দ্বিতীয় বর্ষ ।। তৃতীয় ওয়েব সংস্করণ ।। ৯ জৈষ্ঠ্য ১৪২৮ ।। ২৪ মে ২০২১
মানুষ ভালো নেই। এই মৃত্যু মিছিল বহুদিন দেখেনি ভারতবর্ষের মানুষ। সরকারের ভুল ও হঠকারী সিদ্ধান্তের ফলে পরিবার নিঃশেষ হয়ে গেল অনেকের।
সরকারি হিসেবের কম করে দশ গুণ বেশি মানুষ শুয়ে পড়লো ধরণীর বুকে। সহস্র লাসের বোঝা বইতে হলো গঙ্গাকে।
কে দেবে হিসাব গ্ৰামে গ্ৰামে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়া মানুষের? কে বলবে এই সব মানুষের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ?
সুরক্ষার নামে এতদিন দিয়ে আসা কোভিডের ভ্যাক্সিন "কোভিশিল্ড"প্রমাণিত হলো সুরক্ষিত নয়। তাহলে কি দিল মানুষকে বাঁচানোর নামে?
সীমাবদ্ধ বিজ্ঞানের উন্নতি নিয়ে কিই বা লাভ? তার থেকে মানুষকে মানুষের মতো করে বাঁচতে দিলে যতদিন বাঁচতো শান্তিতে বাঁচতে পারতো হয়তো। বাতাসের অক্সিজেন দূষিত করে বহু টাকার বিনিময়ে ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা করাকে বিজ্ঞানের উন্নতি বলে মানতে হবে আমাদের? নাকি এই প্রচারের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে আরও সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম মানুষ মারার কৌশল।
বিজ্ঞানের বিরোধীতা না করেও একটা কথা পরিষ্কারভাবে বলা যায়, যেখানে পৃথিবীর বুকেই সুরক্ষিত নয় আমরা সেখানে ভিনগ্ৰহে গিয়ে কি করবো? বিজ্ঞান কি এখানেই দু'মুঠো ভাত দিতে পারে না শান্তির?
উত্তম মাহাত, সম্পাদক
_______________________________________________
সংঘমিত্রা চক্রবর্তীর এক গুচ্ছ কবিতা
১.
অক্সিজেন চাই
চিঠির গন্ধে ভাল হয়ে গেলো মন
তোমার ওমানে বৃষ্টি মুখর দিন
বাংলার মেঘে দূষণের পুরু সর
পুরনো স্মৃতিতে ডুব দেয় মালকিন।
আমার জীবনে ঝড়ে পড়ে গেছে ঘর
পোষা টিয়াপাখি উড়ে গেছে খাঁচা খুলে
বাতাসে অবশ্য টান ছিল এলোমেলো
তাই তো কিছুটা বেঁচেছে ছিন্নমূলে !
ওখানে তোমার খবরের শিরোনাম
কী কী চোখে লাগে , মনে মনে রাগ লাগে ?
আমার এখানে ঝাড়ামালগুলো সব
প্রয়োজন মত সুবিধাভোগীরা জাগে !
আড়বাঁশি : আট
দুর্গা দত্ত
ফুল পাখি চেনাই হলো না --
লতা পাতা গাছ গুল্ম পোকা ও মাকড়
কোনো কিছু আমার আর চেনাই হলো না
ধানের শিষের রেণু,
ফুটিফাটা মাটির ভেতরে
হাহাকার ভেদ করে ডুবে থাকা স্তব্ধ জল,
ছলছল শেকড়বাকড়--
কোনো কিছু চেনাই হলো না
তোমার মুখের দিকে
প্রতিরাতে ঝুঁকে থাকা অনিমেষ মেঘ,
ছায়াময় প্রতিটি প্রশ্বাস,
তোমার স্বরের আভা , নিহিত শব্দের ঢেউ
সারারাত নীলে নীলে লুব্ধকের গুটি গুটি ঘুম
সকাল বিকেল জুড়ে বৃষ্টির ওড়াউড়ি --
এসব তো কোনো কিছু
তুমি ছাড়া আমার আর কোনোদিন চেনাই হবে না
এখন তোমাকে ছেড়ে
কোথাও কী করে যাই বলো
এখন তোমাকে ছেড়ে,
হাজার হলেও
কোনো কিছুতেই আমি মরতেও পারবো না
সম্পর্ক - ৯
কমলেন্দু সরকার
এখনো যে চিঠি আসে কার?
কেন আসে
খোপ থেকে বার করি, অভ্যাসমতো
খুলিও না, পড়ে থাকে, জমা হয়
ধুলো জমে যায়
মুঠো দুটো খুলে গেছে
বিকেলের রোদে
মনে হয় চিঠিগুলো পড়ে ফেলি একবার
সন্ধ্যা নামে চিলেকোঠার সিঁড়ি বেয়ে
কোনও আলো নেই,
আঁধার ছড়িয়ে পড়ে চারিপাশে
বুড়ো বটগাছে ওই পাখিরা ফিরেছে
আমি তো ফিরিনি ঘরে।
কারা চিঠি দেয় এখনো
রাত পেরোনো ভোরে!
আহেলী
অনামিকা ব্যানার্জী
সারাদিন শেষে নিজের একটু সময় বার করে নেয় সে,
খুব ব্যস্ত জীবনে একটু সময় পাওয়াই অনেক খানি তার কাছে,
পরিচই তো দেয়া হয়নি, সে দিনের শেষে রাতের কোলাহল আহেলী,
খুবই আনমনা একটু চাপা স্বভাবের মেয়ে,
হয়তোবা সব কিছু গুছিয়ে বলে উঠতে পারেনা,
সবাই সব পারে না কিনা, ওতো সাধারণ একটা মেয়ে,
রাতের শব্দ কুহের নিস্তব্দ এক সুন্দর ধাঁধা আহেলী,
রাতের সময় টুকুই মুক্তো বাতাস নিয়ে আসে জীবনে তার,
কত না পাখির ডাক শান্ত হয়ে এক মনে শোনে,
আর হারিয়ে যায় কেন এক অজানা নিরুদ্দেশর জগতে,
আচ্ছা সব নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়া জীবন গুলো বুঝি রাতে খুঁজে পায়?
আহেলী অনেক অনেক প্রশ্ন নিজেই নিজের মনে করhতে থাকে,
আর হারিয়ে যায় সেই নিরুদ্দেশে,সীমাহীন কোনো ইচ্ছের গভীরে,
সেতো আহেলী, দিনের শেষে রাতের কোলাহল আহেলী।
দ্বিপ্রহার
বিশ্বম্ভর নারায়ণ দেব
থাকতে তো চাই একটা নিয়েই
অকস্মাৎ ঢুকে পড়ে দুই
কথাটা যতোই বলি ইনিয়েবিনিয়ে
ভাইটি আমার রাগ করিস না তুই।
একটি আমার হলুদমাখা হাত
আর একটি দুর ছাই
পান থেকে চুন খসলে বাজিমাত
ভাত নয় রোজ চিতাভস্ম খাই।
একটি আমার তাওয়ায় ঘোরানো রুটি
জলে ময়দায় তালেগোলে মাখামাখি
বিরহের প্রান্ত ছুঁয়ে গগণপথ অন্যটি
ছন্দভেজা হাঁটছে শরীর ইচ্ছাময়ী নাকি!
এইতো সবে হয়েছে সন্ধে
বাকি আরও কত যে সন্ত্রাস
কবিকে বলি কবিতায় মন দে
তারপর যতো দ্বিপ্রহার হোক খাস।
পাবেন সৃষ্টি সারথি ই ম্যাগাজিন।
রুমি চৌধুরীর কবিতা
১.
প্রত্যাশা
আমি আরো কিছুদিন
পৃথিবীর জলমাটি ছুঁয়ে থাকতে চাই
মননে, শিহরণে, অনুরণনে
আরো কিছুদিন মিশে থাকতে চাই রক্তিম দিগন্তে।
আরো কিছুদিন বাজুক জীবনের বিউগল
হোক না হয় কিছু শব্দের কোলাহল
নৈঃশব্দ্যের মগ্নতা আর নিবিড় মুগ্ধতায়
পথ ও পথিকের দারুণ রসায়নে
আরো কিছু ক্ষণ জুড়ে থাক বিমূর্ততায়।
রাত্রির বাড়ন্ত শরীরে আলোকিত জ্যোৎস্নাস্নানে
আরো কিছু পথ পেরুতে চাই এই নীহারিকায়
প্রিয় নগরীর ফুটপাতে নিয়ন আলোর মায়ায়
প্রণয়ের উৎসবে তুমুল অবগাহনে
আকণ্ঠ ডুবে থাকতে চাই
আরো কিছুদিন, আরো কিছু সময়, আরো কিছু...
২.
অকাল শ্রাবণ
গোধূলির মেঘভাঙা আলোর মতো
প্রিয় একরাশ রঙ হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকো
এইখানে, ওইখানে, প্রায় সবখানে
অনুভবের জানলা খুলে হুড়মুড় ঢুকে পড়ো
না মেনে কোন লাজলজ্জা, নিয়ম-কানুন।
স্নানের ঘরের স্বচ্ছ কাঁচে অথবা,
প্রিয় রুদ্রের কবিতার ভাজে
ব্যালকনির ওই বনসাইটিতেও
আবেগের লাঙল চালাও তুমুল মাদকতায়।
জীবন ভূগোল বদলে আবার
বইয়ে দিলে এ কোন্ নদী!
অকাল শ্রাবণে ভিজিয়ে বাঁধালে
দুরারোগ্য মরণব্যাধি।
৩.
নিষিদ্ধ পল্লীর নিষিদ্ধ সংলাপ
দুঃস্বপ্নের করাল দুপুরে বুকের ভেতর
হাতুড়ি পেটানোর নির্মম শব্দ করে তোলপাড়
সস্তা লিপিস্টিকের চড়া রঙে রমরমা মুখোশ
বাংলা মদের গন্ধ আর কলঙ্কহীন পুরুষগুলোর
ঘামের গন্ধে একাকার চারপাশ
প্রতিনিয়ত পিষ্ট শরীর ক্ষুধা ও অনাহারে ক্লিষ্ট।
প্রতিভোরে দেয়াল ফুঁড়ে ওঠে সম্ভাবনাহীন সূর্য
বড় একঘেয়ে তার উদয়-অস্তের চিরাচরিত খেলা
মাতালের বেসুরো সুরে ডোবে নবমীর চাঁদ
'পূর্ণিমা' এখানে শুধুই একটি আভিধানিক শব্দ
অমাবস্যার ঘুটঘুটে অন্ধকারের রাজত্বই বড্ড দৃশ্যমান।
সারা শরীর জুড়ে কালো কালো,
ছোপ ছোপ অসংখ্য ক্ষতের দাগ নিয়ে
বেড়ে ওঠে পিতৃ পরিচয়হীন একপাল অপুষ্ট শিশু
জন্মের আগেই যারা পেয়ে গেছে মৃত্যুর স্বাদ
নড়বড়ে দরজার ওপারে দালালের তীক্ষ্ণ চোখ
স্যাঁতস্যাঁতে ঘরের স্যাঁতস্যাঁতে নোটের অপেক্ষায়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থেকে বাসের হেলপার
একমুঠো সুখ খুঁজতে গিয়ে অস্পৃশ্য শরীরে
প্রতিবার গাঢ় থেকে গাঢ়তর করে কলঙ্কের দাগ
অথচ কলঙ্ক মাখিয়ে দিয়ে আজন্ম কলঙ্কিত ওই
নিষিদ্ধ পল্লী থেকে দুই পা এগুলেই
একেকজন আগাগোড়া শুদ্ধ, সিদ্ধ পুরুষ।
সহসা পাশের ঘর থেকে ভেসে আসে তীব্র কণ্ঠস্বর -
শালা বাটপারের বাচ্চা! পুরো তিনশো টাকাই দিবি
গতর বেইচ্চা খাই,
তোদের মতো বাটপারি করি না শালা!
শ্যামাপদ মাহাতর কবিতা
১.
ফলারী কালিন্দী এক শিল্পীর নাম
ফলারী কালিন্দী এক শিল্পীর নাম
ফলারী কালিন্দী বরণ ডালা বোনে, কুলা বোনে, বোনে ঝুড়িও।
সানাইও বাজায় ছৌ নাচের আসরে।
তার কাছে কোন মাইক্রোফোন নেই ,
তার মুখেই মাইক।
জীবন দিয়ে ফুঁকলে বের হয় সুর
রিঝের সুর
নাচের সুর।
এদের জীবনে লকডাউন এক বজ্রাঘাত।
সানাই ফুঁকতে দম চাই ,রিঝও চাই।
পেট শুকোলে রিঝ তো শুকোবেই।
মরা পেটে তবু সানাই বাজে।
সকালে সাঁঝে।
বাজে ঝুমুরের সুর।
বেদনার সুর।
২.
ঝুমুরিয়াও এক শিল্পী
মানভূমে ঝুমুরিয়ার সুর বাজে গলায়
সুরে সুরে নাচাতে হয় ছৌ।
সুরের তালেই তো পৃথিবী নাচে।
সময়ের তালে তালে সবাইকেই নাচতে হয়।
ঠিক সময়েরই মতো।
আজ আসর নাই
কাজ কামও নাই
ঝুমুরিয়ার মুখেও মুখোশ
কে শোনাবে সুর?
পল্লব গোস্বামীর এক গুচ্ছ কবিতা
১.
জঙ্গলের আগুন
=============
যেভাবে জঙ্গলে আগুন ছড়ায়
সেভাবে আমাদের ভালবাসা ছড়ানোর
কথা ছিল |
কাঠবাদাম রঙের,বুড়ো খরগোশটাও জানত -
বনভৈরবীর থানে
বেলি ও বীজীবেগুনের কথা !
অথচ,দেখতে দেখতে
নীলাম্বরীর নীল আঁচল
পুড়িয়ে নিল, পেখম মেলা রোদ্দুর -
আমরা কেউ বুঝিনি,
জঙ্গলের আগুন নেভাতে -
আরও আগুন কীভাবে লাগায় !
২.
গন্ধ
===
একটিমাত্র গন্ধে বিভোর হয়ে যাই বারবার |
যারা ভেবেছিল , তোমাকে খুন করার পর ,
গুম করার পর , কুচি কুচি করে কেটে -কুকুরকে খাওয়ানোর পর ;
সবকিছু মিটে যাবে
তারাও আজ উদ্ভিদের মতো নীরব ...
তল্লাটে তলা নেই;তবু গাঁ-ভর্তি উস্কোখুস্কো চুল
হাঁ-মুখ বালিশের নীচে,ওরা রেখে গেছে
সবুজ অন্ধকার ...
পাহাড়ের গায়ে নদী |নদীর ধারে কঙ্কালের গাছ |
ওই ডালে,
চষা মাটির গন্ধে
ভোর এসে বসেছিল
গতকাল...
৩.
ম্যাজিক
=======
প্রতিটা হারানোর গল্পে একটা ম্যাজিক থাকে
আর থাকে , একটা ছেলে
একটা মেয়ে
ছেলেটা, বেলুন থেকে পায়রা বার করে
উড়িয়ে দেয় আকাশে
মেয়েটাও ,রুমাল নাড়িয়ে হাওয়ায়
চিনিয়ে দেয় প্রকৃত বেড়াল |
তারপর,
মঞ্চের সব আলো নিভে গেলে
তারা দুজনেই স্মৃতির জরি কুড়ায়
বাকি থাকেন রিংমাস্টার...
রাত গভীর হলে
তিনিও কোথাও
খিদের শিল্পের এঁকে,
ভুডুর পুতুল পোড়াতে যান ...
৪.
পিতামহ
=======
কপালে হাত বোলানোর মতো করে
টিন ভাঙা , লোহা ভাঙা ডেকে
ভাঙাচোরা-ওয়ালা চলে যাচ্ছে
রিন্রিন্ হাওয়ায় তার সাইকেল থেকে
ঝরে পড়ছে শিউলী ফুল
দূরে,বৌ-বসান্তি খেলা ভেঙে
ছেলেরা ছুটছে
মিছরিবাইদ ভেঙে জেগে উঠছে
কুলকুঁড়ো -মাসি
বাতিল জিনিস সবাই বদলে নিচ্ছে
যে যার মতো
শুধু,তোমার সাকিন আগলে
আমি বৃদ্ধ পিতামহ হয়ে উঠছি
নিজের চোখেই
৫ .
দূরত্ব
====
এক আকাশের নীচে শুয়ে আছি আমরা
দূরে মেঘহাতিদের দল হেঁটে যাচ্ছে
ঝুনঝুনি ফুলে ঢেকে গেছে পথ
একটু পরেই , বৃষ্টি নামলে
সমস্ত জঙ্গল ফুঁড়ে
পাখিরা ফিরবে বাসায়
এক আকাশের নীচে
পাশাপাশি রেললাইনের মতো আমরা
বাসায় ফিরবার কোনো তাড়া নেই ,
দুজন দুজনকে ছুঁয়েও দেখবোনা কোনোদিন ...
কুশল সংবাদ
পর্ণা দাশগুপ্ত মিত্র
একটা একটা করে পাল্লা খুলে যায়
আমি ভেতরে ঢুকি।
হাসিমুখ আমাকে অভ্যর্থনা জানায়।
আমাকে চমকে দেয় চেনা গানের সুর।
ছোট্ট ছেলেটা আচমকা জড়িয়ে ধরে আমাকে।
আবার মা হতে ইচ্ছে করে আমার।
শুনুন রাজামশাই
সুমন বন্দ্যোপাধ্যায়
আমরা যারা বেঁচে আছি
বেঁচে থাকার অজুহাতে
আড়াল থেকে মারছ তুমি
গোপন তোমার অস্ত্রাঘাতে
রাজা তোর ফুলবাগিচায়
ভুল ফুটেছে ঝাঁকে ঝাঁকে
মরা শরীর আটকে আছে
ভরা নদীর বাঁকে বাঁকে
সারি সারি জ্বলছে চিতা
কাঁপছে দূরে কাফন মাটি
ধর্ম দিয়ে ভুলিয়ে দিলি
কী কৌশলে পরিপাটি!
মুখে মুখে মুখোশ আঁটা
আসল মুখ চেনা ভার,
কার ঘরেতে নিভল উনান
কার চোখেতে অশ্রুভার?
জাত চাই না আমরা রাজা
ক্ষুধার পেটে ভাত দে,
হাঁটছে যারা শোকের মিছিল
চোখের জলে সাথ দে।
আমরা যারা রোজ মরছি
বেঁচে থাকার এই অছিলায়,
পথেই হবে আবার দেখা
নামবি যেদিন পথের ধূলায়।
এক অন্য পরিবার
বিউটি সান্যাল
চৈত্রের প্রায় শেষ, গিয়েছিলাম শহরের বাইরে। ফিরতি পথে ট্রেন থেকে নেমে চড়া রোদে চেপে বসলাম এক সাইকেল রিক্সোতে। গলদঘর্ম হয়ে চলেছি বাড়ির দিকে। রিক্সোর যে চালক সে প্রায় পয়সট্টি বছরের বৃদ্ধ। রিক্সো চালাতে তাকে জোরে জোরে শ্বাস নিতে হচ্ছে। সেই শ্বাসের শব্দ আমার কান অবধি পৌঁছে গেলো। আমি বললাম এতো বয়স হোলো চাচা এখনো রিক্সো চালাও কেনো,কত কষ্ট হচ্ছে বলো তো। সে শুনে বললো কি করবো দিদিমনি অনেক বড় সংসার। পেটের লগে রিক্সো চালাই। সাধ পুরনের লগে রিক্সো চালাই। আমি বললাম, অনেক বড় সংসার? সে বললো, হ্যাঁ গো। এই তো এখান থেকে চার কিলোমিটার পথ পেরোলেই আমার ঘর। দু'বিঘে জমির উপর দশদিকে দশখানা কলম দিয়ে বানিয়েছি। আমি শুনে একটু অবাক হলাম। সে বললো যাবে নাকি গো?আমিও কৌতূহল নিবারনের জন্য বললাম চলো তো দেখি চল্লিশ কাঠা জায়গার উপর তোমার কত বড় ঘর। চাচা নিয়ে গেলো তার পরিবার দেখাতে। পৌঁছলাম যখন তখন প্রায় বিকেল হয় হয়। গিয়ে দেখলাম আর পাঁচটা পরিবারের থেকে চাচার পরিবার একটু অন্যরকম। কি নেই তার পরিবারে সেগুন, শিরিষ, শিশু, মেহগনি, অশ্বথ, পিয়াল। আর ঐ যে বলেছিলো দশ দিকে দশটা পোক্ত কলম, চেয়ে দেখলাম শিড়দাঁড়া সোজা করে দন্ডায়মান হয়ে রয়েছে সুউচ্চ দশটি শাল গাছ। মাঝখানে রয়েছে ছাতার মতো একটা বটবৃক্ষ। আর সেই বটবৃক্ষে আশ্রয় নিয়েছে কত পাখি। চাচা বললো ঐ দ্যাখো ঈষান কোনের দিকটা বড়লোকবাবুদের অ্যাসিয়ানপেন্টস্ দিয়ে কেমন লাল রং করেছি। আমি পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখি অশোক শিমুল পলাশ কৃষ্ণচূড়া একেবারে রাঙিয়ে দিয়েছে। চাচাকে দেখলাম একটা মাটির কলসি করে পরপর চারটে গাছে জল ঢাললো। আমার দিকে তাকিয়ে বললো জানো দিদিমনি এই চারজন আমার খুব আদরের। এদের নাম কি জানো, এদের নাম হলো মহুল। দেখলাম চাচার মহুল চারা গুলি বেশ ডাগর হয়েছে। আমি বললাম, শুনেছি, মহুল নাকি তিন পুরুষের বৃক্ষ? চাচা হাসলো। আমি অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম। চাচা বললো, আজ চল্লিশ বছর ধরে এদেরকে নিয়ে আমার সংসার। এরা আমার পাঁজর। এরা আমার সন্তান। আর এদের জন্যই এতো পরিশ্রম। আমি ভাবলাম, যে কয়েক লক্ষ টাকার মালিক হতে পারতো যে সে কিনা রিক্সা চালায়। আর এটাও ভাবলাম, কোনো বাপই চায় না তার সন্তান বিক্রি করতে। আমি বললাম, চাচা তুমি একা এই বনজসম্পদ তৈরি করেছো? চাচা হাসলো আর গুনগুন করে গাইতে লাগলো "যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলোরে"। আর আমি প্রান ভরে ছাতি প্রসারিত করে দু' চোখ বুজে দুবাহু মেলে টেনে নিতে থাকলাম অক্সিজেন অক্সিজেন আর অক্সিজেন।....
রোহিনীর দিন বিচপুহ্ণা
তপন পাত্র
আজ ৯ জ্যৈষ্ঠ । তিনদিন পর ১৩ জ্যৈষ্ঠ । রোহিন পরব : বিচপুহ্ণা ।
রোহিন পরব কী ? পুরুলিয়া তথা মানভূম তথা পশ্চিম সীমান্ত বাংলার এক কৃষি মহোৎসব ।
"রোহিনী" থেকে "রোহিন" । কে রোহিনী ? সহজ উত্তর --দক্ষ প্রজাপতির কন্যা , সোমদেবের স্ত্রী , বলভদ্রের জননী ।
বলভদ্র মানে হলধর,বলরাম । ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বড়ো ভাই ।
ভারতীয় লোকবিশ্বাস হলধর কৃষির দেবতা । হল ধারণ করেন যিনি , তিনিই তো হলধর । এই হলধরের জননী , নক্ষত্ররাণী রোহিনী আজ পৃথিবীর সবথেকে সন্নিকটে বিরাজ করেন । তাই আজ বীজ ব্যপন করলে আমনের ফসল হবে ভালো , সীমান্ত বঙ্গবাসী এই ধারণা মনেপ্রাণে লালন করে আজও ।
এমনিতেই তো পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম সীমান্ত বাংলায় প্রবাদ আছে "চাষ নাই বাস টুরুই ব্যাঙের আশ" । একটানা কয়েকদিন বৃষ্টি ঝরতে থাকে যদি , তবে 'টুরুই' ডাকে । তবে এখানে চাষ । মেঘের প্রসন্ন দাক্ষিণ্যই আজও এখানে কৃষিকাজে অগতির গতি । কত কিছু এলো গেলো , কত নব নব ইতিহাস রচিত হলো , কিন্তু এই এলাকার কৃষির উত্তরণের স্বার্থে ছিটেফোঁটাও বন্দোবস্ত হল না আজও । অগত্যা প্রকৃতির প্রফুল্ল দাক্ষিণ্যের উপর নির্ভর করে ,
বহু আশায় বুক বেঁধে কৃষক ও কৃষি শ্রমিক আজ নির্দিষ্ট কোনো ক্ষেতের কোনে পূর্ব-প্রস্তুত মাটিতে প্রতীকী বীজ বোনে । আঞ্চলিক ভাষায় এর নাম "বিচপুহ্ণা" ।
তবে এই বিচপুহ্ণার দিন সেই সমস্ত কৃষকেরা আর প্রতীকী বীজ ব্যপন করেন না , যাঁরা রোহিনীর কয়েক দিন আগেই "অক্ষয় তৃতীয়া" তিথিতে এই কর্ম সম্পাদন করে থাকেন । অক্ষয় তৃতীয়ার দিনটিও এই অঞ্চলের কৃষিজীবী মানুষের জীবনে একটি পবিত্র দিন । এদিন অনেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে আমন ধান চাষের শুভ সূচনা করেন "বিচপুহ্ণা"র মধ্য দিয়ে । মানভূমবাসীর ধারণা বা লৌকিক বিশ্বাস , এই শুভদিনে কৃষিকর্ম আরম্ভ করলে ফসলের ক্ষয়ক্ষতি হবে না , ফসল অক্ষত থাকবে । "অক্ষয়" শব্দটির আভিধানিক অর্থ "যার ক্ষয় নাই" । বৈদিক বিশ্বাস অনুসারেও এই তিথিতে কোন শুভ কাজ আরম্ভ করলে তা অক্ষয় হয় , অক্ষত থাকে । ধরিত্রী মাতা কে ঊর্বরা , বসুন্ধরাকে সুজলা-সুফলা শস্য-শ্যামলা করার জন্য ভগীরথ এই দিনে স্বর্গ থেকে গঙ্গাকে মর্ত্যে নিয়ে এসেছিলেন বলেই ধারণা ।
প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য মানভূম তথা সমগ্র পশ্চিম সীমান্ত বাংলায় একদা কৃষি নববর্ষের শুরু হতো পয়লা মাঘ । এই অঞ্চলের আদিবাসী সাঁওতাল সমাজে মাঘ মাস এখনো নববর্ষের প্রথম মাস । অসাঁওতাল কৃষিনির্ভর সভ্যতায় সময়ের সাথে সাথে নববর্ষের প্রথম মাস মাঘ মাস থেকে বৈশাখে পরিবর্তিত হয়েছে । কিন্তু এখনও এখানে কৃষি জীবনযাপনের ক্ষেত্রে বেশ কিছু নিয়ম কানুন পয়লা মাঘকেই কৃষি নববর্ষের সূচনা মস ব'লে ইঙ্গিত করে । যেমন এই দিন চাষী তার কোনো নির্দিষ্ট জমিতে "আড়াই পাক" লাঙ্গল চালিয়ে বৎসরের প্রথম হালচালন অনুষ্ঠানটি সম্পন্ন করে । তুলনামূলকভাবে সম্ভ্রান্ত কৃষকের কৃষিকাজের সহযোগী মানব সম্পদ কামিন , মুনিষ , বাগাল ভে"তার বাৎসরিক স্থায়ী কর্ম সম্পাদনের শেষদিন পৌষ সংক্রান্তি আর পুনর্বহালের সূচনা দিন পয়লা মাঘ । কাজেই শুধুমাত্র রোহিণীর দিন নয় , অক্ষয় তৃতীয়া এবং পয়লা মাঘ অর্থাৎ "আখিয়ান যাত্রা" বা "আ'খান যাত্রা"র দিনটিও কৃষি কর্মের সূচনা সংস্কারের সঙ্গে যুক্ত ।
যাইহোক রোহিণীর দিন ঘর-সংসারের মহিলারা সকাল সকাল নিজেদের উঠোনে গোবরের ছঁচ দেয় , খড়িমাটির আলপনা আঁকে । একটু বেলার দিকে , কোনো কোনো এলাকায় বিকেলের দিকে একটি নির্দিষ্ট চাষজমি থেকে কৃষাণী নিজে অথবা বাড়ির "কামিন বউ" ন'বার বাঁশের ঠে'কাঝুড়িতে করে মাটি এনে রাখে গৃহের তুলসী মঞ্চের পাশে কিংবা গোয়াল ঘরে গরুর দনের কাছে । এর নাম "রোহিন মাটি" । যে মাটি আনে তার স্নানের জন্য থাকে ঝাঁঝালো সর্ষের তেল, সুগন্ধি সাবান আর কেশ প্রসাধনের জন্য ফুলাম তেল ; আয়েশ ক'রে খাবার জন্য মহুল ফুলের পাগ আর আতপ চালের গুঁড়ি দিয়ে তৈরি সরু চকলি পিঠে ও মিঠে পায়েশের ব্যবস্থা ।
তারপর আমনের চারা ফেলার কাজ চলতে থাকে । ধানের ঝুড়িতে বা বস্তায় অল্প রোহিন মাটি সহ বীজ যায় মাঠে। বিশ্বাস তাহলে রোগপোকার তাণ্ডব আসবে না ।
এ দিন প্রত্যুষে ঘরের চারদিকে গোবরের রেখা টানে মেয়েরা । রাবণ আড়ালের লক্ষণ রেখার মতো সরীসৃপ ঠেকানোর রোহিণীরেখা । নিয়ম করে খাওয়া হয় "রোহিনী ফল" । অন্য নাম "আষা'ঢ়া ফল" বা "কে'লাকটরা" । সবুজবর্ণা অতীব তেঁতো স্বাদের ফল । মানুষের বিশ্বাস এটি সাপে কাটা রোগীর এবং চর্ম রোগের প্রতিরোধক আয়ুর্বেদ । এমনকি হঠাৎ কাটাছেঁড়া হলে মানুষ রোহিন মাটি গুঁড়ো করেই ক্ষতস্থানে লাগাতো একদিন , এখনো দিব্যি লাগিয়ে থাকে কেউ কেউ । তাইতো মহর্ষি সুশ্রুত এবং আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের পরিভাষায় 'রোহিণী ' মানে 'নিরাময় কারী', 'রোহিণী ' মানে 'ত্বকীয় উপসর্গের নিরাময়'।
আবার "রোহিণীদান" বলেও একটি শব্দবন্ধ আছে। আছে "গৌরীদান" । "কন্যাদান" । "অষ্টম বর্ষ ভবেৎ গৌরী, নববর্ষাতু রোহিণী "। আট বছরের মেয়েকে পাত্রস্থ করার রীতি "গৌরীদান" । নয় বছরে বালিকার বিবাহ দান "রোহিনীদান" । আর দশ থেকে বারো হলে "কন্যাদান" । গৌরীদানে পিতা-মাতার স্বর্গলোক বাস । রোহিনী দানে বৈকুণ্ঠ লাভ । আর কন্যাদান উৎকৃষ্টতম । এতে ব্রহ্মলোক প্রাপ্তি ।
আমাদের যাবতীয় কৃষি সংস্কারের সাথে উৎপাদন
ধারণার নিবিড় সংযোগ । এদেশে কুমারীরা ৮-৯ থেকে ১২ বছরের মধ্যে রজস্বলা হয় । ধীরে ধীরে রতিসুখাকাঙ্ক্ষা জাগে । যার পবিত্র দিকটি হল সৃজন , সৃষ্টি । মেয়েরা বারো মাসে তেরো বার ঋতুমতী হয় । সম্ভবত সেখান থেকেই উঠে এসেছে "বারো মাসে তেরো পরব "-এর মত জীবন্ত প্রবাদ । উৎপাদন জীবনের শ্রেষ্ঠ মহোৎসব ।
এই রোহিনী মহোৎসবের দিন গ্রামীণ ছেলেছোকরারা রং মেখে সং সাজে । ঢাক ঢোল মাদল কাড়া-নাকড়া বাজিয়ে ছড়া কেটে গান গেয়ে নেচে বেড়ায় গ্রামে গঞ্জে পাড়ায় পাড়ায় । অনেকেই ব্যাখ্যা করে থাকেন এটাই নাকি পুরুলিয়ার ছো নাচের আদি উৎস । সে যাই হোক, এই গানগুলির সাথে কোথা থেকে যেন ভেসে এসে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় কৃষিপ্রেমিক রবি ঠাকুরের সৃজন সংগীত --"আমরা চাষ করি আনন্দে..."
-----------------------------------
সম্পাদক : উত্তম মাহাত
সহায়তা : অনিকেতের বন্ধুরা
রোহিণীর ছবি : তপন পাত্র
যোগাযোগ : হোয়াটসঅ্যাপ - ৯৯৩২৫০৫৭৮০
ইমেইল - uttamklp@gmail.com







ভালো লাগলো
উত্তরমুছুন