প্রথম বর্ষ ।। দশম ওয়েব সংস্করণ ।। ৫ পৌষ ১৪২৭
আদর্শ ব্যাপারটা কেমন যেন গোলমেলে হয়ে উঠছে দিনের পর দিন। আদর্শ হিসেবে কাকে গ্ৰহণ করা যায় সেই প্রশ্নের মধ্যে দেখা দিচ্ছে নানা জটিলতা। রাজনেতা, ডাক্তার, উকিল, বৈজ্ঞানিক, সাহিত্যিক, শিল্পী বা তথাকথিত বুদ্ধিজীবী সবার মধ্যেই সংকীর্ণতা, অকৃতজ্ঞতা এবং স্বভাবনার বিষয়টা বিশেষ জায়গা করে নেওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে তাঁরা আর জায়গা করে নিতে পারছেন না। এর মধ্যে সর্বাগ্ৰে যাঁদের স্থান রয়েছে তাঁরা হলেন রাজনেতা।
কোনো দলের কাজকর্ম বা সেই দলের নেতাদের প্রতি বিতশ্রদ্ধ হয়ে একজন সাধারণ মানুষ যে দলকে বা যে দলের প্রার্থীকে ভোট দিলেন প্রকারান্তরে দেখা গেল সেই প্রার্থী আপনার অপছন্দের দলে গিয়ে নিজেকে বিক্রি করে দিলেন। অর্থাৎ আপনার ভোটের কোনো মূল্য থাকলো না।এক্ষেত্রে তাঁকে আদর্শ হিসেবে নেওয়া কার পক্ষেই বা সম্ভব? তেমনই ডাক্তার, উকিল এবং উল্লিখিত ও অনুল্লিখিত বুদ্ধিজীবীরা। তাই সমস্যা বাড়ছে সাধারণ মানুষের।
আমার মনে হয়, যে সকল রাজনৈতিক নেতারা দল পরিবর্তন করছেন তাঁদের প্রথমে নির্বাচন কমিশনের কাছে গিয়ে পরাজিত প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা উচিত। কারণ যে ভোট নিয়ে তিনি ক্ষমতায় রয়েছেন সেই ভোটাররা তো দল পরিবর্তন করেননি। তাহলে যে দলে তিনি যাচ্ছেন সেই দলে তিনি বিজয়ী প্রার্থীও নন। শুধু তাই নয়, বিজয়ী প্রার্থী হিসেবে পাওয়া সমস্ত সরকারি সুবিধাও কেড়ে নেওয়া উচিত সরকারের। তা সে দলেরই হোন না কেন। তাহলেই নেতা কেনা বেচার ব্যাপারটা বন্ধ হওয়া সম্ভব এবং রাজনীতিতে এই অস্থিরতা কাটানো সম্ভব।
উত্তম মাহাত, সম্পাদক
অনলাইনে সাঁতার শিখুন
বিবেক সেন
অন লাইনে সাঁতার শিখুন।
তবে এ সাঁতার সে সাঁতার নয়। একেই ভবসিন্ধু ছিল বিপদসংকুল, তাতে এসে জুটেছে নানা বিপদ। মানুষের জীবন ইঁদুরের জীবনে পরিণত হয়েছে।
অন লাইনে যেমন সাঁতার শেখা যায় না, অন লাইন প্রেম প্রেম নয়, অন লাইন চিকিৎসা আর শিক্ষা আধা চিকিৎসা, অর্ধ শিক্ষা। অন লাইন চিকিৎসায় যদি রোগ সেরে যায় তা যতটা ডাক্তারের চিকিৎসার গুণে তার চেয়ে বেশি রোগীর কপালের জোরে। তেমনি অন লাইন শিক্ষাও শিক্ষার গুণে নয়, স্বশিক্ষার মানসিকতা যার আছে সেই পারবে অন লাইন শিক্ষাব্যবস্থা থেকে কিছু গ্রহণ করতে। আমাদের দেশে ভাল ছাত্র মাত্রেই স্বশিক্ষিত, বাকিদের শিক্ষার মান এতই খারাপ যে দিনের পর দিন একের পর এক রাজনৈতিক দল তাদের বোকা বানিয়ে যেতে পারে, আইন আদালত, শিল্প বাণিজ্য, ব্যাঙ্ক, দোকান বাজার সর্বত্র ঠকতে থাকে সাধারণ মানুষ, ধর্ম থেকে রাজনীতি, জন্ম থেকে মৃত্যু ঠকে যাওয়া মানুষ নিজেও কিছু শেখে না, তাকে কিছু শেখানোও যায় না। কাজেই অন লাইন শিক্ষা এক সান্ত্বনা ছাড়া আর কিছু নয়। অন লাইনে পরীক্ষা পাশ করাটাই এখন এই লক ডাউন জেনারেশানের একমাত্র উদ্দেশ্য। তাও যদি কম্পিউটারে, মোবাইলে ক্লাস করে, এক জনের খাতা দশজন টুকে কিছু মাথাতে নিয়েই ফেলে সেটুকুই লাভ।
লক ডাউনে ছাত্ররা শিখেছে তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ নানা শব্দমালা, 'লক ডাউন', 'হার্ড ইমিউনিটি', 'ভাইরাল লোড', 'কোয়ারেন্টাইন', 'অ্যাসিম্পটোম্যাটিক', ইত্যকার শব্দ। ভাইরোলজি, ইমিউনোলজি আর কমিউনিটি হেলথ নিয়ে এত গণসচেতনা আগে কখন দেখিনি। এটুকুই আসল লাভ।
ওয়ার্ক ফ্রম হোম, খুব শুনছি শব্দটা। আমি জানি না এটা কী রকম কাজ। আমার যা কাজ সেটা অফিসে বসে সপ্তাহে দুদিন তো বাকি তিনদিন পথে ঘাটে কাজ করতে পারলে ভাল। সরকারের নানান সাহায্য যারা পান তারা গ্রামেগঞ্জে, শহরের বস্তিতে, অপেক্ষাকৃত কম সম্পন্ন এলাকায় থাকেন। তাদের নানান ঋণের চাহিদা মেটাতে গেলে আমাকে পথে নামতেই হয়। এমন কী যারা নিখাদ প্রশাসন চালান সেই সহকর্মীরাও ঘরে বসে কয়েকটা চিঠি লিখতে পারেন, ওপরমহলে কিছু হিসেব পাঠাতে পারেন, দপ্তরের আভ্যন্তরীণ কিছু কাজ করতে পারেন, কিন্তু সরকারের যে কাজ, দাতা ও গ্রহীতার সম্পর্ক তা অফিস কাচারি আর মানুষের বসতিতে না গেলে সম্ভব নয়। সম্ভব নয় প্রকৃত উৎপাদন করা ঘরে বসে। কৃষি আর শিল্পের উৎপাদন হয় গায়ের শ্রম দিয়ে, এক মানুষের সাথে আরেক মানুষের গায়ের ঘাম মেশে যেন তারা প্রেমিক প্রেমিকার মত আশ্লেষে আবদ্ধ। তাতেই জন্ম নেয় পণ্য। ঘরে বসে মার্কেটিং করা যায়। কিন্তু প্রকৃত উৎপাদন, এমন কী পণ্য যোগানও ঘরে বসে হয় না। কাজেই ওয়ার্ক ফ্রম হোম যতই জাতীয় আয়ের বড় অংশ নিক না কেন তাতে বাস্তবে পেট ভরে না।
আচমকা লক ডাউন ঘোষণা করা হল, বন্ধ করে দেওয়া হল দোকানপাট, ট্রেন বাস, রাস্তার খাবারের গুমটি, কলকারখানা। একান্ত প্রয়োজনীয় না হলে বন্ধ। ঘন্টাটন্টা বাজানো হল। প্রদীপ জ্বালানো হল। কোনটা একান্ত প্রয়োজনীয়? কোনটা নয়? আমার স্ত্রীর ফেশিয়াল করাটা খুব প্রয়োজনীয় নয়। কিন্তু যে বাচ্চামেয়েটা ফোন করলেই সাইকেল করে এসে যত্ন নিয়ে ওর মাতৃসমা মধ্যবিত্ত মহিলাদের ফেশিয়াল করে দেয়, মাথায় হেনা করে দেয়, তার কাছে কিন্তু এই কাজ একান্ত প্রয়োজনীয়। তার শয্যাশায়ী বাবা, রুগ্ন মা, স্কুল পড়ুয়া ভাইকে এভাবেই সে একটু ভাল রাখে। গত মার্চ থেকে তার প্রায় কোন কাজ নেই। প্রায় কোন কাজ নেই স্টেশানের রোলের দোকানের ছেলেটার। প্রায় কোন কাজ নেই বাড়ি বাড়ি খবরের কাগজ বিলি করা আধবুড়ো মানুষটার। ওলা ক্যাব চালাত যে সে বিক্রি করছে ভ্যানে করে সবজি। ফোন করলেই চলে আসবে। মাছ বিক্রির ছেলেটির মাছ কাটা দেখে বুঝলাম সে জীবনে প্রথম এই কাজ করছে। জিজ্ঞেস করলে জানাল শেয়ালদা কোর্টের সামনে টাইপ করত। মা ছাড়া কেউ নেই। মায়ের ক্যান্সার। করোনার ভয় বলে ঘরে বসে থাকেনি। মায়ের ঘরে যায় না সে। বারান্দায় শোয়। কত জনের খবর দেব? নেবই বা কতজনের খবর? ট্রেনের হকার, রিক্সওয়ালা, সোদপুর থেকে রোজ বর্ধমানে কারখানায় কাজ করতে যাওয়া মানুষ থেকে শুরু করে ছোট আইনজীবী, ছোট কারখানার মালিক, কাপড়ের দোকানের মালিক, তিনতারা হোটেলের ম্যানেজার সমাজের একটা বড় অংশ, দরিদ্র, নিম্নমধ্যবিত্ত, মধ্যমধ্যবিত্ত এক ধাক্কায় বেকার হয়ে পড়ল। পরিসংখ্যান বলছে দেশের আয় ৩০-৪০% কমে গেছে।
এটার কোন প্রয়োজন ছিল না। ৩১ ডিসেম্বর উহানের মহামারীর খবর জানার পরই আন্তর্জাতিক ভ্রমণকারীদের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করলে ভারত করোনা মুক্ত থাকতে পারত। স্বল্পদৃষ্টি প্রশাসকরা কোন এক অজ্ঞাত কারণে কিছুই করল না। ভারত পিছিয়ে গেল অন্তত দশ বছর। এই আঘাত থেকে ফিরে আসতে কত বছর লাগবে কে জানে? হয়ত পাঁচ বছর। কিন্তু রোগে, বিনাচিকিৎসায়, অনাহারে, দীর্ঘ পথশ্রমে যারা চলে গেল তারা ফিরে আসবে না। অর্ধাহারে, অশিক্ষায় যাদের ভবিষ্যৎ গঠন ব্যহত হল তাদের ক্ষতিপূরণ খুব সহজ হবে না।
তবুও ভারতের জনতা সর্বংসহা। আগামী ভোটের সময় সে সব ক্ষমা করে দেবে। আর আবারও অপরাধীদের শাস্তি দেওয়ার পরিবর্তে তাদেরই নির্বাচিত করবে দণ্ডমুণ্ডের কর্তা হওয়ার জন্য।
কথাবার্তা ২
মধূপর্ণা কর্মকার
যা কিছু আমরা স্কুল কলেজে পড়ি না, প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে স্বীকৃত নয় সেই সব দক্ষতা, জ্ঞান নিয়ে আমাদের সমাজে এক ধরনের তাচ্ছিল্য আছে।প্রতিষ্ঠানিক যা কিছু তার প্রতি আমাদের নিষ্ঠা প্রবল। কিন্তু তার বাইরে যা কিছু চর্চিত হয় তার প্রতি আমাদের সমীহ তেমন নেই। তার একটা বিরাট অংশ দেখা যাচ্ছে নারীর বিভিন্ন দক্ষতা। পিছিয়ে রাখা (পিছিয়ে পড়া বলা যাবে না ) মানুষের দক্ষতাকে ধর্তব্যে আনে না বিশেষ কেউ। তার মধ্যে আবার আছে আরাে অবদমিত কেউ। তিনি আর কেউ না। তিনি প্রান্তিক নারী। সার্বিক ভাবেই নারীর কাজ, নারীর অবদান অস্বীকৃত থেকে যায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই। তার যে কাজ গুলাে দৃশ্যমান সেখানে তাকে উপযুক্ত পারিশ্রমিক দেওয়া হয় না। নারীর শ্রম আমাদের ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রেখেছে ভিতর থেকে। বিপুল কায়িক শ্রম ও সময়ের বিনিয়োগ দিয়ে নারী সভ্যতাকে টেনে নিয়ে যায়। কিন্তু তার কোনাে স্বীকৃতি নেই। এমন অংসখ্য কাজ রয়েছে যা সমাজে প্রায় অদৃশ্য বা বলা ভাল আমাদের সমাজ যেন দেখেও দেখে না। কিন্তু তার সুফল ভোগ করে নির্বিকার চিত্তে। বলা বাহুল্য সেই সব তথাকথিত অদৃশ্য কাজ যা নারী প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে করে আসছে সেইসব কাজই আমাদের সমাজের চালিকা শক্তি। তাহলে সেইসব কাজ স্বীকৃত ও সমাদৃত নয় কেন? এখানেই পিতৃতন্ত্রের রাজনীতি।
প্রান্তিক নারীর দৈনন্দিন শ্রমের কথা যদি ধরা যায় তাহলে দেখা যাবে সে যেকাজ গুলাে মূলত করে সেগুলাে নিয়ে সমাজ বিশেষ ভাবে উপকৃত হয়। সে রান্না করে। প্রতিদিনের খাবার যেমন সে বানাতে জানে তেমনি বছরের নানা সময়ের নানা অনুষ্ঠানের সময় সে হতে পারে পুজোপাৰ্বন বা হতে পারে ঋতু উৎসব তখন আরাে নানা বিচিত্র খাবার সে বানায়। পিঠে পুলি, নবান্ন, নাকু , খই মুড়ি । সে জানে ধান থেকে কি কি পদ্ধতিতে নানা ধরনের খাবার বানানাে যায়। ধান বিশেষ পদ্ধতিতে সেদ্ধ হলে তারপর সেই চাল থেকে ভাত হবে। তার পরিবার সন্তান সন্ততিরা তাই খেয়ে রােজ দিনযাপন করবে। ধান থেকে আবার ভিন্ন পদ্ধতিতে চাল হলে তা থেকে মুড়ি হবে। আরো ভিন্ন ভাবে হবে চিড়ে , খই। আতপ থেকে হবে পায়েস। আরাে কত কি সে জানে। যা থেকে যুগ যুগ ধরে মানুষেরা, নারীর পরিবার তার সন্ততিরা টিকে আছে। সে সন্তান পালন করে। নানা পরিচর্যায় লালন পালন করে সে গড়ে তােলে , বড় করে তার সন্তান। এই লালন পালনকে “মেয়েলি" কাজ নাম দিয়ে হেয় করে আসছে। কিন্তু এই লালন পালনের দক্ষতার মাঝেই টিকে আছে আমাদের চলমান সমাজ। সে ঘরদোর সাফসুতরো করে, নিকোয়, ঝাঁট দেয়। সচল রাখে গৃহস্থালী। এই অত্যন্ত সহজ, স্বাভাবিক হয়ে যাওয়া কাজ গুলাে গুরুত্বহীন ভাবে দেখা হয় তার কারন এগুলাে করে একজন নারী। নারী সম্পর্কিত যা কিছু সবকিছু হেয় করে দেখলে পিতৃতন্ত্রের অসুস্থ অহং তৃপ্ত হয়। নারীর ওপর আধিপত্যের আকাঙ্ক্ষায় পিতৃতন্ত্র অযুক্তির পরম্পরা নির্মাণ করে আর তা সমাজে লাগু করে। সে সময় পেলে ছবি আঁকে ঘরের দেয়ালে। তাকে যথাযথ শিল্প হিসাবে স্বীকার করা হয় না। যেন নিতান্ত সময় কাটানাের জন্য কিছু গুরুত্বহীন কাজ। সেলাইকে শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসাবে স্বীকৃতি পেতে অনেক সময় লেগেছে। তার একটাই কারন সেলাই এর মাধ্যমে শিল্প তৈরি করে মূলত মেয়েরা। এইভাবে দেখা যাবে যা কিছু কাজ নারী করে ও যা কিছু কাজ নারী সম্পর্কিত সেইসব নিয়ে এক ধরনের তুচ্ছ তাচ্ছিল আছে। সেই কাজগুলাে যা মূলত চালিকা শক্তি। তাকে গুরুত্ব দেওয়া না হোক স্বীকার করলেও নারীকে শক্তিশালী করে তােলা হবে, তাকে তার উপযুক্ত জায়গা দেওয়া হবে যাতে সে নিজেকে চিনবে। সেই আতঙ্কে তাকে তার প্রাপ্য মর্যাদা না দিয়ে ভুলিয়ে রাখা হয়। যেন এই কাজ গুলো তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। যে কেউ চাইলেই পারে। এ জন্য দক্ষতার দরকার হয় না। আর এই সব কাজ নিতান্ত মেয়েলি। এই মেয়েলি' তকমার মধ্যেই রয়েছে লিঙ্গবৈষমের রাজনীতি। যেন এই কাজ গুলাে স্বীকারের অযােগ্য। তা স্বীকার করে গুরুত্ব দেওয়া যায় না। কিন্তু তা অবলীলায় ভোগ করা যায়। তার দক্ষতা নকল করে বাজারে বেচেছে কেউ কেউ। কিন্তু কোনােভাবেই নারীকে তার কাজের জন্য তার দক্ষতার জন্য প্রাপ্য স্বীকৃতি ও মর্যাদা দেওয়া যাবে না। এইভাবেই পিতৃতন্ত্র তার বিষাক্ত ও ভয়ংকর বিন্যাস বহাল রাখে। আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যস্থাও যেহেতু পিতৃন্ত্রের দ্বারা পরিচালিত এবং পিতৃতন্ত্র বহাল রাখার একটি হাতিয়ারও বটে। সেখানেও দেখা যাবে একই বিষয়ের প্রতিফলন। নারীর অসামন্য কিছু দক্ষতা যা খালি চােখে প্রায় দেখা যায় না যেন, বা দেখলেও তা ভুলে যেতে হয় তৎক্ষনাৎ সেইসব অতিপ্রয়ােজনীয় অথচ প্রকট দৃশ্যমান নয় যা কিছু তা দিয়ে টিকে আছে আমাদের মনুষ্য সভ্যতার রেশ।
ঠিক এই ব্যবহার মানুষেরা প্রকৃতির সংগে করে থাকে। পিতৃতন্ত্রে জারিত সভ্যতা নারী ও প্রকৃতিকে একই মনোভাব থেকে ব্যবহার করে ও শােষণ করে। নিজের প্রয়ােজনে নিজের ইচ্ছায়। যথাযথ সংবেদনশীলতা ও স্বীকৃতি ছাড়াই। আর এই যে পরিবেশের দ্রুত পরিবর্তন ও ক্ষয়ক্ষতি তাতে দেখা যাচ্ছে সব থেকে বেশি প্রভাবিত হন ও ক্ষতির সম্মুখীণ হন প্রান্তিক নারী। যাদের জীবন প্রকৃতি সংলগ্ন ও যাদের জীবন অনেকাংশে প্রকৃতিনির্ভর । পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থা একটি মনােভংগী যার বৈশিষ্ট্য হল দমন ও অপব্যবহার। এই মনােভাব একদিকে নারীর ক্ষতি করছে অন্যদিকে প্রকৃতির।
যৌথতা ভেঙে যায় (সপ্তম কিস্তি)
নির্মল হালদার
বুবুর সঙ্গে সারা বছর কোনো যোগাযোগ থাকে না।পুজো এলেই, যোগাযোগ করি। সেও সাড়া দেয়। টাকা পাঠায় পুজোর জন্য।
কেউ কেউ থাকে, কেউ কেউ আছে যারা অন্তরে অন্তরে অনুভব করে ভালোবাসার সঙ্গে বেঁচে থাকা। নিজেও বাঁচবো অপরকেও বাঁচাবো। এখানেই যুথবদ্ধতার এক অনুভবি মন প্রকাশ পায়।
বুবুর সঙ্গে নব্বইয়ের দশকে আলাপ-পরিচয়। সে তখন পুরুলিয়া পলিটেকনিকের ছাত্র। তার মাধ্যমেই শংকর চক্রবর্তী পুষ্পেন সরকার সুমন বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে আলাপ।
