তৃতীয় বর্ষ ।। পঞ্চদশ ওয়েব সংস্করণ ।। ২০ কার্তিক ১৪২৯ ।। ৭ নভেম্বর ২০২২
ইঁদুরের সাত রানি। অনেক ছা-পোনা। পাড়া-প্রতিবেশীর আসা-যাওয়া। একটা সময় অব্দি সব যেন একাত্মার সম্পর্ক নিয়ে বেঁচে থাকা। সেটা ধান পাকার সময়। চাষির ধান নিয়ে এসে নিজের গর্তে সঞ্চয় করে রাখার মুহূর্ত। তখন চাষি না যেন ইঁদুরই প্রকৃত চাষি। চাষির ধান শীষের উপর নিজের নাম লিখে সযত্নে বিলোতে থাকে ইঁদুর। এই নাও দু টাকা করে। এই নাও ফ্রি। নিজের আশপাশে প্রতিবেশীদের ঘোরাতে, তাদের স্ত্রীদেরকেও দিতে থাকে কিছু কিছু। তাদের আমোদ প্রমোদের জন্যও দিতে থাকে কিছু কিছু। এভাবেই চলতে থাকে আনন্দে। দিন পেরিয়ে যায়, মাস পেরিয়ে যায়, দেখতে দেখতে চলে আসে পাতা ঝরার ঋতু। টান পড়ে ইঁদুরের গর্তে থাকা সঞ্চয়ে।
এবার পরীক্ষা ইঁদুরের প্রতিবেশীদের। এবার পরীক্ষা সাত রানির। এবার পরীক্ষা ইঁদুরেরও। ইঁদুরের সঞ্চয় শূন্য হলে কে থাকে সাথে?
কোষাগার শূন্য হলে রাজাকে রাজা বলে মানে না কেউ। একে একে কেটে পড়ে মন্ত্রী। একে একে কেটে পড়ে রানিরা। সবশেষে কেটে পড়ে প্রজা।
রাজা হওয়ার আগে ভাবো, কোন খাতে কতটুকু দিলে স্বচ্ছন্দে থেকে যাবে সাত রানি। স্বচ্ছন্দে থেকে তোমার সাথেই। হে ইঁদুর, খাবে খাও, বিলোবে বিলোও, নিজের নাম লিখো না কখনো চাষির ধান শীষে।
উত্তম মাহাত, সম্পাদক
______________________________________________
যাঁদের লেখায় সমৃদ্ধ হলো এই সংস্করণ
______________________________________________
নির্মল হালদার / অশোক দত্ত / দীপংকর রায় / বিপুল চক্রবর্তী / অচিন্ত্য মাজী / কল্পোত্তম / তপন পাত্র
______________________________________________
নির্মল হালদারের কবিতা
হরিতকি গর্ভের আলোয়
১.
হেমন্ত বেলা
-------------------
ধান পেকে উঠছে, এই খুশিতে
পাখিদের কলরব।
আমার ধান নেই মান নেই,
আমার শুধু হেমন্তিকা,
আমার গোপন জ্বর।
২.
কল্যাণ
------------
মেঘ চেটে চেটে খেতে বললে
ভরা গ্রীষ্ম, দুপুর বেলা।
শিশির চেটে চেটে খেতে বললে
ভরা গ্রীষ্ম, দুপুর বেলা।
আমি মেঘ না পেলেও শিশির না পেলেও
তৃষ্ণা পেয়েছি,
এইতো আমার কল্যাণ।
৩.
ভোরের স্কুল
(উৎসর্গ: রামানুজ মুখোপাধ্যায়)
দরজা খোলার শব্দে
সূর্য এসে দাঁড়ালো দুয়ারে।
ঘরের ভিতরে মা জাগায় ছেলেকে
অ আ পড়তে যাবে,
ভোরের স্কুলে।
সূর্য যাবে সঙ্গে সঙ্গে
সে চেনাবে রোদ, রৌদ্র ছায়া।
৪.
খরগোশ
------------
খরগোশ ছুটছে সকালের আকাশে
ও খরগোশ নিচে নেমে এসো
তোমার গা থেকে রঙ চাইছে আমাদের মেয়েরা।
খড়ি মাটি ফুরিয়ে গেলেও
আলপনার দিন ফুরিয়ে যায়নি আজও।
অশোক দত্তের কবিতা
১.
কুটীর শিল্প
পলাশ পাতার খালা, শাল পাতার থালা
সঙ্গে গাঁদা ফুলের মালা গেঁথে
বাঁশের ঝুড়ি ভরে সকাল সকাল
বড় হাটের দিকে চলেছি
গগনচুম্বী বোঝা-মাথায়
পাকা সড়কে
পায়ে চটি খটাস খটাস আওয়াজ করে ;
লদি পেরায়ে, রাকাবের জঙ্গল থেকে
হাটে পৌঁছতে দুপুর গড়ায় ;
বাবুদের কাছে যা পাই, গোটাটাই লাভ ;
খাটুনিটা সয়ে গেছে ; সওদা করি
তেল, মসলা, মিঠো---
যা না হলে পেটে সয় না ;
সওদা করি কেরাসিন, আর ছ্যেলা-ভুলা---
ভাবরা গজা জিলাপি নিমকি যেদিন যেমন ;
গাঁয়ে ফিরতে কনোদিনও
দেরি হয় না ;
ঘরে পৌঁছে, ভাত রেঁধে--- বড় সুখে,
নাতি-নাতনাদের সাথে শান্তিতে ঘুমাই।
২.
জাতব্যবসা
যেমন করেই হোক বেঁচে থাকো...
গলায় খইঞ্চা ঝুলিয়ে ;
মা বলেছে 'গোপাল আমার'!
পঞ্চাশ পেরিয়ে মনে পড়ছে
'দোকানটা তার মামার' এবং
'রামনাম সৎ হ্যায়' !
সত্তরের কাছাকাছি এসে,
দেখছি সব ছেলে-মেয়েদের
চৌদ্দচুয়াড়ি খামার---
সেজে উঠেছে টাকার মস্ত এক
পর্বত; কলের গানে শোনা যাচ্ছে :
তুমসে আচ্ছা কৌন হ্যায় ...
দীপংকর রায়ের কবিতা
পাথুরে বোধনের কান্না শুনি কাশবনে
১.
তোমার
এমন দুঃখ-সুখের গানে
গলা মেলাতে
বয়েই গেছে
জানা যখন হয়েই গেছে
সয়েই গেছে ব্যাবধান!
ছবির মাদল ভাঙলো তবে
খানখান
কেন বলো তো ?
তার চেয়ে খেলাই যখন
সুখের ,
বেলায়-ই গাইবো গান
আপন সুখে ;
দুখে
আর বুকে
পাড়াই যতোই ঘুম
সেই তো রুখু পথেই ভিজি
একা ;
তোমার মেঘে ভাসবো কেন বলো
আমার আকাশ
সেই তো শুধুই দেখার ;
দেখি তো , খুঁজিও খানিক ,
তুমিও বেল্লিক
বোঝো না কিছুই
বেলা নেই, রাত্রি নেই
সকাল
বিকাল যে হলো
বোঝো না তাও !
তোমার ঋতু না হয় পাহাড় প্রমান
সমানে সমান
ভাবতে শেখ
খেলায়
মেলাও যদি
প্রাণ
তবেই বাজে
প্রলয় - মেঘের
গান !
বোঝো এবার
বোঝো
বাঁকা চাঁদের হাসি
কোলের উপর
যতোই শেখাও তাকে
সে রাখে তো ভালো ,
না হলে
এবার তুমি শুধুই কাঁদতে শেখো।
২.
চাই নি তো জবাব
কুয়াশার এই ঘোরের কাছে
চাই নি ডাকের
বিভোরতাও ;
উন্মাদ হয়েছি
নিজের ভেতরে নিজেই
অজানা মূর্ছনায় ----
বিদ্যুতের তারগুলি
কুয়াশায় নিস্তেজ ঝুলে আছে ,
আমাদের আলো পৌঁছে দিতে ?
বাতাসের প্রয়োজন নেই। পাখা ঘোরে না । তাই , তার থাকা না থাকায়
চোখের আলোই যথেষ্ট ।
রাতে যদি বাথরুমের প্রয়োজন তখন সংযোগের কথাটি ;
এই রাতের বারান্দায়
প্রয়োজনীয়তা নেই ওই তারের ;
বারবার চমকে যাই
মনে হয় ফেলে আসা কালো কালো
হেরিকেনের মুখগুলি ;
বিদ্যুতের ঘাড়ে উঠে উন্মাদ নৃত্যে
মেতে উঠলো সে !
আমি পথ দেখতে না পেরে
গাছেদের দায়ী করলাম অনেক !
মনে মনে একটি রাত- প্যাচা বাদুড় হয়ে
লটকে গেলাম ।
হৃদয় কি ভেসে গেলো
অসহায় জোস্নায় ?
অন্ধকারের দিকে যেতে যেতে
নিঃসঙ্গ অবোধ মোহমূর্ছণায় বেঁচে উঠলাম
নাকি মরবার কথা
ভাবলাম আর একবার ?
বিপুল চক্রবর্তীর কবিতা
ব্রত : ১
.........
শকুনি যাবে ডালকে / শিয়াল যাবে খালকে
- জিতাষ্টমীর ব্রত
ডাল নেই, গাছপালা কেটেকুটে সাফ
শকুনি উধাও সে তো কবে
খাল নেই, সেখানে এখন 'মল', 'হাব'
শেয়াল কোথায় যায় তবে
.
উঠোন হারায় যদি, বেল কলাগাছ
কোথায় বসাবে, চাই মাটি
জীবনদেবতা নেই, আনাচ-কানাচ
চিতাভস্মে সাজে পরিপাটি
.
ফেরাও সমস্ত, বন্ধু, ঘুম ভেঙে ওঠো
তুমি নিজে আজ ডালেখালে
জন্মের উঠোন জুড়ে নাও অন্য ব্রত
ফেরে যদি, যা-কিছু হারালে
ব্রত : ২
.........
পুণ্যিপুকুরের কাছে আর-বার যাই
অরণ্য ব্রতের কাছে আর-বার যাই
পৃথিবী ব্রতের কাছে আর-বার যাই
শুষ্কপ্রায় হে পুকুর তুমি ফিরে এসো
লুপ্তপ্রায় হে অরণ্য তুমি ফিরে এসো
মৃতপ্রায় হে পৃথিবী তুমি ফিরে এসো
.
জটপাকানো সভ্যতার সুতোর বলটি
ছুঁড়ে ফেলে, পৃথ্বীর মতন গোলাকার
ভ্রমটি পেরিয়ে, কার্তিকের অঘ্রাণের
দিকে দিকে ঘরে ঘরে সেঁজুতি সাজাই
আর, গেয়ে উঠি মাঘমণ্ডলের ব্রত ---
ওঠো ওঠো সূর্যাই রে.. ওঠো রে সূর্যাই..
অচিন্ত্য মাজীর কবিতা
১.
ভেলকিবাজি
বহুদিন তারা পড়ে আছে বিবর্ণ জমির ওপরে নীরবে
কেউ সৎকার করেনি, কফিনের ফাঁকে শুধু ঘোলাটে নির্জন মণি
চ্যালাকাঠের মতো হাড়ের দড়ি বাতাসে দুলছে খড়খড় শব্দে
শুধু জ্যান্ত চোখের মালায় একটি ভৌতিক মোমবাতি জ্বলে আছে স্তব্ধ
শিখা নেই তাপ নেই অন্তর বিচ্ছুরণ পৌত্তলিক মুখে জলের মতো স্নিগ্ধ।
ফাঁকা পেয়ালায় বেদনাহীন নিষ্প্রভ তার পালক ছড়িয়ে আছে আদিগন্ত
সমস্ত চতুর রীতিকে আহত করে আণব অস্তিত্ব আমীষ ভোজনে মাতে
তার অদৃশ্য ফাঁসের টানে ভব্যতার ছিটকিনি খুলে গিয়ে
দেহভাণ্ড ফেটে যায় নারকোলের মালার মতো, থকথকে সাদা দেহ
রূপহীন হরবোলা হয়ে পড়ে আছে সালঙ্কারা পৃথিবীর সোঁতাল মাটিতে
লাল কাঁকরোলের মতো ক্ষুদ্র বল অতর্কিতে ঢুকে মানুষের মনীষায়
বানচাল করে দিয়ে গেছে আঁতের যত ছক আর ছলাকলা রঙিন তামাশা
সোনার নাল বাঁধা পালকিতে চড়ে কে যায়? কার অভ্যন্তরে যায়?
বিকেলের কনেদেখা আলোটিতে গাছের নাভির নীচে যে বেঁধেছে বাসা
তার সুগন্ধী তন্তুর পাড়ে বসে তীব্র স্বরে ঝিঁঝিঁ ডাকছে, পরাস্ত নাবিক
আঘাত বাঁচিয়ে এসে দেখে অভিভূত কমলা আলো সমূদ্রগর্ভে ডুবছে
তার বিশাল নীল আলেয়ার ভেতর উজাগর কালপুরুষ তরবারী ফেলে
ঢেউয়ের ডৌলে স্থানু হয়ে থাকা কৌমার্য শুষে নিচ্ছে
পৃথিবীর ঘাড়কাটা পুতুলেরা জাদুকরের ভেলকি দেখবে বলে
জল্লাদের কাছে শির নিচু করে হাঁটু গেড়েছে ভক্তির বানে
২.
আরাধনা
পাকদণ্ডী বেয়ে ওঠো দেখা পাবে অনির্বচনীয় সুপ্ত পাঁজর জাদুউরু
সাপের চামড়ায় ঢাকা দেহপট, আঁকাবাঁকা রতির আঁচড়, উদার পীঠের ঢাল
প্রকাণ্ড ঢেউয়ের তেজ নিয়ে ক্ষোভহীন উদগারে রাঙা তার ধড়
মাতালের রাজকীয় রথ গড়াচ্ছে নারকী চাকা, পরিচ্ছন্ন উপভোগে
নিষিক্ত বাসনা আদিম ত্রাসের দিকে মেলে দিল নোনা আঙুলের নকশা
প্রহসন শেষ হলে ধুতির চুনট পরিহাসে হেসে ওঠে খর উল্লম্ফনে
ক্ষমাহীন স্ববিরোধে তোমার দক্ষিণামূর্তি জৈব কূপ থেকে বিচ্ছুরিত হয়ে
চিনে নিতে চায় ঘট ভাঙা দেবতার হাড়, শিমূল ফুলের মৃগনাভি
চাটুকারী খাতকের দল জলতরঙ্গের বাজনার মতো মুখে হাসি নিয়ে
দখিনা পবন ছাড়ে দ্বারে, আড়ালে জ্বলে কাঠপাঁজা ধিকিধিকি
জায়মান কীট গৃহস্থের চালে সার পেয়ে বেড়ে ওঠে চারু আলিঙ্গনে
চালাকি পিয়াস জানে কারুভাষ নির্ভুল আলেয়া যত গতরের
নান্দনিক নাচ নেচে মতিচ্ছন্ন টিকি সাবেকী দরাজ হয়ে অসামান্য ঢঙে
ঘরকুনো মানুষের পরকীয়া বুকে ঢেলে দেয় মূঢ়তা ঈর্ষার ঝাঁঝে
অসংখ্য শকুন চোখ মেঘের পাঁচিল থেকে নেমে প্রাসাদের থামে
ঢুকিয়ে দিল পাষণ্ড পুরুষের ধ্বজাভাঙা বুক আর নারীর নাকের পাটা
আঁধারে একা এক পাঁজর প্রবাহের ধাঁচ ভেঙে কুটিরে ধরাচ্ছে গোপন উনান
হন্তারক বিষনখর চেনা লাশ ছেড়ে হিংস্র হল অচেনা স্বাদ ও গন্ধ পেয়ে
জঙ্গলের কোলে তার ডাক ভেসে আসে, সফেদ জঙ্ঘার কারুকাজ জানে
অন্তহীন চাহিদার জেল্লা, শুধু বিস্ময়ের প্রান্তটিতে নেই কোনো সুর
ক্ষুধার নাঙ্গা আরাধনায় প্রাচীন উনানে পুড়ল সভ্যতার জড়িবুটি
কল্পোত্তমের কবিতা
১.
সমস্ত শব্দেরাই মিথ্যে হয়ে যায় মহাশ্মশানের গায়ে। সমস্ত স্থূলতা হয়ে যায় শূন্য। তখন তুমি মুক্ত ব্রহ্মের দিকে ছুটতে ছুটতে পৌঁছে যাও মহা ব্রহ্মের নাভিমূলে। আমার সঙ্গে তোমার সম্পর্কের ইতি হয় না। তার নবীকরণ হতে হতে পেরিয়ে যায় যুগান্তর কাল।
জন্মান্তরে কখনো পতঙ্গ আমি আগুন তুমি। কখনো আগুন আমি পতঙ্গ তুমি। পর পর পুড়ি। পর পর পোড়াই। দগ্ধ হতে হতে এগিয়ে যাই বিশ্বরূপের এক একটি রূপে।
আকাশে একপাশে চাঁদ একপাশে সূর্য, আমাদের রাত হয় না। আমরা জেগে থাকি অনন্ত আলোয়।
২.
তোমার সংস্পর্শে এলে শুরু হয় বিশ্ব উষ্ণায়ন। মেরু অঞ্চলের বরফ গলতে গলতে বাড়ে জলস্তর সমূদ্রের। তখন তুমি কেঁপে ওঠো। কেঁপে ওঠে ম্যানগ্ৰোভ অরণ্য। আমি ডুবতে থাকি। শুরু হয় কম্পন এক একটা প্রদেশে। শুরু হয় কম্পন পাহাড়ে, উপত্যকায়, জলাভূমিতে। তখন তীব্রতা অঙ্কিত হয় সিসমোগ্রাফের কাঁটায়।
ফুল ফোটে। সেজে ওঠে অরণ্য। সেজে ওঠো তুমি। ফলে ফলে ঝুলে পড়ে ডাল। শুরু হয় বৃক্ষ বিস্তারের মহোৎসব।
রবীন্দ্রনাথের বেদনার গান
তপন পাত্র
"গীতবিতান"নামে সুপরিচিত মহাগ্রন্থটির আমরা বর্তমানে যে রূপটি দেখতে পাই; এই রূপে রূপায়িত হওয়ার পূর্বে বহুভাবে গানগুলি প্রকাশিত হয়েছিল। সেগুলিকে এলোমেলো সংকলন বলা সমীচীন কি না জানি না তবে রবীন্দ্রনাথ নিজে পরবর্তী সময়ের একটু অখুশিই হয়েছিলেন। ১৩৪৫ বঙ্গাব্দের ভাদ্র মাসে যে অখন্ড গীতবিতান প্রকাশিত হলো তার ভূমিকা নয়, 'বিজ্ঞাপন' হিসাবে তিনি লিখলেন ---
"গীতবিতান যখন প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল তখন সংকলনকর্তারা সত্বরতার তাড়নায় গানগুলির মধ্যে বিষয়াণুক্রমিক শৃঙ্খলা বিধান করতে পারেন নি। তাতে কেবল মে ব্যবহারের পক্ষে বিঘ্ন হয়েছিল তা নয়; সাহিত্যের দিক থেকে রসবোধেরও ক্ষতি করেছিল। সেই জন্য এই সংস্করণে ভাবের অনুষঙ্গ রক্ষা করে গানগুলি সাজানো হয়েছে।এই উপায়ে সুরের সহযোগিতা না পেলেও পাঠকেরা গীতিকাব্যরূপে এই গানগুলির অনুসরণ করতে পারবেন"।
এই সংস্করণে পূজা, স্বদেশ, প্রেম, প্রকৃতি, বিচিত্র, আনুষ্ঠানিক ইত্যাদি পর্যায়ে গানগুলিকে বিভাজিত করা হয়েছে।গীতবিতান অখণ্ড সংস্করণের প্রথমেই যে গানটি সংকলিত হয়েছে আপাতদৃষ্টিতে সেটিকে প্রকৃতি বা ঋতু পর্যায়ের গান বলে মনে হলেও আদতে তা ঋতুপর্যায়ের গান নয়, রবীন্দ্রনাথ গানটিকে পূজা পর্যায়ে রেখেছেন।সামগ্রিকভাবে এটি একটি মানব জীবনের সার্বিক উপলব্ধির গান। কী পেয়েছেন আর কী পাননি ---তার হিসাব মেলাতে কবি মন গররাজি হলেও কী করেছি আর কী করলে ভালো হতো ---এই ভাবনা কিছুটা হলেও মনকে তোলপাড় করেছে। যে কোনো আত্ম সমালোচনাকারী মানুষের মনে কখনো কখনো এ প্রশ্ন জাগে। কান্না হাসির দোল দোলানো পৌষ-ফাগুনের মতো মানব জীবন হলেও শেষ পর্যন্ত কবি বললেন ---
"রাতের বাসা হয়নি বাঁধা দিনের কাজের ত্রুটি,
বিনা কাজের সেবার মাঝে পাইনে আমি ছুটি।
শান্তি কোথায় মোর তরে হায় বিশ্ব-ভুবন মাঝে,
অশান্তি যে আঘাত করে, তাইতো বিনা বাজে।
নিত্য রবে প্রাণ-পোড়ানো গানের আগুন জ্বালা ---
এই কি তোমার খুশি, আমায় তাই পরালে মালা
সুরের গন্ধ ঢালা।"
---এ তো আর নিছক গানের বাণী নয়, কবির ব্যক্তি মনের নিতান্ত উপলব্ধির গীতিকাব্যিক উচ্চারণ। শুধু নিজের কথা নয়, আনন্দ বেদনার দোল-দোলানো জীবন নদীর তীরে সারাজীবন কল্পিত মায়ামৃগের পিছনে দৌড়তে দৌড়তে চোখের জলে ভেসে যাওয়াই মানুষের নিষ্ঠুর নিয়তি।
রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য, গান সহ যাবতীয় সৃষ্টি এমনকি স্বয়ং রবীন্দ্রনাথকে কিছুটা হলেও বোঝার জন্য পৃথক কিছু উপাদেয় নয়, নিজের সুতীক্ষ্ণ বিশ্লেষণও ততোখানি নির্ভরযোগ্য নয়; রবীন্দ্রনাথকে বুঝতে হয় রবীন্দ্রনাথ দিয়েই। মানব জীবনে সোনার হরিণের পিছনের ছুটতে গিয়ে তার যে কী দুর্গতি সে কথা তিনি অন্য একটি কবিতায় সুন্দর করে বলেছেন ---
"পাগল হইয়া বনে বনে ফিরি আপন গন্ধে মম
কস্তুরীমৃগসম।
ফাল্গুনরাতে দক্ষিণবায়ে কোথা দিশা খুঁজে পাই না।
যাহা চাই তাহা ভুল করে চাই, যাহা পাই তাহা চাই না।।"
অন্তর থেকে উৎসারিত বাসনা মরীচিকার মতো ঘুরে বেড়ায়। দুই বাহু মেলে তাকে জড়িয়ে ধরতে চাইলেও আর ফিরে পাওয়া যায় না। মানুষের মন থেকে যে গান বেরিয়ে আসে বাঁশির সুরে তাকে বাঁধতে গেলে রাগিনী বেপাত্তা। চাওয়া আর পাওয়ার মাঝে সহস্র যোজন ব্যবধান নিয়েই জীবনের পথে এগিয়ে যাওয়া।
আমাদের বই
সম্পাদক : উত্তম মাহাত
সহায়তা : অনিকেতের বন্ধুরা
অলঙ্করণ : দেবাশীষ সাহা
যোগাযোগ : হোয়াটসঅ্যাপ - ৯৯৩২৫০৫৭৮০
ইমেইল - uttamklp@gmail.co












মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন