দীপংকর রায়ের গুচ্ছ কবিতা
দীপংকর রায়ের গুচ্ছ কবিতা
১.
কার ডাকের অপেক্ষায় অস্থির কে?
কার জিজ্ঞাসা জুড়ে ভারি হয়ে আছে ঘরের বাতাস?
কার অপেক্ষায় অস্থির তাকাচ্ছে মেঘ-বৃষ্টি-রোদ।
একটা প্রশ্নেরও ঠিকঠাক উত্তর নেই।
সমস্ত দিন টেবিলের উপর পড়ে আছে ফোনটা।
বালিয়ারী জুড়ে আছড়ে পড়ছে কতো নোনাজল!
দিগন্ত থেকে দিগন্ত ছাড়িয়ে যত দূর চোখ যায়
ঢেউ আর ঢেউ ....
জলেরা কথা বলছে জলের সঙ্গে।
ভাবছি, আরো কত সমুদ্র-চিৎকার ----
এক একটা দিন জীবনকে নিয়ে জীবন এমনই অস্থির
এক একটা দিন এমনই স্মরণীয়
নিতান্ত সম্পর্ককেও যখন মনে হয় কত প্রয়োজনীয়,
সকল নুতনই পুরাতনকে হারায়
তাই বলে হারাবে কেন পরম্পরার স্মৃতি?
সকল আপন , তোমার স্বজন ব্যথায় , একবারের জন্যেও উঠবে না কেন ডুকরে ----?
মানুষ তো মানুষেরই মুখের ভেতর মানুষকে গড়ে ----
মানুষের দুঃখ - সুখে একই মানুষ সকল অপরিচয়কে পরিচয় করতেই তো যত সব মাঙ্গলিকতা---?
আমার বিরহে তোমার বিরহ নাই হোক
আমার কান্নায় তুমি নাই পারো কানতে
তাই বলে সকল অপেক্ষার
বার্তা , তোমার অনুভবে পৌঁছয় না কেন?
আকাশ একটাই, মেঘ বৃষ্টি রোদে
তোমার মনের ঘরে একই হাওয়া-বাতাসের ঢেউ,
কার ডাক শোনার অপেক্ষায় উৎকর্ণ কে?
কার কুশল জিজ্ঞাসার অপেক্ষায় একবারও তাকায়নি কে বাইরের রোদে?
ঘরের টেবিলটাই জানে, তার বুকের উপর সমস্তদিন পড়ে আছে কেন একটি নিঃসঙ্গ রিসিভার --
---------------------
২.
চুপচাপ অন্ধকারে তাকিয়ে থাকি , হারানো জোনাকিদের ভিড়ে।
কতকাল আগের সেসব
পাখা মেলতে মেলতে কত দূরে যায়, কত দূর থেকে আসে..... ?
তাদেরই গল্পে মজে থাকি ,
তাদেরই ডানায় ভাঙতে ভাঙতে কত পথ যে ডিঙ্গোই ----
তুমি সে পথের কোনো গানই শোনোনি বলে
অমন আলোর দিকে চেয়ে চাঁদের কথা ভাবছ ?
----------------------
৩.
আমাদের বয়েসের হিসাব আমরাই রাখিনি ।
দিন-রাতের বয়সেরা পাতেনি হাত?
জীবন , নবযৌবনের দীপ্তি
দেখিয়েছে খালি !
সে আর আমি মাঠ ভাঙি তাই।
কত নক্ষত্রের সাথে সাথে যে চলি,
আমাদের বাসনারা জন্ম-জন্মান্তরের নতুন হৃদয়ের অপেক্ষায় কত কাহিনী-কথায় বুকের ভেতর স্তম্ভিত কারুকার্য এক ;
কাঞ্চনপুর , কাঞ্চননগরের বাসিন্দা হয়েছে যে,
পল্লীকথাদের পাঠিয়ে দিয়েছে কত চিরকালীন ঠাকুমাদের কোল ;
আমিও সেই কোলের উপর মাথা রেখে ঘুমে যেতে চাই, মধ্যদুপুরের ঘুঘু ডাক নিস্তব্ধতায় ----
প্রাচীন কড়িবরগারা বাড়িয়ে দেয় হাত,
দু'জনের দুচোখে বাঁধা পড়ে, নিচু আকাশের শস্য-ভরা মাঠেরা ?
ভরা আকাশের এত হাসি
আমাদের নৌকোয় ছলাতছল জলাশয় ;
জীবন চলেছে যেন জীবনের শত গানে
আমাদের বয়েসের হিসাব নেই। ভালোবাসার সাল-তারিখ আছে কী?
আছে যে কান্না
তাই কি প্রকৃত শান্তি?
ক'জন আর নিতে পারে বলো !
----------------------
৪.
চালতা-সুপুরির বনে চলো যাই।
মিষ্টি আমড়ারা হলুদ পাতায় বাতাস পেয়ে ডাকছে , বিলিতি গাবগাছের অন্ধকার বনের সেই পথটি কতটা পাল্টে গেছে---
ছোট -পুকুরের মাছেরা বড়ো-পুকুরে সাঁতরে বেড়ালো কত ;
মাঠ ভরতি ধান গাছে বাতাসের কথা, চাড়া পাট গাছে বুক ভরতি গান পেল
নিড়ানিরা..?
উঠোনে বৃষ্টি নামবে কিছুক্ষণ পরে,
আমতলার কাঁচা আমেরা ঝড়-বৃষ্টি-জলে কতক্ষণ যেন হাঁ হয়ে পড়ে ছিল ;
চলো যাই সেই আঁকাবাঁকা বাতাসে কিশোর-বেলাটি খুঁজি...
চালতা-সুপুরির বাগানের গন্ধে, ভরে ওঠে আজ আমাদের এই নির্বাসিত জীবন ;
মিষ্টি-তেতুলের ঝাঁকড়া গাছটা, এত ছায়া দেয়
কত মুখের হাসি ;
কিছুতেই ভুলতে পারি না সেই জীবনটা ছিল কাদের?
আমরা কি বিগত জন্মের কথা ভাবছি?
নাকি, সেই জন্মই ছিল প্রকৃত জন্ম আমাদের-- ?
---------------------
৫.
কিছুক্ষণ পথে পথে ঘুরলাম
মুঠো ভর্তি আবীর লুকোনো থাকলো।
আবীর আর ছাই হুটোপাটি করতে করতে
এ ওর ভাব বিনিময় করে চলে গেল।
চেয়ে চেয়ে দেখলাম বাতাসের ভেতর কারো মন পুড়ে ওঠা উদ্ভ্রান্ত চুলের ছায়ারা দৌড়চ্ছে শুধু.....
কে তুমি, দুহাত ঘুরিয়ে বিবর্ণ আকাশ ছুঁড়ে ফেললে আমার পায়ের কাছে ?
ধুলোয় ধুলোক্কার ।
রাস্তা পার হয়ে যেতে যেতে অবুঝ কয়েকটি শিশুমুখে ঠোঁট ফুলিয়ে, কানতে কানতে বাড়িয়ে দিলে হাত ;
কোথায় যে বসন্ত , আস্তে আস্তে ঝরিয়ে ফেলছে শিমুল-পলাশ .....
আমি কি দেখতে পাচ্ছি!
----------------------
৬.
মাধবীলতারা কথা বলা শুরু করেছে বাতাসে।
ওপাশে কলাবতী ফুলেরাও দুলছে হাওয়ায়।
কত দূরে কোলে করে বসে আছে সে, কত না ঝরা শিমুল-পলাশ ...!
একটু একটু গোছগাছ চলছে,
কে যেন বলছে, ফুরিয়ে এল সন্ধ্যার ঝুমুর, রাতের মহুল , তুমি আসবে না, রাখবে না খোঁপাতে হাত-?
ভাঙা পথ, ভাঙতে ভাঙতে এই রাত
চাঁদকে ঠোঁটে করে উড়ে যাচ্ছে দেখি একটি প্যাঁচা -
একটি হাঁ-এর ভেতর আতঙ্কিত মুখের সারিরা ;
আমরাও আমাদের ছায়ায় হারিয়ে ভাবছি, তবে কি আবার দূরে সরে যাবার পালা---?
------------------------
কবি দীপংকর রায়ের সদ্য প্রকাশিত বই
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন