তৃতীয় বর্ষ ।। ষোড়শ ওয়েব সংস্করণ ।। ৪ অগ্ৰহায়ণ ১৪২৯ ।। ২১ নভেম্বর ২০২২
নিজেকে শূন্য করে আমাদের ঘর ভরিয়ে তোলে ধানক্ষেত। আর ধানক্ষেতকে শূন্য করে আমাদের ঘর ভরিয়ে তুলি আমরা। ধানক্ষেতের সঙ্গে আমাদের ভাবনার এই ফারাক বিস্তর ভাবার বিষয় হলেও ভাবি না। গভীরভাবে ভেবে দেখি না আমরা।
ভাই ভায়ের জন্য। মানুষ মানুষের জন্য ভাবলে সুন্দর হতে পারতো অনেককিছু। জীব জীবের জন্য ভাবলে পথ থাকতো অনেক। কিন্তু সব পথ অবরুদ্ধ আমাদের।
প্রাকৃতিক শিক্ষায় ব্যর্থ আমরা এক একটা পথ হারাতে হারাতে আবদ্ধ হয়ে উঠছি চার দেওয়ালের মাঝে।
কোথায় কি দিল ধানক্ষেত------ জানি না। কোথায় কি দিল বেড়ার ধারের পুরোনো গাছটা------ জানি না। কবে কি দিল চালের টং-এ থাকা পায়রাগুলো------- জানি না। জানার চেষ্টা করি না। তাই শুনতেই পাই না পায়রার বকম বকম। দেখতেই পাই না পাকা ধানের ঝরে যাওয়া। বুঝতেই পারি না নিজের এক একটা অঙ্গ শুকিয়ে শুকিয়ে রান্নার কাঠ দিয়ে গেল বেড়ার ধারের গাছটা।
উত্তম মাহাত, সম্পাদক
______________________________________________
যাঁদের লেখায় সমৃদ্ধ হলো এই সংস্করণ
______________________________________________
নীতা রায় / বিশ্বম্ভর নারায়ণ দেব / শ্রীদাম কুমার / শ্রীভূষণ / অতনু চক্রবর্তী / সজল রায় / মধুপর্ণা
______________________________________________
আমার আমি
নীতা রায়
মাথার ভিতর বাড়ি,
বুকের ভিতর ঘর,
হাত পা পাহাড় নদী
আমার চক্ষু তেপানতর।
মনের ভিতর ঝুরি
নামায় প্রাচীন বট,
আকাশ ভরা খুশি
সাজায় হৃদয়তট।
হাসির কলতানে
ঝরণা ছুটে চলে,
চোখের জলের ফোঁটায়
জীবন কথা বলে।
আমার আমিকে আমি
এভাবেই গড়ি,
অলীক ছায়াপথে
চলাফেরা করি।
তোমার মত করে
যদি আমায় খুঁজে পাও,
ছুঁড়ে ফেলো ঘৃণায়
না হয় সঙ্গে নাও।
যাও লেখা
বিশ্বম্ভর নারায়ণ দেব
একটি কবিতা হয়ে ওঠার আগে
যাও লেখা
সেই অনুভূতির কাছে যা সত্য
যাও লেখা
সেই সংগতের কাছে
দেখো, সামগ্রিক উপলব্ধি রূপে
তোমায় গ্রহণ করতে পারছে কিনা দেশকাল ।
যাও লেখা
নিষ্ঠুর সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলো
খ্যাতিমানদের যুক্তি এড়িয়ে
সাহিত্যের ধ্বজাধারীদের অনুমোদন এড়িয়ে
একটু একটু করে নিজে নিজেই
কবিতা হয়ে উঠেছি আমি
এবার আমায় গ্রহণ করো নিন্দুক
এবার আমায় গ্রহণ করো প্রশংসক।
খিদে মরে না
শ্রীদাম কুমার
গেল যে , যার সব কুল
নেপৈ মারে দৈ
দে দোল দে দোল
দুদুল দুলছি কেবল
আমার গ্রন্থিত যত কি তেল মশলার ঝালে ?
অরন্ধন অরন্ধন অরন্ধন ....
উনুন বন্ধ উনুন বন্ধ, হাঁড়ি বন্ধ তাই
নাড়ি-ভুঁড়ি মোচড় দেয়, ঠুংঠাং ঠোকাঠুকি
হাঁড়ি-কুঁড়ি বেজে যায়, কখনো মিহি
কখনো বাজখাঁই চৈতনখুড়াদের গলির মোড়ে
খিদে চাগাড় দেয়, অনন্তের খিদে তবুও কি মরে...
কার্নিভ্যালের ঘোড়া
শ্রীভূষণ
শহরবাসী সবটাই দেখল —
সেদিনের গোধূলিলগ্নে রাজ-বৈভবে মোড়া লাল পথ জুড়ে ঢাউস কার্নিভ্যাল !
যদিও প্রকাশ্যে কোনো ক্ষোভ ফেটে পড়েনি, শুধু এক নন্দীর তান্ডব ছাড়া — তাও শহর থেকে দূরে
মফঃস্বলের কার্নিভ্যালে — সংস্কৃতির ঢং দেখে শিং উঁচিয়ে রাগে ফেটে পড়েছিল সভ্যতার দরবারে।
তবু কার্ণিভালের বেলাগাম ঘোড়া এগিয়ে চলেছে — বেপরোয়া ঔদ্ধত্যে !
প্রগাঢ় অন্ধকার ঢাকা পড়েছে নেতা মন্ত্রী সেপাই সান্ত্রীর ঠাঁটবাটে — কবি শিল্পী বুদ্ধিজীবীদের তারকাখচিত ভিড়ে।
আয়োজনে কার্পণ্য ছিল না, কারচুপি অগাধ — চুপিসারে লাঠি হাতে উর্দি পরে সাদা কাপড়ে ঢেকেছে ধর্নামঞ্চ !
ব্যস্ত তাঁরা কার্ণিভ্যালে — তাঁবেদারির সঙ্গে আছে নৃত্য-গীতি-বাদ্যে তাঁদের নির্লজ্জ (প্র)স্তুতি !
দিব্যি তাঁরা ঠুলি এঁটে রংবাহারি মুখোশ পরে খোশ মেজাজে হাজির আজ অশ্বমেধের ঘোড় দৌড়ে —
তবু জানি, কতকাল আগের কথা — সাম্রাজ্য কাবু করার রাজকীয় ছলকলা — একালেও বুঝি খাটে ?
নির্ধারিত দিনক্ষণে কর্তা-ব্যক্তিরা সবাই হাজির দেবীর বিসর্জনে — কেউ কেউ কার্নিভ্যালের ঘৌড় দৌড়ে
বাজি জিতে কতটা আপনজন হওয়া যায় — সে চেষ্টায় কোনো ফাঁকি ছিল না, কিংবা কেউ সুকৌশলে
জয়তিলক কপালে নিয়ে ভবিষ্যতের সওয়ারি হতে তৎপর, নতুবা তালে-বেতালে তাল মিলিয়ে সঙ্গে থাকার ভান !
সেদিনের চোখ ধাঁধানো বাহারি সন্ধ্যায় আমাদের শহরবাসী থেকে বিশ্ববাসী সবটাই দেখল —
তবু ধর্নামঞ্চের ছেলে মেয়েদের মুখে কোনো আনন্দ ছিল না, একরাশ যন্ত্রণা ঘিরে ধরেছিল হৃদয়ের গভীরে
অথচ কার্নিভ্যালের মদমত্ততায় দেবীর মুখ বদলে গেল সূক্ষ্ম কারুকলায় সবিশেষ মানবীতে !
চিতি
অতনু চক্রবর্তী
.
অতিশয় রীতিনীতি
.
আমি বুঝি । আর দেখি
বাক্যের আকারে
সে কালসর্প, সে চিতি
চুপিচুপি
ঢুকে পড়ে, ওম চায়,
বলে, তোমার আমার মাঝে
বিশ্বাস একমাত্র উপায়
.
আমি তাকে কি বলব,
টিয়াপাখি বুলি ?
কথায় কথায় শুধু
ফোঁস করি,
.
কেঁদে ফেলি
মীনাক্ষীর পাশে বাংলা
সজল রায়
সে আমাকে জানিয়েছে
নদীটি খরস্রোতা , সর্বনেশে
গিয়ে দেখলুম ধুপকাঠির মত ভঙ্গুর
রমণীচঞ্চল!
সে আমাকে জানিয়েছে
ফসলের ক্ষেত জুড়ে মন্দা বাতাস,
শ্রান্ত হাঁটু ভেঙে কৃষকেরা পুনরায়
তুলে নিচ্ছে বিষণ্ণ বন্দুক,
গিয়ে দেখলুম নিখিল জ্যোৎস্নায়
নির্ভুল অস্ত্রশিক্ষা ,
রমণীগর্জন!
সংসার চলছে না ?
কিছু ঋণ থেকে গেছে?
কঠিন সোহাগে ঘরে ঘরে দিয়ে যাচ্ছে
ছিটেফোঁটা চাল , চিনি ও ময়দা
ছিঁড়ে দিয়ে ইস্তেহার ,
জীবনের গোপন বাসনা
ছুঁড়ে দিচ্ছে অনুদানে পরিপূর্ণ
ধ্বংসের ছাই।
সে আমাকে জানিয়েছে
সে চলে যাচ্ছে
সে চলে যাবে
মুছে দিয়ে সমস্ত দেওয়াল লিখন
মুছে দিয়ে অনিবার্য দুঃখের সম্বল
নিখিল স্তব্ধতায় ব্যাপ্ত ঝাউবন
বালিয়াড়ি জুড়ে ভর্তুকির ভয়
জ্বলে উঠে নিভে যাচ্ছে
অসীম রহস্যময় পয়মন্ত লক্ষীর ভান্ডার
সে চলে যাচ্ছে
সে মানে সেই মেয়েটি
আমাদের ইসমাত আফিয়া।
শ্রীসদনে দৈনন্দিন – ১
মধুপর্ণা
এক আশ্চর্য বিকেলে একটা ট্রাঙ্ক, একটা তোষক, বালিশ সমেত শ্রীসদনে রেখে গিয়েছিল মা। মেইন ব্লক ডর্মেটরি, তাতে আটজনের থাকার ব্যবস্থা। জানলার পাশে বেড, একটা টেবিল, একটা জিনিসপত্রের তাক আর একটা তক্তা। একটা নিজস্ব ছোট জগত ক্রমে ঘনিয়ে উঠেছিল এই অল্প জায়গায়। জানলার ওপারে চালতা গাছ, তাতে বিকেল হলে অজস্র টিয়া পাখি উড়ে বেড়ায়। রত্নাদি আর কুমকুমদির তত্ত্বাবধানে প্রত্যেকে আদৃত বোধ করে ঘরের বাইরে এসেও। সঙ্গে ফোন রাখার নিয়ম নেই। ওয়েটিং রুমে একটা ল্যান্ড ফোন সেখানে বাড়ি থেকে ফোন এলে মাসিরা ডেকে দিতেন তাতে পাঁচ-ছয় মিনিট কথা। বাথরুমে বালতি পেতে স্নানের জন্য লাইন দিতে হয় উত্তর শিক্ষা থেকে ফিরে৷ সেই নিয়ে বিস্তর হুল্লোড়।এইসব দৃশ্য গুলো, সময়ের ছোট ছোট ভগ্নাংশ মাথার ভিতর,মনের ভিতর ঘোরে। ঘুরতে থাকে কিন্তু ফুরোয় না। অ-শেষ একটি রিলের মত দৃশ্য গুলো একের পর এক। মানসভ্রমণ হয়। সেই উঁচু সিঁড়ি গুলো বেয়ে, বারান্দা পেরিয়ে, সিনিয়রদের 'গ্লিটারিং গার্লস' লিখে রেখে যাওয়া দরজা পেরিয়ে শ্রীসদনের ডর্মেটরির সেই বেডে কতদিন চুপ করে বসে থাকি। তুলসী মাসীর কণ্ঠ শুনতে পাই, "এত কাগজ কুচি কুচি করে বিছানায় তলায় ফেলো না, বাইরে ফেলবে” আর ফেলব না। এবারটাই লাস্ট। থালা নিয়ে দুবেলা জেনারেল কিচেন, কিচেনে সিনেমার গান চলত, হিন্দী সিনেমার গান। গ্যাংস্টারের গান, কাল হো না হো র গান। কতদিন এখনও খেতে বসে সেই সময়টায় ফেরার জন্য গান গুলো এমনি চালিয়ে রাখি। দেখে হাসে একজন। "কোনো মানে হয়!" আরও পড়ুন
আমাদের বই
সম্পাদক : উত্তম মাহাত
সহায়তা : অনিকেতের বন্ধুরা
অলঙ্করণ : যামিনী রায়ের ছবি, আন্তর্জাল থেকে
যোগাযোগ : হোয়াটসঅ্যাপ - ৯৯৩২৫০৫৭৮০
ইমেইল - uttamklp@gmail.com










মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন