো কিছু এসে যাচ্ছে না সরকারের। অন্ন উৎপাদনের কাজে ব্যঘাত ঘটছে না।যদি দেশের বিজ্ঞানীদের সংখ্যার মতো একটা নির্দিষ্ট সংখ্যক কৃষক থাকতো এবং এত সংখ্যক কৃষক আত্ম বলিদান দিতো তাহলে প্রকৃত অর্থেই বোঝা যেত চাষিদের এইভাবে হেনস্থা করার ফল কি হতে পারে।
কৃষক আন্দোলনকে নিয়ে সরকারের এত ভয় কিসের? এদের দাবি মেনে নিলে কাদের কথা রাখতে অসমর্থ হচ্ছে সরকার? তারা কি প্রকৃত অর্থেই কোনো কিছু দিয়েছে দেশের উন্নতিতে? নাকি কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা ঢেলেছে দলের উন্নতিতে? শিবিরের উন্নতিতে? স্বাভাবিক ভাবেই এই প্রশ্নগুলো এসে পড়ছে সরকারের সামনে। যাদের উত্তর দেওয়া সরকারের নৈতিক কর্তব্য বলে মনে করি।
উত্তম মাহাত, সম্পাদক
------------------------------------------------------
বিরহের কোন ব্যথাভরা লিপিখানি
সন্দীপ মুখোপাধ্যায়
ভৈরবী,ইমন আর ছায়ানটের৷ মত বেহাগও ছিল রবীন্দ্রনাথের খুব প্রিয় রাগ। বাংলা অনেক গানই বেহাগে বাঁধা।বেদনাবিধুর,আবেগ-আরক্ত এই সুর কবিকে কম বয়েসী টেনেছিল। তাঁর ছেলেবেলাতেই পড়ি তো পড়ি জ্যোতিরিন্দ্রনাথের কবি-সুররসিক বন্ধু অক্ষয় চৌধুরীর কথা। কবি লিখছেন,"প্রায় আসতেন অক্ষয় চৌধুরী। তাঁর গলায় সুর ছিল না,সে কথা তিনিও জানতেন,অন্যেরা আরও বেশি জানত। কিন্তু তাঁর গাবার জেদ কিছুতে থামত না। বিশেষ করে বেহাগ রাগিণীতেই ছিল তাঁর শখ।"রবীন্দ্রনাথের গান রচনার নানা পর্বে বেহাগ তার রাগরূপে অক্ষুন্ন থেকেও কথার সঙ্গে জোড় মিলিয়ে বিভিন্ন মূর্তিতে আপনাকে প্রকাশ করেছে। ১৯২৬ সালের চৈত্রে তাঁর কাছ থেকে বসন্ত-বিহ্বল কয়েকটি গানের সঙ্গে পেলাম করুণ রঙিন আর একটি গান:' লিখন তোমার ধূলায় হয়েছে ধূলি'।পরে শান্তিদেবের কণ্ঠে গানটি শুনে বিস্মৃতদিনের,হারানো নানা লিখনের জন্যে অচিহ্নিত এক বেদনা অনুভব করেছি।এই গানটি রচনার বিভাবটি কবি জানিয়েছিলেন রানী মহলানবিশকে। রানী মহলানবিশের চিঠির একটি প্রাসঙ্গিক অংশ তুলেছেন প্রশান্তকুমার পাল রবিজীবনীর নবম খণ্ডে। কবি তাঁকে জানিয়েছিলেন, চাতালে বসে কবি গ্রীষ্মের শুকনো হাওয়ায় লাল কাঁকরের রাস্তার উপর দিয়ে একটা ছেঁড়া চিঠির টুকরো উড়ে যেতে দেখেছিলেন। একদিন বহু আদরের চিঠির উড়ে যাওয়ার দৃশ্য তাঁর কাছে যে-ছবি ধরে দিল,তারই বাণী রূপ ঐ গান,লিখন তোমার ধূলায় হয়েছে ধূলি।কবির ঔদাস্যময় মনের আভা-জড়ানো কথায় বেহাগে তৈরি হলো শেষ বসন্তের বুনে নেওয়া বেদনার অনপনেয় একটি ছবি। সুরে ও কথায় এই সম্মিলিত বয়নই যে তাঁর গানের বিশিষ্টতা সেটি ধূর্জটি প্রসাদ ও রবীন্দ্রনাথের চিঠিতে যেমন,তেমনি আজকের রবীন্দ্র সংগীতের প্রধান ব্যক্তিত্ব সনজিদা খাতুনের কাছ থেকেও জেনে নিই। তাঁর উক্তি ; "সংগীতরূপে সুর-ছন্দের উপর গানের বক্তব্যকে কতখানি নির্ভর করতে হয়,সে-সম্পর্কে সমস্ত কথা মনে রেখেও রবীন্দ্র সংগীতের বাণীর বৈশিষ্ট্য বিশেষভাবে লক্ষ্য করবার মতো"। (রবীন্দ্র সংগীতের ভাবসম্পদ)।
যে-গানটি নিয়ে আমরা ভাবছি,তার আস্হায়ীর 'তোমার ধূলায়'-এর তুমি নিশ্চয় কবির অন্য গান,কবিতার শ্রোতা-পাঠকের মতো ভাবনায় দোলাবে। কে এই 'তোমার'? মনে হয় এখানে অন্য কেউ নন,কবি নিজেকেই হারানো আখরগুলির, সময়ের ধুলোর পর্দা ঢাকা লিখনের কথা বলছেন। আজ বসন্তপ্রান্তে সেই ঘ্রাণমদির চৈত্র রজনীর একলা কবির কাছের নিসর্গে, নব কিশলয়ে যেন জেগে উঠল যৌবনবেদনারসে পূর্ণায়ত সেই রোমান্টিকতারঞ্জিত কবিতা, আর নিভৃত উৎসার থেকে অর্জিত গান, যে-গানে তাঁর নিজস্বতার এক পূর্ণ অভিষেক ঘটেছিল। আবার কানন থেকে কাননে মঞ্জরিত মল্লিকায় সুরভিত 'তোমারি নামের' সঙ্গে সেই কুসুমকে উপমিত করলেন কেন? তবে সে-নাম সময়ের ধূসরতায় অনচ্ছ অন্য কেউ? নাকি, বয়েস যাকে হারিয়ে ফেলেছে সেই আর এক রবীন্দ্রনাথ? আর চারিদিকে কবির কোমল স্পর্শতাপিত বাণী আর এক কবির কথা, সেদিনের হারানো প্রণয়প্রাণিত কবির কথা মনে করিয়ে দেয়? তবে বিরহের অনির্দেশ্য ব্যথাভরা লিপিখানির কথা আজ যে কবির উচ্চারণের ভিতর দিয়ে তাঁর কাছে এল সেই বাণী, সেই উচ্চারণ কেন বিরহিত, বেদনাগাঢ়
বেদনাগাঢ়? তবে কবির কবিতায় যে মানসী-প্রতিমার ছায়া বারবার ঘনিয়ে আসে, তার কোন পুরনো লিখনের স্মৃতিই তাঁকে,মাধবী শাখার আন্দোলনের অনুষংগে চঞ্চল করে তুলেছে? এই গানে সেই করুণরঙিন বেদনাবিভাবিত নানা সম্ভাবনা আবার পুরনো আখরগুলির কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। আর সেই বেদনার স্বর বেহাগের সুরে শ্রোতার ভিতরে এক অনির্ণীত আবেগের সঞ্চার করলো। সেখানেই গানের কথা আর সুরের মিলিত রূপের স্পষ্টতা। আধুনিক মন একেই কি বলবেন অর্থ -পার -হওয়া অ্যামবিগুইটি? খুঁজতে চাইবেন জীবন আর শিল্পমেলানো রূপমূর্তির নেপথ্য পটটিকে?
" লিখন তোমার ধুলায় হয়েছে ধূলি,
হারিয়ে গিয়েছে তোমার আখরগুলি।।
চৈত্ররজনী আজ বসে আছি একা,পুন বুঝি দিল দেখা-----
বনে বনে তব লেখনীলীলার রেখা,
নবকিশলয়ে গো কোন্ ভুলে এল ভুলি তোমার পুরানো আখরগুলি।।
মল্লিকা আজি কাননে কাননে কত
সৌরভে-ভরা তোমারি নামের মতো।
কোমল তোমার অঙ্গুলি-ছোঁওয়া বাণী মনে দিল আজি আনি
বিরহের কোন্ ব্যথাভরা লিপিখানি।
মাধবীশাখায় উঠিতেছে দুলি দুলি তোমার পুরানো আখরগুলি।।"
সমাজ জীবনে নারীর "ভূমিকা"?
মধুপর্ণা কর্মকার
উত্তমদা সেদিন বললেন সমাজ জীবনে মেয়েদের ভুমিকা নিয়ে কিছু লিখতে। তারপর সমাজের দিকে তাকিয়ে দেখলুম যেদিকেই তাকাই সব দিকেই বৈষম্য। অন্তত যে লেন্স থেকে সমাজকে দেখার চেষ্টা করছি, গবেষণা সূত্রে। সেদিক থেকে দেখলে আরাে নানা বৈষম্যের মধ্যে প্রথমেই চোখে পড়ে লিঙ্গ বৈষম্য। এখানে বলে নেওয়া ভাল সব বৈষম্যই আসলে পরস্পর সম্পর্কিত। আরাে নানা বৈষম্যের সংগে লিঙ্গ বৈষম্যের সম্বন্ধ অতি ঘনিষ্ঠ । বিশেষ একটি লিঙ্গের মানুষকে কারন ছাড়াই সমস্যার মধ্যে দূর্গতির মধ্যে হেনস্থার মধ্যে ফেলে রাখে আমাদের সমাজ। এখন কোন দিকটা নিয়ে লিখি। আসলে বিষয় হল কাঠামাে। একটা কাঠামাের মধ্যে যখন সমস্যাটা থাকে তখন সেখান থেকে যা যা উৎপন্ন হবে সব কিছুর মধ্যেই থাকবে সেই কাঠামাের গুণ। তাই সমাজের অভ্যন্তরে যে বৈষম্যের বীজ রােপিত হয়ে আছে তাই আসলে ডালপালা মেলে আমাদের সমাজের সর্বত্র ছড়িয়েছে। এখন যদি সমাজের দিকে তাকাই তাহলে সবদিকেই সেই বিষবৃক্ষের ফল দেখতে পাব। ভাষায়, শিল্পে, সাহিত্যে, সংস্কৃতিতে, পােশাকে, পেশায়, সিনেমায়,
বিজ্ঞাপনে, শিক্ষায়, ধর্মে। এই এক একটি বিষয় নিয়ে আলাদা আলাদা আলােচনা করে কি লাভ, কতদূর
তার প্রভাব আমি জানি না। মূল কাঠামােটাকে আঘাত করতে পারলে তবেই লিঙ্গ বৈষম্যপূর্ণ সমাজের ডালপালা আর উৎপাদিত ফলের চরিত্র গুনাবলী আপনিই বদলে যাবে হয়তো।
তারপরেও সমাজের ভিন্ন ভিন্ন ছোট ছােট বিষয় গুলাে তুলে ধরে আলােচনা করার দরকার আছে। কেন আছে? তার কারন আমরা নিমজ্জিত হয়ে আছি বৈষম্যের ভয়াল নাগপাশে। সেখানে ভ্রম ও বিভ্রম বিস্তর। যা কিছু প্রতিষ্ঠিত জ্ঞান ধ্যান ধারনা সেই সব থেকে নিজেকে মানসিক ভাবে বের না করতে পারলে আমাদের কাছে লিঙ্গ বৈষম্যের চেহারাটা ধরা পড়ে না। এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ধরা পড়ে না কার্য কারন। তাই ছােট ছোট বিষয় গুলােকে সন্দেহ করতে শিখলে, সমালােচনা করতে শিখলে তবেই মূল জায়গায় নজর পড়বে। কাঠামােকে প্রশ্ন করার কথা আমাদের মনে আসবে । তাই উত্তমদা যেভাবে বললেন, সমাজ জীবনে মেয়েদের ভূমিকা বা অবস্থান নিয়ে লেখার কথা তা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক আর তাৎপর্যপূর্ণ। সেই ভাবে সমাজের নানা ক্ষেত্রকে পর্যবেক্ষন করে সেই পটভুমিতে আলােচনা করাটাও জরুরি।
লিঙ্গ অসাম্য যেভাবে আমাদের সমাজের মজ্জার মধ্যে ঢুকে আছে সেখান থেকে আমাদের মন ও মনন বের করে আনতে হলে লিঙ্গ বৈষম্য সম্পর্কে সচেতনতা জরুরি এবং সেই সচেতনতার প্রতিনিয়ত চর্চা জরুরি। যখন আমরা সামাজিক নানা বিষয়ের সংগে সংগে নিজেদের প্রতিটা কাজ, প্রতিটি কথার আত্মসমালােচনা করতে করতে নিজেদের জীবনচর্যার খােলনলচে বদলাতে বদলাতে এগিয়ে যেতে পারব তখন এই তথাকথিত সচেতনতার একটা অর্থ দাঁড়াবে। অন্যথায় এই সমাজ জীবনে নারীর "ভূমিকা" ও "অবস্থান" একটা বিষয় মাত্র হয়ে থেকে যাবে। তা নিয়ে লেখা হবে দিস্তা দিস্তা ছাপাও হবে বিস্তর। কিন্তু জগদ্দলের মত চেপে থাকা লিঙ্গ বৈষম্যের এই ভার নামবে না আমাদের সমাজের ভিত্তি থেকে। নারীরা বহন করে যাবেন এই দূর্বিষহ বোঝা, তাদের ক্ষমতার বুদ্ধির অপচয় হবে সর্বত্র। এবং আমরা "নারীকেন্দ্রিক" লেখা লিখে নিজেদের ইগাে সেঁকে নিতে থাকব ক্রমাগত।
সমাজ জীবনে "নারীর" ভুমিকা যখনই বলছি তখনই একটা "আদারিং" করছি অর্থাৎ একটা নারীকে "অপর" ভাবার একটা সূক্ষ্ম বিষয় এখানে কাজ করছে। যেন নারী সমাজের মূল উপাদান নয়, বিচ্ছিন্ন কিছু। "সমাজ জীবনে পুরুষের অবস্থান ও ভুমিকা" বিষয়ে কেউ প্রবন্ধ পৃথিবীর কোন প্রান্তে আদৌ লিখবে না। কয়েকটা শিরােনাম যদি ভাবার চেষ্টা করি , অমুক সাহিত্যে পুরুষের অবস্থান আলােচনা, তমুক শিল্পে সংস্কৃতিতে পুরুষের অবদান, হ্যান সিনেমায় পুরুষের চিত্রায়ন বিষয়ে মনােজ্ঞ বিশ্লেষণ, ত্যান শিক্ষায় অথবা ধর্মে পুরুষের অবস্থান ও ভূমিকা আলােচনা । কেমন হাস্যকর শােনাচ্ছে না ? তার কারন সমাজটা যেন তাদেরই। যার মালিকানা স্বীকৃত, তার আবার ভূমিকা কিসের ? একাধিপত্যের এটাই ভাষা। "অপর" বানানো। তারপর সেই "অপর"কে ছেলে ভুলানাের মত ভুলিয়ে রাখা। সক্ষমতা সম্পর্কে, অবস্থান সম্পর্কে বিস্মৃত করে রাখা যাতে নিজেদের ক্ষমতা কায়েম রাখা যায়। এইবার “পুরুষ"এর জায়গায় "নারী" বসিয়ে শিরােনাম গুলাে আরেকবার পড়ুন। এইবার খুব চেনা লাগছে নিশ্চয়। কারন আমরা শিরােনাম গুলাে আখছার শুনছি সমাজের সর্বত্র, দেখছি পত্র পত্রিকায়, অ্যাকাডেমিক লেখায়, সেমিনারে , বিজ্ঞজনদের আড্ডায়। শুনে আমাদের আস্বাভাবিক কিছু মনে হচ্ছে না। এক ধরনের অস্বীকৃতি থেকে এই "ভুমিকা"র বিষয়টা আসে। তার মূল অংশকে লঘু করে তাকে ভুলিয়ে রাখার জন্য ভূমিকা আলােচনা করা হয়। আলোচনার বিষয় নির্বাচন ও আলােচনার
ভাষা আসলে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জমে থাকা বৈষম্যের বিষাক্ত ঘন অন্ধকারের রাজনীতির বাইরে নয়। এ নিয়ে নারীবাদী ভাষাতাত্ত্বিকগণ তাত্ত্বিক আলােচনা করেছেন। আপাতত সেদিকে আর যাচ্ছি না। তবে শেষে এইটুকু বলি, প্রচলিত আলােচনার বিষয়, তার বয়ান, ভাষার সংগে লিঙ্গরাজনীতি প্রসূত ক্ষমতার সম্পর্ক - বিষয় গুলাে শুনতে জটিল মনে হলেও আমরা প্রতিদিন প্রতিনিয়ত তার চর্চা করছি জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতসারে।
:- গবেষক, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়
পুরুলিয়ার ছো ও তার বিবর্তন
তপন পাত্র
লোকনৃত্য হিসাবে ছো নাচ আর শুধু ভারতবর্ষ নয়, বিদেশেও একটি সবিশেষ পরিচিত ও আকর্ষণীয় নাম । স্বদেশ ও বিদেশে এই নৃত্যশৈলীর এখন বেশ সমাদর । তবে নাচটিকে নানা জন নানা নামে ডাকে --- "ছৌ নৃত্য" , "ছৌ নাচ" , "ছো নাচ" , "ছ নাচ" , "ছউ নাচ" ইত্যাদি । সে যে নামেই ডাকা হোক, বোঝানো হয় সেই বিশেষ একটি নির্দিষ্ট লোকনৃত্যকেই , যে নৃত্যের সাথে 'পুরুলিয়া' নামটি রক্তে হিমোগ্লোবিনের মতো মিশে আছে । মিশে আছে সবুজ পাতায় ক্লোরোফিলের মতো ।
সকলেই জানেন এই নৃত্যের এলাকা বাংলা , বিহার এবং উড়িষ্যা । পশ্চিমবাংলার পুরুলিয়া ও ঝাড়গ্রামে এর প্রচলন । নাম সাধারণত "ছৌ নাচ"। বিহার তথা অধুনা ঝাড়খণ্ডের সেরাইকেলা , ধলভূম , ধানবাদ , রাঁচি প্রভৃতি অঞ্চলে এই নৃত্য দেখা যায় । এখানে প্রচলিত নামটি হ'ল "ছ নাচ" । উড়িষ্যার ময়ূরভঞ্জ কেওনঝোড় এলাকায় এই নাচের নাম "ছউ নাচ" ।
ছো নাচের সাজ-পোশাকের মধ্যে প্রধানতম হলো মুখোশ । তবে ময়ূরভঞ্জের "ছউ নাচে" মুখোশের ব্যবহার হয় না ।
ঠিক কবে , কোথায়, কীভাবে ছো নাচের সূত্রপাত তা খুব একটা স্পষ্ট করে বলা বড়ো মুশকিল । এই নাচের স্বরূপ জানতে হলে এর উদ্ভব এবং ক্রমবিকাশের পর্যায়গুলি অনুধাবন করা প্রয়োজন । পুরুলিয়ার "চৈৎ পরব" বা শিব গাজনের সঙ্গে এই নৃত্যের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক । গাজন বা চড়কের দিন থেকে ১৩ জ্যৈষ্ঠ রোহিনীর দিন পর্যন্ত সারা জেলার ৩০০ -রও অধিক মেলা বসে । মূল আকর্ষণ ছো নাচ ।
বহু প্রাচীনকাল থেকেই পুরুলিয়ায় গাজন উপলক্ষ্যে "কাপ" -এর প্রচলন রয়েছে । "কাপ" হলো "সং সাজা" । পুরুলিয়ায় "ছৌ" শব্দটি "সং" অর্থেই ব্যবহৃত হয় । আন্দাজ করা যায় "কাপ" থেকেই "ছো নাচে"র উৎপত্তি । কারণ ছো নাচের প্রথমদিকে মুখোশের ব্যবহার ছিল না । রং মেখে সং সেজে নৃত্য প্রদর্শন করা হতো । পরে রামায়ণ, মহাভারতের কাহিনী অবলম্বনে পালা-নৃত্য শুরু হ'লে মুখোশের প্রয়োজন দেখা দেয় , মুখোশের ব্যবহারও শুরু হয় । একসময় ছো নাচ হয়ে ওঠে "মুখোশ নৃত্য" ।
ত্রিধারা ছো প্রচলন থাকলেও পুরুলিয়ার ছো সবচেয়ে প্রাচীন । তার প্রমাণ এর মঞ্চ । খোলা আকাশের নিচে মাটির উপরেই নাচের আসর বসে। চারদিকে গোলাকার স্থানটি ছেড়ে দর্শকেরা বসে পড়েন অথবা দাঁড়িয়ে থাকেন । মাঝে একটি পথ দিয়ে নৃত্যশিল্পীরা প্রবেশ ও প্রস্থান করেন । একসময় নৃত্য প্রদর্শনের জন্য হ্যাজাক লাইট-ই ছিল যথেষ্ট । বর্তমানে বৈদ্যুতিক আলোর ব্যবস্থা থাকে ।
পুরুলিয়ার ভূমিজ ও কুড়মি সম্প্রদায়ের মানুষ-ই ছো নাচের ধারক এবং বাহক। এছাড়াও অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির মানুষ নৃত্যটির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক যুক্ত। এই নৃত্যের রস হল বীর রস । আগামী বর্ষায় ভালো বৃষ্টি এবং ভালো ফসলের আশায় বৃষ্টির দেবতাকে আহ্বান জানানোর জন্যই এই নৃত্যের পরিকল্পনা ।
সম্প্রতি পুরুলিয়ার ছো সারা পৃথিবীর কাছে পরিচিত হ'লেও খুব বেশি দিন আগে এর এই খ্যাতি প্রতিপত্তি ছিল না । ১৯৫৬ সালের পয়লা নভেম্বর পূর্বতন মানভূম জেলা ভেঙে এর কিছুটা অংশ পুরুলিয়া নামে পশ্চিমবাংলার অন্তর্ভুক্ত হয় । এর পরই একটু একটু ক'রে পুরুলিয়ার ছো জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ।
১৯৩০-৩২ সালে ছো নাচ বিদেশের মাটিতে পা রেখেছিল । সেটি অবশ্য পুরুলিয়ার ছো নয় । সেরাইকেলার ছ নাচ । সেরাইকেলার যুবরাজ একটি দল নিয়ে লন্ডনে হাজির হয়েছিলেন । সে বার সে নাচ তেমন একটা প্রচার আলোয় আসেনি । ভারতের স্বাধীনতা লাভের পর ১৯৫৩ সালে কলকাতা রাজভবনে দেশবন্ধু তহবিলে অর্থ সংগ্রহের জন্য আয়োজিত "স্টার্স্ অফ ইন্ডিয়া" শো তে মধু রায় তাঁর দল নিয়ে পুরুলিয়ার ছো নাচ প্রদর্শন করেন । এরপর স্বাধীনতার প্রায় কুড়ি বছর অতিক্রান্ত হলে লোকসংস্কৃতি গবেষকদের নজরে আসে পুরুলিয়ার ছো ।
১৯৬৬ সালে পুরুলিয়াতে এলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ডক্টর আশুতোষ ভট্টাচার্য ও ফরাসী গবেষক মেলিনা সেলভানি । উদ্দেশ্য পুরুলিয়ার ছো নাচকে বিশ্বের দরবারে পরিচিত করা । শুরু হল নির্বাচন প্রক্রিয়া । ১৯৬৮ সালে "মাঠা ছো উৎসবে" জেলার বিশিষ্ট দলগুলি অংশগ্রহণ করলো । বাগমুন্ডি থানার চড়িদা গ্রামের গম্ভীর সিং মুড়ার ছো নাচের দলটি শ্রেষ্ঠ দল হিসাবে বিবেচিত হলো । প্রাথমিক প্রস্তুতি হিসাবে ১৯৭১সালে পুরুলিয়ার রবীন্দ্রভবনে প্রদর্শিত হল গম্ভীর সিং মুড়ার ছো নৃত্যানুষ্ঠান । ১৯৭২ সালে শুরু হলো বিদেশ সফরের পালা । প্রথম পর্যায়ে ইংল্যান্ড, প্যারিস, হল্যান্ড, স্পেন, হাওয়াই দ্বীপ, অস্ট্রেলিয়া , উত্তর আমেরিকা প্রভৃতি দেশে সাফল্যের সঙ্গে প্রদর্শিত হলো পুরুলিয়ার ছো । এককথায় বিশ্ব জয় করল পুরুলিয়ার এই লোকনৃত্য ।
১৯৮১সালে গম্ভীর সিং মুড়া ভারতের রাষ্ট্রপতির হাত থেকে নিলেন পদ্মশ্রী খেতাব । তার দু'বছর পর ১৯৮৩ সালে পদ্মশ্রী পেলেন নেপাল মাহাতো । পরবর্তীকালে ছো শিল্পী সতীশ মাহাতো , চিনিবাস মাহাতো , ডি.সি. মাহাতো, ভগবান দাস কুমার প্রমূখ ব্যক্তি পেলেন "লালন পুরস্কার" । ছো নৃত্যে অসামান্য অবদানের জন্য দিলীপ মাহাতো পেয়েছেন বিসমিল্লাহ্ খাঁ পুরস্কার । ২০১৫ সালে জাগরু মাহাতো পেয়েছেন "সংগীত-নাটক একাডেমী পুরস্কার" ।এককথায় ছো নাচে এসেছে স্বর্ণযুগ ।
তবে সময়ের সাথে সাথে ছো নাচে অসম্ভব ধরণের পরিবর্তন নজরে আসছে । যে নাচ একসময় খোলা মাঠে হ্যাজেক -এর আলোতে অনুষ্ঠিত হ'ত , তা এখন প্রদর্শিত হচ্ছে সুসজ্জিত জাপানি আলোকমালায় আলোকিত নাট্যমঞ্চে । এক সময় এই নাচ ছিল এক প্রকার মূকাভিনয় । কিন্তু এখন ভাষ্যকারের বিরাট ভূমিকা যুক্ত হয়েছে । আজকের প্রজন্ম বুঝতেই পারবে না ছ নাচের স্বরূপ । এখন ঝুমুর গানের পরিবর্তে ব্যবহৃত হচ্ছে বাউল গান , দেশাত্মবোধক সংগীত রবীন্দ্র সংগীত ; কোথাও আবার বেজে উঠছে চটুল হিন্দি গানের সুর । নাচের পালা আজ রামায়ণ, মহাভারত ,পুরাণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই ; বিষয়বস্তু হিসাবে আসছে কার্গিল যুদ্ধ, নীল বিদ্রোহ , সাঁওতাল বিদ্রোহ, জলবিভাজিকা প্রকল্প, একশো দিনের কাজ, স্বচ্ছ ভারত, নির্মল বাংলা, সবার জন্য শিক্ষা , পরিবার পরিকল্পনা , বাল্যবিবাহের অভিশাপ , ডাইনি প্রথা, পথশ্রী, কন্যাশ্রী ইত্যাদি । এখন করোনা মরশুমে ছো নাচ হচ্ছে , পালার নাম "করোনাসুর বধ" ।
বাদ্যযন্ত্র হিসাবে ঢোল, ধমসা, জুড়ি নাগড়া, চেড়ে পেটে, ফুলেট, কর্নেট এর পাশাপাশি মঞ্চে আসছে শ্রীখোল , করতাল, সিন্থেসাইজার, সেক্সোফোন ইত্যাদি । এখন মাইক ছাড়া ছো নাচ হয় না । শিল্পীদের বিভিন্ন চরিত্রে প্রদর্শনের সময় সারা গায়ে জ্বলছে বিজলী বাতি । কোনো কোনো পালাকে অধিক নাটকীয় করে তোলার জন্য নাচের মঞ্চে যূপকাষ্ঠ স্থাপন করে দেওয়া হচ্ছে জীবন্ত ছাগ বলি ।
সময়ের সাথে সাথে অন্যান্য লোকনৃত্য এবং লোকসংগীত -এর মতো পুরুলিয়ার ছো নাচও তার নিজস্বতা হারাচ্ছে । কৌলিন্য জলাঞ্জলি দিচ্ছে । পূর্বে ছো নাচের জন্য যে মেহনত করতেন শিল্পীরা , সেই কসরত , পরিশ্রম আর দেখা যাচ্ছে না । সস্তায় বাজিমাত করার প্রবণতা , চলচ্চিত্র ও যাত্রার এবং সার্কাসের কাছ থেকে ধার নেওয়া বিষয়গুলি ছো নাচের আভিজাত্য নষ্ট করছে । আর রক্ষণের নামে কর্মশালাগুলিতে , বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিপ্লোমা কোর্সে যা হয় , যা হচ্ছে তা ছো নাচ নয় , ছো নাচের প্রোজেকশন্ । "চোখে আঙুল দাদার" প্রতিবন্ধী নির্মাণ । যারা পুরুলিয়ার মাটির কাছাকাছি মানুষ, যাদের জীবনে, যাপনে, হাঁটাচলায় , কথা বলায় , যাদের সংস্কৃতিতে মিশে আছে এই হৃদয় উথলে ওঠা নৃত্য, তথাকথিত লোকনৃত্যের পাণ্ডিত্যের আসরে তারা ব্রাত্য , একশ্রেণীর পোশাকি লোকনৃত্যপ্রেমিক, সংস্কৃতির ফড়েদার ও পদোন্নতির আকাঙ্ক্ষায় উদ্ভ্রান্ত গবেষক এই নৃত্যকে বিকৃতির রাজ্যে পৌঁছে দেবার বীভৎস খেলায় মেতেছেন । তাই প্রকৃত ছো নাচের ধারাবাহিকতা রক্ষা ও ইতিহাস রচনায় আজ বড়ো দুর্দিন ।
ফিরে দেখা
রবীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
রাসায়নিক সার দিয়ে উচ্চফলনশীল ধানের চাষ করার ফলে ধানের উৎপাদন অনেকটাই বৃদ্ধি পেলো, জলের চাহিদা দ্বিগুণ হয়ে গেল। কিন্তু মাছ কাঁকড়া কিছুই জন্মালো না। সব পুকুর থেকে জল সেচের অনুমোদন ছিল না। তাই জলের চাহিদা মেটাতে পাকা রাস্তার ধারে, রেললাইনের ধারে, ডোবার (নিচু জমির) জল তুলে চাষের জমিতে দেওয়া শুরু হলো। এই ডোবা গুলোতে বছরে ৭/৮ মাস জল থাকতো। শোল শাল ল্যাটা চ্যাঙ এই ধরনের কিছু মাছ পাওয়া যেতো, এসব ভদ্রলোকের বাড়িতে ঢুকতো না, ফলে অলিখিত ভাবে বাগদি বাউড়ি দুলেদের দখলেই ছিল। চাষের জন্য জল নেওয়া শুরু হতেই, মাছ আর জন্মালো না। তবে ডোবা ভর্তি কলমি শাক জন্মালো। ভদ্রলোকদের রান্না ঘরে কিছুটা কলমি শাক পৌঁছে গেল। ডোবার জল সেচ করে এক বা একাধিক লোকের জমির ওপর দিয়ে নিজের জমিতে নিয়ে যেতে গিয়ে জল অনেকটাই অন্যের জমিতেই চলে যেতো। কোথাও বা এতো পথ পেরিয়ে জমিতে জল পৌঁছতে পারতো না। ফলে শুরু হলো জল নিয়ে চুলোচুলি, কোথাও বা মারামারি। আগে গ্ৰামের বয়স্করাই মীমাংসা করে দিতেন। তখন সবাই মিলে বসে একটা সুষ্ঠুভাবে মীমাংসার জন্য বয়স্কদের কাছে যাওয়ার রেওয়াজও ছিল। অতীতে বহুবার এই ধরনের বিচার সভাও হয়েছিল। এখন ছেলে ছোকরাদের রাজ। বয়স্কদের কথা কেউ শুনতে বা মানতে রাজি হবেন না। আলাপ আলোচনা করে মীমাংসা নয়। জোর যার মুল্লুক তার। বয়স্করাও নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছিল। ফলে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হলেন দুর্বল মানুষেরা। নির্দিষ্ট জমিতে জল পৌঁছে দিতে, এসে গেল ইঞ্জিন চালিত দমকল (পাম্প সেট) সঙ্গে প্লাস্টিক পাইপ। সামান্য টাকা ভাড়া দিলেই দিনে বা রাতে জল জমিতে পৌঁছে যাচ্ছে। খরচটা অনেক কম। শুধু হারিয়ে যেতে বসলো ডোঙা। জল তোলার জন্য আর কিষেণ নিয়োগ করতে হচ্ছে না। যাঁরা জল পেলেন না, তারা দেশি ধানের চাষ শুরু করলেন। জল নেই, তাই রাসায়নিক সার দেওয়া যাবে না। পুকুরের পাঁক আর গোবর সার দিয়েই চাষ। সেখানেই একটু আধটু মাছ কাঁকড়া পাওয়া যাচ্ছিল। তবে সেটা আগের মতো নয়। ফলে কোন বাড়িতেই কেউ মাছ কাঁকড়া পাঠাচ্ছে না, কোন বাড়ির থেকে চালও পাওয়া যাচ্ছে না। বাউড়ি বাগদি দুলে'দের ঘরে রোজ আর হাঁড়ি চড়ছে না। পুকুরের পাড়ে, জলাজমিতে যে সেঁচি (?) শাক হতো এতকাল সেটা কেবল মাত্র বাঙাল পাড়ার বৌ ঝি'রাই রান্নার জন্য কদাচিৎ কখনো নিয়ে যেতেন। অধিকাংশটাই গরু ছাগলের পেটে যেতো। এবার বাউড়ি বাগদি দুলেদের রান্না ঘরে ঢুকে গেল সেই সাঁচি শাক। সাঁচি শাক সেদ্ধ খেয়ে পেট ভরানোর চেষ্টা।
সাঁওতাল পাড়ার অবস্থাও প্রায় একই রকম, মাছ কাঁকড়া তো নেই, মাঠে শামুকটাও পাওয়া যাচ্ছে না। তবে ধান কাটার পর মাঠের ইঁদুর ধরাটা একটা নেশা/পেশা। কাজটা এতদিন কেবলমাত্র সাঁওতালদেরই ছিল, পেটের টানে ধাঙড়'রাও এই কাজে জুড়ে গেলেন। সকালে শাক সেদ্ধ/ভাজা, নুন, লঙ্কা কোন কোন কোনো দিন একটু পিঁয়াজ দিয়ে এক জামবাটি আমানি সমেত পান্তা ভাত খেয়ে মাঠের পথে হাঁটা। মাঠের আল বরাবর ইঁদুরের গর্ত খুঁজে খুঁড়তে শুরু করা। দিনের শেষে একটা কী দুটো ইঁদুর কোনো কোনো দিন ইঁদুরের ভান্ডারে সঞ্চয় করা দেড়-দু পোয়া ধান জুটে যেত। কখনো বা গর্তের মধ্যে গোখরো বা দাঁড়াশ সাপ শুয়ে থাকতো। নির্ভীক এই জাতিরা যা পেত তাই নিয়ে বাড়ির পথে রওনা দিত। কিছু না পেলে খালি হাতেই। কোন কিছুতেই অতৃপ্তি নেই। সন্ধ্যায় নিজের মনে একলা বাঁশি বাজিয়ে চলেছে। চাঁদনী রাতে মহুয়া বা হাড়িয়া খেয়ে বা না খেয়ে ধামশা মাদল বাজিয়ে নাচ। ঝাঁপানের নাচ, বিয়ের নাচ, আনন্দের নাচ। কর্মঠ সুশৃঙ্খল জাতি। গভীর রাত পর্যন্ত নাচের উৎসবে মেতে থাকলেও ভোর বেলায় মাঠে হাজির হয়ে যেতে পারতো। কর্মঠ সুশৃঙ্খল জাতি। মা বোনদের সম্মান রক্ষা করতে জানতেন। সাঁওতালদের বিয়েতে বা ঝাপানে অবাধ আগমন ছিল, কিন্তু কোন উশৃঙ্খলতা বরদাস্ত করতো না। মা বোনের ইজ্জত রক্ষা করতে তীর ধনুক টাঙ্গি ব্যবহার করতেও কুন্ঠা বোধ করতেন না। ঝাঁপানে বহু হত্যার কারণ সাঁওতাল মা বোনের ওপর অশোভন আচরণ করা বা আচরণের চেষ্টা করা। বাগদি বাউড়ি দুলে'দের বাড়ির পুরুষেরা যদি তাদের মা বোনেদের সাঁওতালদের মতো পুরোটা না হলেও আংশিক ইজ্জত দিতে জানতো তবে ভদ্রলোকদের নোংরামি পুরো না হলেও অর্ধেকের বেশি বন্ধ হয়ে যেতো। অনেকেই মনে করেন, বংশানুক্রমে বাবুদের লেঠেল ছিল বলেই, বাবুদের বিরুদ্ধে লাঠি তোলা তো দুরের কথা, মাথা তুলে কথা বলার হিম্মতও ছিল না। আবার কেউ কেউ মনে করেন, লেঠেল হলেও, ওঁরা আসলে কুঁড়ে। সাঁওতালদের মতো পরিশ্রমী নয়। ওঁরা আসলে সারাদিন ধরে কঠিন/কঠোর পরিশ্রম করতে পারতেন না। তাই সংসারের হাল বাড়ির মেয়েদেরকেই ধরতে হোত। চাষাবাদের কাজ তো ৩৬৫ দিন জুটবে না, তাই ভদ্রলোকের বাড়িতেই কাজ করতে যেতেন। লোকের বাড়ির কাজ করতে গিয়ে কোন এক অসর্তক মুহূর্তে স্ব-ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়তেন। কিন্তু যে প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া যায় নি, কেন ওই মানুষগুলো নিজের মা বোনের ইজ্জত রক্ষা করার মানসিকতাটুকু জন্মালো না? হাজার চেষ্টা করেও কোন উত্তর পাওয়া যায় নি। আজও তাদের মা বোনেরা তথাকথিত ভদ্রলোকের হাতে ধর্ষিত লাঞ্ছিত। আগে ছিল জমিদার জোতদাররা। এখন তাঁদের উত্তরসূরী হয়েছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক ফয়েলে মোড়া বাস্তুঘুঘুরা। যেসব প্রশ্নের উত্তর আজও মেলেনি, গ্ৰামে
গোয়লা, সদগোপ, তেলী, তামলি, নাপিত, কামার পাড়া, কুমোড় পাড়া, জেলে পাড়া, ধোপা পাড়া, ডোম পাড়াও ছিল। তাঁদের পরিবারের মা বোনেদের সঙ্গে এ ধরনের ব্যবহার কেউ করতে পেরেছেন বলে শোনা যায় না। তবে কেন বাগদি বাউড়ি দুলে'দের সঙ্গে এই ধরনের ব্যবহার করা সম্ভব হয়েছে।
পাকা রাস্তা দিয়ে প্রায় সব পাড়াতেই ঢোকার রাস্তা থাকলেও অধিকাংশ মানুষই স্কুল ঘরের রাস্তাটাই ব্যবহার করতো। আগে বারোয়ারী তলায় বয়স্ক মানুষদের আড্ডা বসতো। তাই কেউই বয়স্কদের সামনে দিয়ে সাইকেল চালিয়ে যেতেন না। বয়স্কদের আড্ডা বন্ধ হয়েছে, কিন্তু মানুষের অভ্যাস পাল্টায়নি। ছাড় ছিল শুধু গণেশ ডাক্তারের। সাতটা গ্ৰামের সবার ডাক্তার। গণেশ ডাক্তার। আবাল বৃদ্ধ বনিতা, জ্বর জ্বালা যাই হোক না কেন দুটো গুলি/ফোঁটা নিজের হাতে খাইয়ে দেবেন। সেদিন বা পরের দিন ওষুধ দিয়ে যাবেন। ডাক্তারের ফি ও ওষুধের দাম সামান্য হলেও অধিকাংশ মানুষই দিতে পারতেন না। অনেকে আবার ভিজিট না দিয়ে কলাটা মুলোটা ডাক্তারের বাড়িতে পৌঁছে দিতেন। ভিজিট দিক বা না দিক গণেশ ডাক্তার রুগীকে দেখতে হাজির হবেন, ওষুধও দিয়ে যাবেন। সাঁওতাল ধাঙড় থেকে বামুন কায়েত এমনকি মুসলমান মেয়েরা গর্ভবতী হলেই গণেশ ডাক্তারের স্মরণাপন্ন হতেন। কেউ সরাসরি বলতে না পারলে শাশুড়ি, ননদ বা প্রতিবেশী'কে দিয়ে বলাতেন। মাতৃত্বকালীন খাদ্য তালিকাটা গণেশ ডাক্তারই করে দিতেন। তাঁর প্রধান পথ্য ছিল আউস চালের ফ্যানাভাত, গুগলী ও সজনে পাতা, গুড় দিয়ে কাঁচা হলুদ বা হলুদ বাটার সঙ্গে কাঁচা তেল, রশুন। এছাড়াও ডুমুর, কাঁচা কলা, থোর, কুলেখাড়া, শুশনি শাক, বাকস পাতা, থানকুনি পাতা, পাথরকুচি পাতার রস ইত্যাদি। পথ্যের ওপর বিশেষ নজর দিতেন। মাঝে মধ্যেই খবর নিতেন। প্রয়োজনে ওষুধ দিতেন। প্রসব যন্ত্রণা উঠলে গণেশ ডাক্তার নিজে থাকতেন, সঙ্গে নাপিত-বৌ ধাত্রীর দায়িত্ব পালন করতেন। প্রসবের জন্য খুব একটা শহরের বুকে পাঠাতেন না। প্রসব হতে গিয়ে মারা গেছেন এমন ঘটনা কখনো ঘটেছে বলে কেউ শোনেননি। কারুর ঘা বা ফোঁড়া হলে শুধু নাপিত বৌ নয়, নাপিতরাও ক্ষুর, নরুন নিয়ে গণেশ ডাক্তারের সহযোগী হতেন। শুধু মাসের মধ্যে ৫/৭ দিন অনাহারে থাকা মানুষের জন্য কোন ওষুধ গণেশ ডাক্তারের জানা ছিল না। বহু বাচ্চা দুপুরে খিদের জ্বালায়, বৈঁচি ফল, বেল, কদবেল, কামরাঙা, তেঁতুল খেয়ে পেট ভরাতো। গণেশ ডাক্তারের বিনা পয়সার ওষুধও ওদের আর কাজে লাগছে না।
মুসলমান পাড়ার অবস্থাটা অন্যান্যদের চেয়ে অনেকটাই স্বচ্ছল ছিল। জমিতে নিজেরাই লাঙ্গল দিতে পারতেন। বামুন কায়েতের মতো লাঙ্গল দেওয়ার ওপর কোন বিধি নিষেধ ছিল না। তবে মাবস্যায় ওঁরাও জমিতে লাঙ্গল দিতেন না। ওনারা সব ধরনের চাষের কাজ নিজের হাতে করতে পারতেন। বাড়িতে গরুর পাশাপাশি ছাগল পালন করতেন। তৎসহ হাঁস মুরগি পালন করে বেশ কিছুটা নগদ পয়সার মুখ দেখতে পেতেন। সব মিলিয়ে আর্থিক স্বচ্ছলতাটা ছিল। গ্ৰামের বেশ কিছু সাঁওতাল ধাঙড় বাগদি বাউড়ি দুলে পরিবারের কাছে এটাই একমাত্র সারা বছরের কাজের জায়গা হয়ে গেল। চাষাবাদের কাজ ছাড়াও ধান সেদ্ধ-শুকনো করা, মুড়ি ভাজা, খড় কাটা, গরু ছাগল হাঁস মুরগির খাবার দেওয়া, গাই দোয়া, ছানা কাটানো, গঞ্জে ময়রার দোকানে ছানা পৌঁছে দেওয়া, প্রতিটি কাজের দায়িত্ব ছিল কিষেনদের ওপর। সারা বছর ধরে কাজ। মজুরী ছিল বিবাহিত বা অবিবাহিত ছেলেমেয়েদের আড়াইপো চাল, মেয়েদের বাচ্চা থাকলে তিন পোয়া চাল, সঙ্গে আধ পোয়া আলু, এক তোলা সরিসার তেল, একটু সবজি (কুমড়ো, পটল, বেগুন, মুলো যখন যা পাওয়া যায়) আর নগদ দু'আনা। ঘরের লাউ বা কুমড়ো শাক, কাঁচা লঙ্কা থাকলে সেটা ফাউ হিসেবে দেওয়াটাই রেওয়াজ ছিল। ধান রোয়া (রোপণ), ধান কাটা, ধান ঝাড়ার সময় দুপুরের ভাত মনিবের বাড়ির থেকে আসতো। মুসলমান বাড়িতে নবান্ন বলে কিছু ছিল না। নতুন ধানের চাল তৈরি হয়ে গেলেই, একটা খাওয়া দাওয়ার উৎসব হোত। মাছ-ভাত, সঙ্গে দু-একটা ভাজা, এক আধটা সবজি সঙ্গে পায়েস। ধান বিক্রি হয়ে গেলে প্রতিটি কিষেন বাগালকে (রাখাল) নতুন গেঞ্জি, গামছা ও ধুতি, মেয়েদের কাপড় (আট হাত), ছোট সায়া দেওয়া হতো। কেউ কেউ কোলের বাচ্চাদেরও জামা-কাপড় দিতেন। ঈদে গ্ৰাম সুদ্ধু সবার নেমন্তন্ন। সিমুইয়ের পায়েস আর মাখামারা সন্দেশ খেতে বামুন কায়েতরাও হাজির হতেন। মুসলমান বাড়িতে খেয়েদেয়ে পুকুরে ডুব দিয়ে ঘরে ঢুকে যেতেন। হিন্দুর বাড়িতে সত্যনারায়ণ পূজাতেও মুসলমান পাড়ার সবাইকেই নিমন্ত্রণ করা হোতো। ফকিরকে বিশেষ যত্ন করে নিমন্ত্রণ করা হোত, কারন পুজোর পাঁচটা মোকামের একটা ফকিরের হাতে তুলে না দিলে সত্যনারায়ণ পূজোটাই অসম্পুর্ন হয়ে যাবে। নিজের গ্ৰামে ফকির না থাকলে অন্যের গ্ৰামের ফকির কে নিয়ন্ত্রণ করা হতো। তখন শুধু সেই গ্ৰামের ফকিরকেই নয়, সেই গ্ৰামের প্রতিটি মুসলমানকেও নিমন্ত্রণ করা হতো। একমাত্র দোল ছাড়া প্রায় প্রতিটি পূজাপাব্বনে মুসলমানরা অংশ গ্ৰহন করতেন। বারোয়ারি তলার পূজাতে বামুন কায়েত গয়লা সদগোপ বাগদি বাউড়ি দুলেদের সঙ্গে মুসলমানদের বাচ্চারাও ঢাকের তালে নাচতো। সাঁওতাল ধাঙড়দের বাচ্চারা নাচতো না তবে তারা সঙ্গে থাকতো। ফল প্রসাদ, যদিও সামান্য, কিন্তু সবার হাতেই তুলে দেওয়া হতো। সবজাতের যুবকেরা/বয়স্করা ধুনুচি নাচে অংশগ্রহণ করতেন। কোন কোন গ্ৰামের মানুষ নিজেরাই নাটক বা যাত্রা অভিনয় করতেন। তবে সেটা ছিল স্ত্রী বর্জিত। সেই যাত্রা/নাটকে বামুনের ছেলে ফকির, কখনো মুসলমানের ছেলে পুরোহিতের অভিনয় করতে দেখা যেত। আবার সীতা বা দ্রৌপদীর মুখ দিয়ে ধোঁয়া বের হতে দেখে সবাই ভক্তিভরে প্রণাম করতেন। সেই মূহূর্তে সরল মানুষগুলো ভাবতেই পারতেন না এটা অভিনয়, অভিনেতা একজন পুরুষমানুষ।
যৌথতা ভেঙ্গে যায় (দশম কিস্তি)
নির্মল হালদার
চিরঞ্জীব তখন পুরুলিয়া জিলা স্কুলের ছাত্র। হোস্টেলে থাকে। উজ্জ্বল ময়ূখের এক ক্লাস নিচুতে পড়ে। দিলীপ আমার সঙ্গে চিরঞ্জীবের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। দিলীপ, দিলীপ বন্দ্যোপাধ্যায় তখন জেলা স্কুলে পড়ছে এবং দিলীপ স্কুল বয়স থেকেই কবিতা চর্চা করে। সেই কারণেই দিলীপের সঙ্গে চিরঞ্জীবের যোগাযোগ। তার সুবাদেই তাদের হোস্টেলে গেছি কয়েকবার। ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল বন্ধুত্বের।
উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে সে চলে গেল কলকাতা। প্রেসিডেন্সি কলেজ। তার বাবাও সম্ভবত পুরুলিয়ার বলরামপুর থেকে বদলি হয়ে গেছিলেন।মাঝখানে অনেকদিন যোগাযোগ ছিল না, তারপর আবার শুরু হলো। আমি তখন ঘনঘন কলকাতা যাই। বন্ধুদের বাড়ি থেকে হোস্টেল ও মেসবাড়িতে উঠি।
নতুন করে চিরঞ্জীবের সঙ্গে দেখা হতেই, প্রেসিডেন্সি কলেজের হিন্দু হোস্টেলে উঠতে শুরু করি।
হিন্দু হোস্টেলের প্রাচীন স্থাপত্য, কাঠের সিঁড়ি আমাকে খুব টানতো। আমি তখন আর বন্ধুদের বাড়িতে থাকার জন্য যাই না। চিরঞ্জীবের ঘরেই আমার থাকা। মাঝেমধ্যে খাওয়া-দাওয়া করেছি। এবং তার সূত্রেই তন্ময় মৃধা অচ্যুত মন্ডল ব্রাত্য বসুর সঙ্গে আলাপ। আলাপ হয়েছিল, অদ্রীশের সঙ্গে।
অদ্রীশ বিশ্বাস চিরঞ্জীবের এক ক্লাস সিনিয়র হলেও ওরা বন্ধু ছিল। আমারও বন্ধু হয়ে গেছিল সবাই। ওদের সঙ্গে ওদের কলেজ ক্যান্টিনে আড্ডা দিয়েছি ভরপুর। মন ভরিয়ে।
অপূর্ব তিন বছরের সিনিয়র হলেও চিরঞ্জিবদের বন্ধু। আমারও বন্ধু। অপূর্ব সাহা। এখনো অপূর্বর সঙ্গে আমার নিয়মিত যোগাযোগ। আমার কবিতা সংগ্রহের যে দুটো খন্ড প্রকাশিত হয়েছে তা শুধু অপূর্বর জন্যই। সে না থাকলে আমি পাণ্ডুলিপি তৈরি করতে পারতাম না। কবিতা সংগ্রহের তৃতীয় খন্ড সেই সম্পাদনা করেছে। হয়তো বা প্রকাশিত হবে আগামী বছর।বলতে চাইছি, যৌথতা কোথাও কোথাও ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেও কোথাও কোথাও অটুট হয়ে আছে।
অদ্রীশ আমার জন্য যা করে গেছে, আমি ভুলতে পারবো না। সে না থাকলে আমার গদ্যের বই কখনোই দেখতে পেতো না আলোর মুখ।
তন্ময়ের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ না থাকলেও যখনই ফোন করি, শব্দ করে।
পুরুলিয়াতে এসে আমার সঙ্গে দেখাও করে গেছে। বরং ব্রাত্যর সঙ্গে কোন যোগাযোগ নেই। সে তার জায়গায় ব্যস্ত খুব। জানি। কিন্তু কথা বলতে ইচ্ছে করে খুব। সে যখন ছাত্র, কবিতা লিখতো। পরে নাটকে চলে এলো। শুধু নাটক নয়, সে সিনেমাতে অভিনয় করে। সিনেমা পরিচালনা করে। একইসঙ্গে নাটক সিনেমা রাজনীতি কিভাবে যে সামলায় কে জানে। তার বিচিত্রগামিতা তাকে সুন্দর রাখবে সুস্থ রাখবে, এই আশা।
সৌম্যর সঙ্গে কি প্রেসিডেন্সিতে আলাপ?সঠিক মনে নেই। আজ বলতে পারি শুধু, সেও আমার একান্ত শুভাকাঙ্ক্ষী। একজন সুহৃদ। এও তো যুথবদ্ধ হৃদয়ের উষ্ণতম এক স্রোত।
চিরঞ্জিব কতভাবে আমাকে সহযোগিতা করে, লেখার জায়গা নেই। ফলে, আমি জোর গলায় বলতে পারি, আমরা কোথাও না কোথাও একান্নবর্তী পরিবার। দৃষ্টিতে না পড়লেও মনের চৌখুপিতে যে যার মতো করে আছি। প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে হাত বাড়িয়ে রেখেছি।
আমিও হাত বাড়িয়ে আছি সব সময়। সবাই ভালো থেকো ভালো থেকো ভালো থেকো।
সুমন বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতা
১.
রেওয়াজ
আঙুলের ফাঁকে বেড়ে উঠছে বিচ্ছেদ
হাওয়া নয়
মনখারাপের পাশে মায়াবন পেরোতে পেরোতে
মনে পড়ে যাচ্ছে _অনেক পুরানো আলাপ
বাঁশপাতায় জমে আছে ভোরের জোৎস্না
ঝরে পড়া সজনেফুলের দিকে মোরগ ডাকছে
ছায়াছবির এই দৃশ্যের ভেতর
এসরাজে বসেছে একা এক কিশোর নির্বিকার
ভুলে যাওয়া সুরের ভেতর
ঘুম থেকে জেগে উঠছে প্রিয় কোন বান্ধবীরাগ।
২.
প্রতিপক্ষ
এই শুকনো মাংসের দেশে
পাথরের তরবারী হাতে
কী ভেবে যে লড়তে এসেছিলাম একা
ধু ধু মাঠ। ছায়াদের কবরে হেলান দিয়ে
ঘুমিয়ে আছে ছায়া
তামাদি হয়ে যাওয়া সমস্ত অস্থিচিহ্ন
বৃদ্ধা ডাকিনীর শ্রোণিদেশ পেরোতে পেরোতে
ক্রমশ শুকিয়ে গেছে নদী। বিন্দু বিন্দু রক্তের দাগ
তারাফুল ফুটে আছে সর্বনাশের মতো
হাওয়ারাই বোঝে
অহেতুক আস্ফালন ছাড়া
আজ আর কেউ কারো প্রতিপক্ষ নয়।
৩.
বিগত জ্যোৎস্নার দিকে
আশ্চর্য জোৎস্নার ভেতর
হু হু করে ঢুকে পড়ছে রক্তপাত
স্মৃতি আসলে এমনই প্রতারক
খুন হয়ে যাওয়া প্রতিটি দৃশ্য পেরোতে পেরোতে
ভিখারীর মতো মনে পড়ে যায় _
অনেক পুরানো স্বপ্নের দিকে
স্লেজগাড়ি টেনে নিয়ে যাচ্ছে
গতজন্মের কুকুর।
খুঁজে যাওয়া
বিবেক সেন
শরীর যা খুঁজছিল
মন তা চাইছিল না।
মন যা খুঁজছিল
শরীর তা নিতে চাইছে না।
জীবন যা পেয়েছিল
মৃত্যুতে তার কোন প্রয়োজন নেই
মৃত্যু যা চেয়েছিল
জীবন তা দিতে পারেনি।
এখন খুঁজছি
শেষ পারানির কড়ি।
কেউ দেবে?
মাটি : তিন
দুর্গা দত্ত
কেউ কেউ জলে থেকে দাগ কেটে যায় সারাদিন
কেউ কেউ জল দিয়ে ডালে ডালে পাতায় পাতায়
লিখে রাখে অ-আ-ক-খ খুদকুড়ো সংসারের গান
কেউ কেউ কোনো কিছু , কিছুই লেখে না।
অনন্ত অক্ষর মালা হাওয়ায় উড়িয়ে দিয়ে
চুপ করে বসে থাকে দিগন্তরেখায় --
অদৃশ্য চিরকুট নিয়ে ঠোঁটে
ডানা ঝাপটে জল ছুঁয়ে অন্ধকারে উড়ে যায়
মেঘবর্ণ বিকেলের পাখির মতন …
সন্দীপ মুখোপাধ্যায়ের কবিতা
১.
মা
দুয়োরে দুয়োরে
মাছ বিক্রী করে
অন্নদা ধীবর ।
অন্নদাদিদির
অসুস্থ এক ছেলে ,
অন্ন জোগানোর দায়
অন্নদার।
অন্নদাদিদিরা
দুমুঠো অন্নের জন্য
দুয়োরে দুয়োরে ঘোরে
মাছ বিক্রী করে ।
অন্নদাদিদি অন্নদাত্রী
মা অন্নপূর্না হয়ে
বিরাজ করে
আমাদের সংসারে ।
২.
টান
ঘরে ঘরে দুধ দেয়
রাধা গোয়ালিনী ।
দই-এর পসরা সাজিয়ে
এ গাঁ থেকে ও গাঁ
এ গাঁ থেকে ও গাঁ
ভেসে আসে মুরলীধ্বনি ।
মুরলীধ্বনির টানে
বাঁধা পড়ে প্রকৃতি
বাঁধা পড়ে রাই বিনোদিনী।
সুজন পন্ডার কবিতা
ছায়া ঝরার সময়
১.
সময় ফুরিয়ে আসছে...
টিক টক টিক টক
ঘড়ির কাঁটায় খরচ হয়ে যাচ্ছে
কখনো কাজে বেশীরভাগই অকাজে...
চারিদিকে বদলে যাচ্ছে সবকিছু
বদলে যাচ্ছে সবাই
চিনতে পারছি না কিছু
চিনতে পারছি না কাউকে
অস্থির ভাবে হাতড়ে বেড়াই সময়ের লাগাম
সময় বেড়েই যায়
বুঝতে পারি সময় নয়
ফুরিয়ে আসছি আমরাই
২.
এই ছুঁলাম তোমার চিবুক
এই ছুঁলাম তোমার রগ
অন্তহীন প্রসন্নতা ঘিরে থাকার কথা তোমাকে
এই আলুথালু অন্ধকার
এই নির্জীব বেদনা প্রাপ্য নয় কারো
মৃত্যুশোক যতই গভীর হোক
একদিন মিশে যাবে মাটির ক্ষততে
আজ সেই দিন হোক
ছুঁয়ে দাও আমার কপাল
আমার নাভি মূল
মৃত্যু ফুল নিয়ে আসুক
সেই অন্তহীন প্রসন্নতা
সম্পাদক : উত্তম মাহাত
সহায়তা : অনিকেতের বন্ধুরা
ছৌ নাচের ছবি : অভিজিৎ মাজি
অন্য ছবি : সন্দীপ কুমার
যোগাযোগ : হোয়াটসঅ্যাপ ৯৯৩২৫০৫৭৮০
ইমেইল-uttamklp@gmail.com





মধুপর্ণাদির এই সিরিজটা অনেকটা চোখে জল ঝাপটা নেওয়ার মতো, চোখ খুলে যাবে অনেকেরই।
উত্তরমুছুনসুমনদার ছুঁয়ে যাওয়া কবিতা,দুর্গা স্যারের কবিতা, ছো এর ইতিহাস নিয়ে খুব সুন্দর আলোচনা এই সংখ্যার বড় পাওনা।
খুব ভালো হয়েছে সংখ্যাটি।