পুষ্পেনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাইলেও সে অধরা। সুমনের সঙ্গেও একই ব্যাপার।
সেই পলিটেকনিক, হোস্টেল বাড়ি আমার ছিল আরেক খামার। যখন তখন চলে যাওয়া। নেশা করা। মাঝরাতের পর ঘুমিয়ে পড়া। সকালে উঠে ঘরের দিকে। ঘর থেকে অথবা খামার থেকে আরেক ঘরের দিকে যাওয়া।
আমাদের কারোরই একটা ঘর নেই, মনে মনে অনেক ঘর। কেবল ঢুকে যাও।
শংকর চক্রবর্তীর সঙ্গে প্রায় প্রতিদিন কথা হয়। কথার সঙ্গে কথা জুড়ে উষ্ণতম এক আশ্রয় গড়ে ওঠে।
আমার এক বন্ধু তপন পাত্র একটা কথা বলছিল যে, আমার পাশের বাড়ির লোক আমার প্রতিবেশী নয়। কেন না, তার সঙ্গে আমার কোনো উষ্ণতা বিনিময় হয় না কোনোদিন। যে আমার থেকে যত দূরেই থাকুক যার সঙ্গে আমার সুখ দুঃখ বেদনা বিনিময় হয়ে থাকে, সেই তো আমার প্রতিবেশী।
পাশে থাকলেই বা পাশে বাড়ি থাকলেই, আমার প্রতিবেশী নয় আমার বন্ধু নয়।
বুবু থাকে খড়গপুর আইআইটিতে। দেখা হয়নি অনেক অনেক বছর। কিন্তু আমরা দু'জন দুজনের মনে থাকি। দু'জনের মন একটি ছাউনি।
রোদে জলে ঝড় বিদ্যুতে আমাদের নিরাপত্তা দেয়। নিরাপদ রাখে শংকর। সে তো পুরুলিয়া প্রেমিও। প্রকৃতিপ্রেমীও। প্রকৃতি পরিবেশ নিয়ে সে বিচলিত হয়। সময় সমাজ নিয়ে তার উদ্বেগ টের পাই।
২০২০ ফুরিয়ে আসছে। তারপরও বুবু ও শংকর আমার সঙ্গেই আছে। আছে অজস্র বন্ধুরা।
আমেরিকার এক শহরে থেকেও সৌম্য দাসগুপ্ত আমার সঙ্গেই আছে। আছেন, প্রতুল মুখোপাধ্যায়। যখনই ফোন করি তাকে, অপরপ্রান্ত থেকে তার কণ্ঠস্বর: বল কেমন আছিস? এই জিজ্ঞাসা থেকেই, এক সরলরেখায় আমি দাঁড়িয়ে পড়ি। যেন বা প্রতুলদার গানের সুর। সুরের তরঙ্গ। আমাকে আন্তরিক করে। আমি সুরের ঢেউয়ে নাচতে থাকি গাইতে থাকি। গাইতে গাইতে বিপুল চক্রবর্তীর ঘর। আরেক গানের ঘর। কবিতার ঘর। স্বপ্না ও বিপুল আমার আরেক আস্তানা। অজস্র আস্তানার দিকে হাঁটতে হাঁটতে আমি দেখি, অনন্ত আকাশে আমিও আছি একটি তারার পাশে। আমার আরেক
যৌথ-খামারে।
সুজন পণ্ডার কবিতা
১.
আঙুল বাড়িয়ে
এখানে আমার শহর
আমার পুরোনো শীত-আবাস
পুরোনো এই বন্ধুর কাঁধে হাত রেখে প্রশ্ন করি
কেমন দেখছো এই অঘ্রান রাত?
এই হিম
এই ওম
শহর শ্বাস নেয় একটু...
আরো গভীরে জড়িয়ে নেয় মহীরূহদের শিকড়
আরো একটু ঢুকে আসে প্রাণের ভিতরে
তারপর নিশ্চুপ...
আমি একটু এগিয়ে চিবুক রাখি
আমার ফেলে আসা ইস্কুল বাড়িটার রেলিং-এ
বলি এই নাও বাড়িয়ে দিলাম হাত
আমাকে ছুঁয়ে চিনিয়ে দাও শৈশব
কিছু বিকেলের গল্প শোনাও বরং
তারপর রাত নেমে এলে
শহর একা জেগে থাকে
দু একজন ব্যস্ত নাগরিক বাড়ি ফেরে দিনান্তের হিসেব মিলিয়ে
যেভাবে পাখি ফিরে আসে ডানার উষ্ণতা নিয়ে
যেভাবে ধার বাকি জীবনে বয়স বাড়ে প্রতিদিন
শহর তখন আঙুল বাড়িয়ে আমাকে চিনিয়ে দেয় তারাদের শব...
২.
রোডোডেনড্রন
শিশুটির ঘুম ভেঙ্গে ছিল আসমানী রং মেখে
"কালাশনিকভ" এর নাম শোনা হয়নি তার
বহু যুদ্ধের পর, তার বাবা বাড়ি ফিরেছে
অসময়ে বৃদ্ধ বাবার হাত জোড়া বারুদের ঘ্রাণ
একে একে ফুল আসছে গাছে
এই শীতে উপত্যকা জুড়ে আলোর মেলা
ভারতবর্ষ শান্তির মতো
মা-এর কোলে শুয়ে শিশুটি দেখেছে
লাল রঙা গনগনে সূর্যোদয়
আরো হাজার বছর লক্ষাধিক সূর্যোদয় দেখতে চেয়ে
বাবার বারুদ হাত ধুইয়ে দেয় শিশুটি
প্রতি সকালে মা-এর চোখ মুছিয়ে দেয়
পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতা
১.
দুঃশাসনীয়
কান টানলেও এখন আর মাথা সহজে আসে না,
রক্তক্ষয়ের কাছে দাঁড়ায় না আত্মীয়তা
গাছের ওপর গাছ গজিয়ে যায়,
আয়ু হয়ে ওঠে মিথোজীবী
গাছের থাকে না পরিজন,
একটি গাছ তবু অন্যের কেউ হয়
বৃক্ষের মাতৃত্বও আকণ্ঠ নির্জন এক দ্বীপ--
দূর অস্তের বুক-পকেট হাতড়ে ক্ষারে কাচা কিছু একাকিত্ব নিয়ে, এসো, অশাসিত এই বালুচরে জ্যোৎস্না পোহাই জোনাকি কুড়াই
সম্পর্কগুলি ওল্টানো কূর্ম হয়ে যাক, তাদের সুস্নাত সমতল পেটে
লাল-নীল মোমবাতি রেখে প্রতিদিন পালন করি অসংখ্য
দ্বৈপায়ণের জন্মদিন...
২.
অপলক
চোখের তারাই তো নক্ষত্র রে বাপু,
আবিল পৃথিবীর অপরাহ্নে ছাই দিয়ে মোছা হ্যারিকেন-কাচে তাকে দেখতে পাই, চোখ বুজলেও
অগ্রন্থিত কালির মতো
জমে ওঠে সান্ধ্য-বোধ অনিমিখ এই সৌরজগতে
স্বর্গ শুঁকে এসে কালপুরুষের পায়ের কাছে বসে আছে শিকারী কুকুর,
চু চু ডাক দিলেই ন্যাজ নাড়বে সে
উত্তাল নদীতে লৌকিক হেঁটে দেখিয়েও দেবে,
নদীর এপারে জন্ম থাকে, ওপারে থাকে লালনপালন
ভগবানের শৈশব ও কৈশোরের কথা বলতে গেলে কাক-কোকিলকেও মনে পড়বে
চোখের কালোয় প্রভাত আছে দিগন্ত ঘেঁষে,
ও আমার নয়নতারা, সূর্য উঠলেই যদি তুমি অস্ত যেতে
আমি যে একেবারে অন্ধ হয়ে যেতাম
সূর্য উঠলে সমস্ত কাকও অনিকেত হয়ে যায়...
কৃষক
শ্যামাপদ মাহাতো
মাথার চাষ
মেধার চাষ
বহুদূর।
মাটির সঙ্গে আমার বাস
ফসলের সঙ্গে আলিঙ্গন,
তারই সঙ্গে আমার সম্পর্ক
অনুসূর।
আমাদের খাল-বিলে চুনোমাছ ,
মাছের মুখ
কোনো কোনো বিলে শুধুই শামুক।
শামুক গুগলি খেয়ে হাঁসের ছানাও বড়ো হয়
কার ধান কে খায়
বকেও খায়
হাঁসেও খায়।
পুড়ে শুধু চাষীর হৃদয়।
কেউ কি বলে-
চলো পোড়া হৃদয়ে আগুন খুঁজবো
রাজহাঁস যদি জাল দিয়ে বিল বানায়
আমরা তো চুনোপুঁটি
কোন পাঁকে মাথা গুঁজবো?
সন্দীপ মুখোপাধ্যায়ের কবিতা
সারাজীবন একটা শব্দের দোরে কপালের চাপ।
উপেক্ষা।
বাবা সারাজীবন রেল লাইনের দিকেই তাকিয়ে ছিল। তারপর
উপেক্ষা।
আমার জীর্ণ বাড়িটায় জবাফুলেরও
উপেক্ষা।
সুমন মুখার্জীর কবিতা
১.
কলঙ্ক
অন্ধকার...অন্ধকার...কালো পিচ রাস্তার সরু কোমর থেকে একটা আলো এগোচ্ছে আমার দিকে । চাইছি না আলোর সম্মুখীন হতে, ভয় আছে গো । সব্বাই দেখে ফেলবে আমায়, বুঝে যাবে চোখের কোণে আলো চিকমিক করলে । আমি চাইনা কেউ পড়ে ফেলুক নিস্তব্ধতা আমার । করুণা চাইনা আমি ।
আহঃ! ক্লান্ত লাগছে খুব, তৃষ্ণা পেয়েছে খুব; শান্তির আকাল ।
চাঁদের জ্যোৎস্না আজ প্রেমিক বানাচ্ছে না, অশান্ত কলঙ্কের দাগ গুনছি আজ । ভাবছি, যে নিজেই কলঙ্কিত, সে চরিত্রবান প্রেমিক বানায় কেমনে! পিছন ফিরে দাঁড়ালাম, আলো পেরিয়ে যাক । আবার অযাচিত কলঙ্ক গুনবো আমার।
২.
ব্ল্যাকবোর্ড
"দে বলটা দে, বারবার বলেছি বল আনবি না, আনবি না । আজ এটা নিয়েই চললুম, হেডমাস্টারের কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে আসিস ।" - এই বলে আমাদের মন্দিরের ক্লার্ক কিরিডি বাবু এসে বলটা নিয়ে চলে গেল । হ্যাঁ আমাদের মন্দির আমাদের স্কুল। সময়টা ছিল নবম শ্রেণীর একদিনের টিফিন পিরিয়ডের । বারবার মানা করা সত্ত্বেও কেউ না কেউ ঠিক নিয়ে চলে আসতো বলটা, ক্লাসরুমের দেওয়ালে ছুড়ে ক্যাচ নেওয়ার জন্য ।
বসলো আড্ডা । কারুর রুটি-আলুভাজা, কারুর পরোটা আর আচার আর কারুর দামী দামী কেক, বিস্কুট আর বিভিন্ন ঘরোয়া খাবার । তারপর শুরু হলো বাচালগিরি আর থামতো সেই টিফিন শেষের ফাইনাল ঘন্টা বাজার পর । গেটকিপারের প্রথম তাড়া খাওয়া থেকে প্রথমবার প্রেম আর টিউশনে কে কার দিকে তাকালো, সব বেঞ্চগুলোই শুনতো আমাদের । তখন হয়তো বেঞ্চগুলো হেসে বলতো " ক্যায়া পাতা কাল হো না হো"
আজ শুনতে পাই ওদের নীরব বাক্যগুলো খুব স্পষ্টভাবে, আজ ওদের থেকে দূরে থেকে ওদেরকেই আরও বেশি ভালোবেসে ফেলছি যেন । খোদাই করা ছোট্ট প্রেমের কতোই না নাম খোদাই আছে কাঠের ডেস্কগুলোতে। ইচ্ছেগুলো আজ বাধা মানতেই চায় না আর । দৌড়ে যায় ওই ব্ল্যাকবোর্ডে সাইন-কস আর খ্রিস্টাব্দ শিখতে, নিজের কাছে শুধু থেকে যায় অভিজ্ঞ হৃদয়। যদি এরকম হতো, আরো কয়েকটা বছর একসাথে সেই সায়েন্স-আর্টস-কমার্স। হ্যাঁ সেই শেষ একত্রিত হওয়ার সময়ের কথা বলছি, দশম শ্রেণী । আরো একবার যদি ঝামেলা হতো বন্ধু, তোদের সাথে, আরো একবার যদি একটা ১৫×১৫mtr² এর ঘরে আমাদের অ্যাটেন্ডেন্সের খাতায় ভর্তি উপস্থিতি থাকতো!
সবাই বলে সময়ের সাথে পা মিলিয়ে চলতে হয়, ভাই তোরা একবার একসাথে আবার হয়ে দেখ, সময়ও থমকে যাবে আজকের এই অভিমানী বন্ধুত্বে ।
"যদি বলো স্বর্গ চাই যেতে,
নাকি বন্ধুদের সাথে স্কুল,
স্বর্গ ভুলে দৌড়বো বন্ধু,
তোদের দেখতে চোখ আজ বড্ড ব্যকুল"
রাম কুমার আচার্যের কবিতা
নিঃশ্বাস ফেলছি দীর্ঘ।
নিচু হয়ে ঢুকছি ঘরে।
রাস্তাগুলি হয়ে যাচ্ছে ছোট।
ফিরে কি আসবে ছোঁয়াছুঁয়ি খেলা? অন্ধকার ছুঁয়ে কী পাবো আমার মায়া?
পিঠ ডিঙিয়ে মনে করেছি,পাহাড় টপকে এলাম।
খেলা কী শেষ?
একা নই, আমার সঙ্গী আমার ঘরের কালিঝুলি। আলো নিভলেই ভয় দেখায় ওরা।
উৎপল চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা
১.
এই একটি জীবন
প্রবল রক্তস্রোতে ডুবে আছ পদ্মরাগ
এবার দেবতার জন্ম হলে
ইন্দ্রিয়ের প্রথম সূচনায় নারী
বিক্ষিপ্ত এমন সংসারে দাঁড়িয়ে
আমার রক্তে লোভ, নিশ্বাসে লালা
কণ্ঠবায়ুর আকুল আবেদনে
উদভ্রান্ত কোরাসের মনে আদর আসে
তবুও ক্লান্ত নদীটির মাঝখানে পৃথিবী
সূর্য নেই
অন্ধ আঁচলের নিবিড় ছায়া মেখে
নেমেছে দয়িতা
এই একটি জীবনে
আমি আমার বয়স মানি না
এই একটি জীবন ,
আমার বাঁ পাশে শুধু নারী
তবু হিসেব রাখি------------
পদ্মরাগ ছুঁয়ে আবারো দেবতার জন্ম হলে
এখন বাতাসের ধাক্কা লাগে শরীরে
২.
তুমি জাগো-------
তুমি রপ্ত করেছো সিরাজী পায়রার
ভিজে কণ্ঠস্বর
আদি মানবীর জৌলুসে পাখা
ধারালো তোমার অস্তিত্ব ছুঁয়ে
পরম যত্নে লালন করে চলেছ
বিষুব শিশির আর অমিয় উষ্ণতা
আমিও সূর্যশিরায় গোপন রেখেছি সময়
ব্যাস্ত নাগপাশে এবার মানবিক
যত স্বপ্নের দিনগুলি
কামরঙা সূর্যের বিধেয় পর্যায়
তোমার দেহতত্ত্বের তরঙ্গায়িত শব্দ থেকে
এবার জাগো ------- জেগে ওঠো
ছিটেফোঁটা জৈবের সহবাসে যত অভ্রান্ত নীল আর ভাঙা হাস্যে খর্বকায়
এমন পরিযায়ী আয়ূর ভেতর
প্রলুব্ধ মেঘ কেটে এখন শব্দ অশব্দের
দ্যোতনায় ইতস্তত মিশে আছে মূর্ছনা
তুমি জাগো
তুমি রপ্ত করেছো সিরাজী পায়রার সুমধুর
বক্কম বক্কম
৩.
তোমাকে উত্তরে রেখে দিলে.........
তোমাকে উত্তরে রেখে দিলে
খুব সামান্যই আমার শব্দ প্রতিভা
চোখ পেতে সবুজ ভূমির
সুবর্ণ ছায়াটির পাশে সুদূর সোনাঝুরি
আরও কিছু অবর্ননীয়, অর্থহীন কাঁটার মতো
আমার মানুষ প্রবৃত্তি
পৃথিবীকে ছুঁয়ে দেখার উচ্ছ্বাসে
এবার যত ঢেউ-এর মৃত্যু
রূপকথা, পুরুষ বাক্য আর অন্ধকার শোক
তোমাকে উত্তরে রেখে দিলে
নীল শূন্য-এর গায়ে আমার দুপুর ফুরায়
বিবশতা দাঁড়ায় পশ্চিমে
এরপর সন্ধ্যার মুখে উড়ন্ত ঘাস ফড়িং
তোমাকে উত্তরে রেখে দিলে
আমিও বাক শূন্য বিশ্ব দেখেছি একবার. . . . . . .
সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা
১.
পরিভাষ
আমরা দুজন এক বিছানায় থাকি,
সেই আমাদের বিধিসম্মত সুখ;
ফাঁকির গলায় সূত্র বেঁধে রাখি,
হাসির ছটায় ফুলিয়ে তুলি বুক।
আমাদের অভিমানের নামটি ভঞ্জনা।
আমাদের পাশে থাকার নামটি আনজনা।
বদনামী তাে দেবেই সুশীল সজ্জনে,
আমাদের অজুহাতের নামটি খঞ্জ না।
২.
তুমি পায়
আগুন পাঠালে তুমি নেবে?
নেবে জল, প্রবাহে দ্বিগুণ হলে শিখা?
রােমহর্ষ মিটে গেলে, আঁচে নেবে সুখ?
ফেলে দেবে বুকজমা ঘুমের শামুক?
এতসব মূর্ধাছুট, এত নিদ্রারােগ...?
ঝাঁপ দেবে নীলকণ্ঠ সমুদ্র-আধারে?
নাকছাবি খুলে দেবে ব্যাহত চুম্বনে?
আর যদি পুষ্পসুখ রেখে দিতে চাই,
নখাগ্রে তুলে দেবে ক্ষতজ্ঞান বিরহ-সাক্ষর?
ঘুম পায়, স্বপ্ন পায়, প্রেম পায়...
অন্ধকারে 'তুমি’ পায় শুধু।
৩.
ছুতো
বােশেখ হয়ে তােমার বুকে আছাড় খাবাে ইচ্ছা করি।
তােমার চুলে, আমার ভুলে, হত্যে দেবাে মাতাল শরীর।
এই যে মেঘে খুব ভেসেছি, ভাসান মানেই জীবন নাকি?
এ দুই আঙুল, এ দুটো ঠোঁট তােমার নাভির কাছেই রাখি।
আর যা কিছু ধরতে গিয়েই গন্ধ পেলাম ‘তুমি-তুমি,
সাত সায়রে, সাধবাজারে তাদের দিলাম জন্মভূমি!
এ ছাড়া আর কী বা আছে? পাখির ডানায়, পাতায় গাছে?
সময় দেখাে সেঁকছে রুটি তােমার চুমুর উষ্ণ আঁচে।
যেমন ধরাে রাত্রি এসে গােগ্রাসে খায় রােদের বিভাস,
তেমনি তােমার কান-কুহরে আমার অনর্থতার নিবাস।
চিহ্নতত্ত্ব ঠিক খাটে না, শব্দ দেয় না ডিকশনারি...
নীরবতাই শব্দ তখন, উচ্চারণের আধিকারিক।
এই না বলে কাব্য আমার গুটিয়ে নিলাে লাটাই সুতাে।
কাব্য মানে কাব্য তাে নয়, কাব্য তােমায় ছোঁবার ছুতাে।
৪.
হেমন্তে
হঠাৎ করে আছড়ে পড়ে ঢেউ
বর্ষণভারে শাখা ডালপাতা ক্লিন্ন
ঝড় ছিটোলাে সাবেক ধুলাের মত
আসবাবে তার লেগে চুম্বন-চিহ্ন
গেরস্থালির অলস বাসের গায়ে
ঝুলছে সময়, ঝুলছে মন ও প্রাণ
কাচা কাপড়ের গন্ধে তরঙ্গিত
ভালােবাসাদের অনুচ্চারের গান
বাসনকোসনে যত দাগ লেগেছিল
যত জর্জরে বুক আর পিঠ ছিন্ন
স্বভাব ছুঁলেই দিনান্তিকের রেখা
মেঘের সিঁদুর সিঁথিতেই উদ্ভিন্ন
তবুও দুজন গান বাছা গান শােনা
তােমার কর্ণে আমার সুরের ঘ্রাণ
তােমার বুকের তিলের ঈষৎ দূরেই
অস্তরাগে আমারই অগ্রহায়ণ।
সম্পাদক : উত্তম মাহাত
সহযোগিতায় : অনিকেতের বন্ধুরা
যোগাযোগ : হোয়াটসঅ্যাপ ৯৯৩২৫০৫৭৮০
ইমেইল-uttamklp@gmail.com



ভালো হয়েছে।
উত্তরমুছুনসব লেখাগুলো সুন্দর। সম্পাদনার কাজটি ও ভীষণ ভালো।
উত্তরমুছুনআবার আকর্ষণীয় সংস্করণ উপহার
উত্তরমুছুনঅনবদ্য সংবরণ, পরের জন্য আগ্রহী থাকলাম।
উত্তরমুছুন