দ্বিতীয় বর্ষ ।। ষড়োশ ওয়েব সংস্করণ ।। ৫ অগ্ৰহায়ণ ১৪২৮ ।। ২২ নভেম্বর ২০২১




গত শুক্রবার অর্থাৎ ১৯/১১/২০২১ তারিখ জাতীর উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বলেন, " হয়তো আমাদের তপস্যায় কিছু ভুল ছিল। যে কারণে আমরা কৃষকদেরকে আমাদের নিয়ে আসা এই আইন সম্পর্কে বোঝাতে পারিনি। তবে আজ কাউকে দোষারোপ করার সময় নয়। আজ আমি দেশকে বলতে চাই যে আমরা তিনটি কৃষি আইন বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।"
তিন কৃষি বিলে সংশোধন এনে ২০২০-তে যে আইন পাশ করে সরকার। তার বিরুদ্ধে দিল্লি, পাঞ্জাব, হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থানে তুমুল প্রতিবাদ-বিক্ষোভ শুরু হয়। এবং সমস্তকিছু সরকারি দমন পীড়ন উপেক্ষা করে, তাদের কূটনৈতিক চালকে ভেস্তে দিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যান। যার কাছে পরাস্ত হয়ে শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণা আরো একবার প্রমাণ করে, "সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই।" মানুষের সমবেত সুষ্ঠু আন্দোলনের কাছে কোনো শক্তিই শেষ পর্যন্ত টেকে না; সে যত শক্তিশালীই হোক না কেন।
                এই আইন বাতিল করার কথা ঘোষণার পর কৃষকদের মধ্যে উচ্ছ্বাস ধরা পড়ে। শুরু হয় মিষ্টি ও লাড্ডু বিতরণ।  
                ফারমার্স প্রোডিউস ট্রেড অ্যান্ড কমার্স (প্রোমোশন অ্যান্ড ফেসিলিটেশন) অ্যাক্ট, ২০২০ (The Farmers’ Produce Trade and Commerce (Promotion and Facilitation) Bill, 2020), ফারমার্স (এমপাওয়ারমেন্ট অ্যান্ড প্রটেকশন) এগ্রিমেন্ট অব প্রাইস অ্যাসিওরান্স অ্যান্ড ফার্ম সার্ভিসেস অ্যাক্ট, ২০২০ (Farmers (Empowerment & Protection) Agreement of Price Assurance & Farm Services Bill), এসেনশিয়াল কমোডিটিজ (সংশোধিত) বা অত্যাবশ্যক পণ্য আইন (The Essential Commodities (Amendment) Bill, 2020)। এগুলোই হলো পাশ করিয়ে নেওয়া সেই সব আইন যার জন্য মরণপণ আন্দোলন কৃষকদের।          
                  সরকারের দাবি ছিল, এই কৃষি আইনে বড় ব্যবসায়ীদের মনোপলি বন্ধ হবে। মান্ডির বাইরেও কৃষকরা যেখানে খুশি এবং যাকে খুশি শস্য বিক্রি করতে পারবেন। কৃষকরা বাজারের সর্বোচ্চ মূল্য পাবেন। 
                 এই আইনে আন্তঃরাজ্য বাণিজ্যের উপরেও জোর দেওয়া হয়। পরিবহন খরচ কমানোর প্রস্তাবও দেওয়া হয়। সর্বোপরি বিলের উদ্দেশ্য ছিল কৃষকদের কৃষি-বাণিজ্য সংস্থা এবং খুচরো পরিষেবার সংযুক্তিকরণ করা।
                  কৃষকদের অভিযোগ, এই আইন লাগু করে সরকার ধীরে ধীরে ন্যূনতম সহায়তা মূল্যে (MSP) বাজার থেকে ফসল কেনা বন্ধ করে দেবে। ফলে বাজার থেকে সরকারি নিয়ন্ত্রণ সরে যাবে। তখন কৃষকদের পুঁজিপতিদের মুখের দিকে চেয়ে থাকতে হবে। আর বড়ো খুচরো ব্যবসায়ীরা কৃষকদের উপরে আধিপত্য বিস্তার করবে। কৃষকদের আতঙ্ক, সংস্থাগুলি কৃষি পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করা শুরু করবে তখন। তাই একাধারে প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণায় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন কৃষকরা আর অন্যদিকে নমো সরকার, যে কিনা ভারতবর্ষের ইতিহাস পাল্টে দেওয়ার মতো আস্ফালন দেখায়, সে নৈতিক হার স্বীকার করে কৃষক আন্দোলনের কাছে। এবার দেখার, এই আন্দোলনের কারণে যাঁদের উপর মামলা করা হয়েছে তাঁদের মামলা তুলে নেওয়া হয় কিনা এবং এই আন্দোলনের কারণে ক্ষতিগ্ৰস্থদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যবস্থা করে কিনা নমো সরকার।



উত্তম মাহাত, সম্পাদক


______________________________________________
এই সংস্করণে যাঁরা লিখছেন
______________________________________________

অরণি বসু / কৌশিক চক্রবর্তী / দেবাশিস সাহা / অয়ন জোয়ারদার / চঞ্চল দুবে /   দেবশ্রী রায় / সন্দীপ বাউরী / সুজন পণ্ডা / সায়ন্তন ধর /  উমা মাহাতো / তপন পাত্র / দীপংকর রায়
______________________________________________




বন্ধু তোর লাইগ্যা রে

অরণি বসু


ক্ষণভঙ্গুর পেয়ালা পিরিচ থেকে ধোঁয়া ওড়ে,
দিনান্তের বাঁশি বাজাতে বাজাতে আবহমানের সূর্য
                                                 ঢলে পড়ে পশ্চিমে।
হঠাৎ হঠাৎ কোলাহল জেগে ওঠে, হঠাৎ হঠাৎ নিভে যায়। 
বলা নেই, কওয়া নেই পাশ থেকে আচমকাই
                                    হারিয়ে যায় প্রিয় মানুষজন। 
আমি চিৎকার করে ডাকি, বুদ্ধদা! বুদ্ধদা!                      
                                         পার্থ! পার্থ!
                                         নিলীম! নিলীম!
                              ডাকি, বলাইদা! বলাইদা!
কেউ সাড়া দেয় না, শুধু নিরুদ্দিষ্টের গায়ের গন্ধ ভেসে আসে 
আর হিমশীতল হাসি 
আর পাতা ঝরার শব্দ।
দূর দূরান্তের ট্রেন আরও দূরে চলে যায় বিরহী হুইশল বাজিয়ে --- 
লাল নীল আলো জ্বলে ওঠে,
                                    বেজে ওঠে যাত্রার কনসার্ট। 
খোলা পেন পড়ে আছে, পড়ে আছে খোলা খাতা, পুরনো সিলিং ফ্যানের হাওয়ায় ওলটপালট খাচ্ছে         
                                               বইয়ের খোলা পাতা।

চলেই যদি যাবে বন্ধু তবে ফিরে এলে কেন?

ক্ষণভঙ্গুর পেয়ালা পিরিচ থেকে আজও ধোঁয়া ওড়ে,
আজও বন্ধুর অপেক্ষায় সব দরোজা জানালা হাট করে খুলে রাখি।





কৌশিক চক্রবর্তীর কবিতা
 
১.
শুকতারা রাস্তায়


আমরা যে জানলার কাছে থাকি
পর্দা ওড়ে হাওয়ায়
পরে থাকি বাজনার পোশাক
 হাওয়া লেগে বৃষ্টির জন্মদিন হয়
 
মনকেমনের বেড়াল… আদুরে আদুরে
 চেয়ে থাকে
একমনে শুকতারা লেখে
 
হেলান দিলেও জানো দেখা যায়
 
গলে পড়ে রাতের গল্প জলের কিনারে
তারপর রূপ হয়। রূপকথার আঙুল ছবি আঁকে নতুনের দেখা
 
একটা ক্যানভাসের সাদা ভরে ওঠে ঘুমভাঙা নামে

ওই গান তখন
বুলিয়ে যাই তারায় তারায়



২.
চাঁদের চোখে


এই দিন এই দিল ভরে আসা
গা ধুতে আসা নাচ
ঝিলের জলে মুখ দেখে ঝিলমিল হয়
বনের সাঁই বনের সুহানা সফর কেমন ছায়াছায়ায় যে ফিরে আসে
মনছুঁয়ে যাওয়ার পকেটে

ফেরার বৃত্ত মাঝে মাঝে হাত ধরে তার 
কী কথায় কেমন করে যে হাসো তুমি জান
তোমার গল্পের থেকে তন্দ্রা নুইয়ে পড়ে
রংপেন্সিলের উঁকিঝুঁকি লেগে

মন চায়... চাঁদ এঁকে রাখি





দেবাশিস সাহার কবিতা

১.
অক্ষরবেদীমূলে


ভোরের রোদ 
অক্ষরবেদীমূলে যেন ধ্যানমগ্ন বাল্মীকি 

এই যে শব্দ খেলা এ তো মুহূর্তরতি
ছাড়া কিছু নয় 

 আহ্লাদ তবু তোমার 
 নিঃস্ব আঙুলে ডিঙোবে
 তিন ভুবনের চর

 তাই কখনো হয় 
জলছায়ারা কাঁদবে না?
ফেটে চৌচির হবে না শিরায় জমানো নদী?

ভোরের রোদ
অক্ষরবেদীমূলে ধ্যানমগ্ন বাল্মীকি
আর একবার 
প্রণাম করি।



২.
ভিজে গামছাটাতে


এক একটা দিন
ভিজে গামছাটা তেও এত কবিতা লেগে থাকে 
নিংড়াতে ইচ্ছে করে না

সারা ঘরে শব্দের এত ছড়াছড়ি
যেসব পাখিরা অস্ত গ্যাছে  
তারাও শিস দিয়ে ওঠে

এক একটা দিন
কী স্নিগ্ধ রোদ্দুরে ভরে ওঠে
পাঁজর ফুসফুস





ভিতের মধ্যে খেলা

অয়ন জোয়ারদার


স্থাপত্য বলতে আমি বুঝি ভিত,
আমাদের ছোটবেলার ভিত
       সেখানে কি খেলা হতো!!
আর কোঠা বাড়ি বলতে সিঁড়ি বুঝি আমি;
প্রথমে আনত করে গড়ে একটু একটু করে তোলা ধাপ।
এইসব ভিত, সিঁড়ি, কাঠ আসলে সরল গণিত - ছোটবেলা তৈরি করে।
একটা খেলার দৃশ্যে তুমি পাগল হলেই ,জানবে -
ভিত, সিঁড়ি, না হওয়া বাড়ির লুকোচুরি তোমায় ডাকছে,
তুমি মাথা নাড়ালেই - হারালে।
স্থাপত্যে তুমি মহীয়ান হবে না আর,
বেচে দেওয়া বাড়ির ভেঙে পড়া দেখতে দেখতে..
একদিন ভুলে যাবে, ভিত কি! সিঁড়ি কি? সিঁড়িভাঙ্গা অঙ্ক কি!





চঞ্চল দুবের কবিতা

১.
অহো সুপ্তি


অনিবার্য সুপ্তির গভীরে জাগরণ জন্ম নেয়,
জাগরণ প্রণয়ে, বিদ্রোহে। 
শাশ্বত উর্বর জমি কর্ষণে ইচ্ছুক চাষী নতুন উদ্যমে 
অক্ষরে অক্ষর রাখে, 
যুক্তাক্ষরের দ্যোতনায় প্রতারিত হরিণীরা 
দূর্বাফুলে মুখ ঢেকে অভিমান আড়াল করে থাকে। 

কী নিবিড় একাত্মতা চোখের পাতায় জেগে রয় 
সারারাত ! 

শরীরে রোদ্দুর যার ঝরে যায় ডেকে এনে বিকেলের 
ছায়া, অক্ষর সমূহ থেকে যদি উঠে আসে অকস্মাৎ
বিশেষ আলোর রেখা, যে আলো উন্মাদ করতে চেয়ে 
কখনও চাঁদের রূপে মায়া ঢালে আবর্তিত আঁধারের বুকে ;
সঘন সুপ্তির মাঝে জাগরণ উন্মোচিত হতে থাকে ধীরে।



২.
আমার চারপাশে চাঁদ


আমার চারপাশে হাসি আর খেলা
আমার চারপাশে সঙ্গীত 
বাউলের দেহতত্ত্ব, রাখালিয়া বাঁশি 
আমার চারপাশে বায়ু-জল, নিষিদ্ধ ফলের গন্ধ 
জলে চাঁদের প্রতিবিম্ব, প্রলুব্ধকর আমন্ত্রণ 
এত আয়োজনে আমার মনুষ্য জন্ম ধন্য 
ধন্য আমার মোহাবিষ্ট দৃষ্টি, শিহরিত পৌরুষ 
ধন্য আমার দ্বিধা-দ্বন্দ্ব, লোকলজ্জা, ভয় 
ধন্য আমার মনের পাপ, প্রগলভতা 
ধন্য আমার গোপন অশ্রুজল 

অস্মিতার নৌকাডুবি হলে 
আত্মপ্রীতির কপালে চুম্বন দেয় বৈরাগ্যের মেঘ..


৩.
দৃশ্যান্তর


চাবির গোছা আঁচল থেকে আঁচলে বদল হয়ে যায়
রঙ্গমঞ্চে তখন নতুন আলোর প্রক্ষেপণ,
বেজে ওঠে নতুন আবহ সঙ্গীত। 
নায়িকা ক্রমশ পার্শ্ব চরিত্রের দিকে চলে যেতে যেতে 
তার সমস্ত অসহায়তা ও  বিষাদচিহ্ন
সাজঘরের আলোকিত নীরবতায় ছুঁড়ে ফেলে 
ক্রমশ বিবর্ণ হয়ে যায়।
মঞ্চে তখন নতুন কনসার্ট,
নতুন নায়িকার নাচের বিভঙ্গে আসর মাতোয়ারা। 
চাবির গোছা আজ নতুন নায়িকার ভ্যানিটি ব্যাগে
বডি স্প্রে'র উগ্র গন্ধে আচ্ছন্ন,
কর্তৃত্বের সঙ্গে তার চিরকালীন বন্ধন।





ব্যবচ্ছেদ

দেবশ্রী রায়

রক্ত মেখেছে ওরা, রক্ত মেখেছ তুমিও
আমি শুধু দূরে দাঁড়িয়ে
ডিসেকশন টেবিলের ওপর 
কাটাছেঁড়া দেখলাম সম্পর্কের
আর মর্গের পাশে সার্চলাইটের নীচে 
অতীত ও অন্ধকারের শর্তাধীন সন্ধিপত্র।

ওদিকে দূরে কোথাও ঢাক বেজে উঠেছে খুব
নোনাজল আর হারিয়ে যাওয়া রঙে 
বার বার একটা পুরোনো উঠোন আঁকছে কেউ
অভ্যাসের আড়াল ঢেকে 
বিসর্জনের ইতিবৃত্ত টেনে দিচ্ছে শেষবিন্দু পর্যন্ত।

পাশ ফিরে থাকা রাতের মতো 
চুপ হয়ে গেছে সবরকম নারকোটিক যাপন
অ্যানাসথেটিক ঘুম ও ঘোর কেটে গেলে
সমস্ত মৃত্যুভার সরিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা 
রৌদ্রকণার দিকে হাত বাড়িও সন্তর্পণে--
ভাঙাচোরা সব হিসেব ডিঙিয়ে
একটা পুনর্জন্ম হোক এবার।






নতুন রূপে

সন্দীপ বাউরী


ও গো মোৱ প্ৰিয়া ভুলে যাবে তুমি, ফিৱবে না মোৱ ভালোবাসাৱ দ্বাৱে।

ভিড়াবো না মোৱ তৱী ,তোমায় আনিবাৱে।।

তাই তো আমি স্বযত্নে ৱাখিয়াছি তোমাৱি ছবি হৃদয়েৱ মণি কোঠায়।।

 পড়ন্ত গোধূলি বেলায় সেটাও হয়তো একদিন বিলীন হয়ে যাবে দিগন্ত রেখার প্রান্তে।।

এর পর যা পড়ে থাকে, শুধু অন্ধকার কাটিয়ে নতূন ঊষার অপেক্ষা।।





এই শহর

সুজন পণ্ডা


ভুলে গেছি
কিভাবে এই শহর
ক্রমশ ক্লান্তির কাছে নতশির।
কিভাবে পাঁকে নিমজ্জিত হয়েছে
একের পর এক আকাশচুম্বি অট্টালিকা।


এখন, রাত্রি দিন দেখতে পাই
নাগরিক নখ, দাঁত। 
জমাট রক্তের মত কালো রাজপথ। 
এই শহর আদপে 
একটি লোলচর্ম শয়তান বলে প্রতীয়মান হয়।

এই শহরের নাম দিলাম অবক্ষয়
শহুরে কবিতা গুচ্ছ সব বারুদ হলে
আগামীর ভোরকে আমি পলাশ ডাকতে পারি।




সায়ন্তন ধরের সনেট

১.
জয়ী


তিস্তার বুকে যখন ধূধূ বালুচর
ভরসা মহিষ গাড়ি, কিছু হাঁটা পথ
পশ্চিমা বাতাস বয়, ওঠে ধূলিঝড়
ক্ষীণ জলধারাগুলি, নৌকা দিত সাথ।

কত কাছে দু'শহর, তবু দূরবর্তী
বরষায় স্নান করে প্রকৃতি যে শুদ্ধ,
দু'কূল ছাপিয়ে জল ভয়ঙ্কর অতি
অসহায় যাত্রীকূল, পথ অবরুদ্ধ।

সময়ে বদল আসে উন্নয়ন হেতু
আশায় আশায় থাকে জনগন সব
গড়ে ওঠে নদী 'পরে দীর্ঘতম সেতু
জয়ী ব্রীজ নাম তার, বঙ্গের গরব।

হাজার তারার আলো নিশীথ বেলায়,
দেখেছো কি তার শোভা আলোর মালায়?



২.
প্রকৃতির মাঝে দু'টো ক্ষুদে চিত্রকর


আশ্বিনের মন্ত্র মুগ্ধ প্রভাতী আলোয়
সমীরণ দোল খায় অ্যাকাশিয়া গাছে
অসময়ে কুহুতান দূরে শোনা যায়
স্লেটরঙা মেঘরাজ্যে নীল মিশে আছে।

দূরে নীল পাহাড়েরা দেয় হাতছানি
অরাইজা ফুলগুলি মেলেছে পাপড়ি
কত কথা জমে আছে জানি আমি জানি
সময়টা বয়ে যায় বড় তাড়াতাড়ি।

বাড়িতে কি মন টেকে কচিকাঁচাদের
আকাশে বাতাসে আজ পুজো পুজো গন্ধ
লুকোচুরি খেলা চলে মেঘের রোদের
সকাল থেকেই আজ পড়াশোনা বন্ধ।

"কচি ধানক্ষেতে আলো ঢালে দিবাকর,
প্রকৃতির মাঝে দু'টো ক্ষুদে চিত্রকর।"






'সময় যাপনের টুকরো' পাঠ...কবিজন্মের টুকরো-মুহূর্ত পাঠ

উমা মাহাতো


"এলোমেলো ছুটে বেড়ায় পালক,
তার মা পিছনে পিছনে,
পালক ধরা দেয় না, শুধু দুধের বাটি
থেকে ছলকে ওঠে তার হাসি
হাসিগুলি ধরে ধরে নিজের কাছে জমা করি
অনেকদিন ধরেই বুকটা ফাঁকা ফাঁকা লাগছে"

কবি নির্মল হালদার। সহজ কথায় বুকের টনটনে ব্যথাকে যিনি হৃদয় থেকে হৃদয়ে, গভীরে চারিয়ে দিতে পারেন, তাঁকে নিভৃত পাঠ করার আনন্দ-এক অনন্য অভিজ্ঞতা। তা অমল-নির্মল, সরল-অকপট অথচ অতলের তল, ভাবনায় সুনীল, উচ্চ।
"সময় যাপনের টুকরো" তেমনই এক মনোময়, প্রেমময় পাঠ অভিজ্ঞতা। যেখানে কবিতা পাঠের অধিক আছে কবিকে পাঠ। অথবা কবি ও কবিতা সমার্থক হয়ে উঠেছে যেখানে। গদ্যের আঙ্গিকে লেখা দৈনন্দিন জীবন, অনুভব ও অভিজ্ঞতার সুচারু নিবেদন।
৬৮ টি শীর্ষক। 'সুপ্রভাত 'দিয়ে শুভ আরম্ভ,' সেই হাসি'তে সমাপন। তারপর পৃষ্ঠাজুড়ে 'শেষ হইয়া ,হইল না শেষ'। লেখার পরতে পরতে জড়িয়ে থাকে, মাঝে মাঝে বেরিয়ে আসেন আপাদমস্তক সেই মানুষটি, যিনি অনুভবে সৎ, ভাবনায় স্বচ্ছ, ভালোবাসায় অকুণ্ঠ, সংবেদনে গভীর!

যেমন, 'বেহায়া' শীর্ষক রচনায় কবি যখন লেখেন,
"আমি বেহায়া, যার তার কাছে হাত পাতি। আমি নির্লজ্জ, সঙ্গ-সান্নিধ্য লোভ করি…..আমি আবেগকে সংযত করিতে শিক্ষা করি নাই। আমি রেগে গেলে, গালাগালি করি। আমি ভালোবাসার জন্য কাঙালও হই।' আমি লুকাইনা চোখের জল। ৫ বার ফোন না ধরলে বিচলিত বোধ করি, তবে কি শরীর খারাপ?আমার বৃত্তের কাছে আমি কুশল জানতেও চাই। বৃষ্টি চাই, চাষবাসের হাল কি যে হবে বলতে চাই।"
…...যে চাওয়াটুকু মানুষে-মানুষে, জীবনে জীবনে কমে আসছে ক্রমশ, কবি 'বেহায়া'হয়ে সেই চাওয়ার কাছে সগর্ব ঘোষণা করেন! হ্যাঁ, বেহায়ার শেষ পংক্তিতে তিনি বলতে ভোলেননি ইচ্ছে হলে গণতন্ত্রকেও তিনি বলবেন শুয়োরের খোঁয়াড়। সময় যাপনের টুকরো কবি প্রাণের এমনই আন্তরিক, নির্ভীক স্বীকারোক্তি।
'চিঠি'তে যখন দিনলিপি লেখেন কবি...
"কচু পাতায় চিঠি লেখা যাবে না। ছলকে যাবে শব্দেরা। পদ্ম পাতাতেও লেখা যাবে না, টলটল করবে শব্দেরা।...চওড়া-লম্বা উঠোন দেখলে তুলসীতলার ছবি মনে পড়ে।...জানলা খোলা থাকলে মুখ খুঁজি।করুণ, সুন্দর, মুখ।
সুখের ছায়া পড়বে জানলার দিকে। আমি দৌড়ে যাবো সৃজন ছায়ায়।"
কবির অন্তরে যে অধরা কবিটি, যিনি সৃজন ছায়ার জন্য অনবরত উন্মুখ,-প্রতিদিনের সময় যাপনেও ধরা পড়ে তার টুকরো কোলাজ। আসলে 'সময় যাপনের টুকরো' দৈনন্দিন অভিজ্ঞতায় লেখা হলেও কবির অনুভূতি আর বর্ণনার সততায় প্রত্যেকটি লেখাই হয়ে উঠেছে এক একটি গভীর কবিতা। অনুভবী পাঠককে সেই কবিতার আবেদন ছুঁয়ে যাবে, যাবেই।
'কবিতা' শীর্ষক এক লেখায় কবির সেই  স্বীকারোক্তি ও তার দাবীকে জোরালো প্রতিষ্ঠা দেয়..
"আমার যেটুকু আনন্দ, যদি খুব সংকীর্ণতা থেকেও বলি, আমার যা বিনোদন কেবল কবিতা।…"
ঘোর একটা চাই। ঘনঘোর মেঘের মতো ঘোর। চেয়ে থাকা। অপেক্ষায় থাকা। কখন আসবে বৃষ্টি। আমি বুক পেতে আছি। আঁজলা পেতে আছি।"
 বলা বাহুল্য',সময় যাপনের টুকরো' পাঠককে সেই ঘোর দেয়। রাণা, বিশু, বাবন, দুলিয়া, মনু, প্রদীপ, মধুসূদনদের চিরপরিচিত সঙ্গ, কাঁসাইয়ের, দারকেশ্বরের প্রতিদিনের প্রবাহ, বালকবেলায়, যৌবনে-রোজকার খুঁটিনাটিতে কীভাবে ঘোর লেগে থাকে, কীভাবে ঘোর খুঁজে নিতে হয়, জীবনের প্রচ্ছন্নে কবিতার বীজ পাঠ ঘুমিয়ে থাকে কীভাবে...মরমী মনে সেসব কথা লিখে গেছেন কবি।
বলা যায়, কবি নির্মল হালদারের আজ অবধি সাহিত্যকর্মকে অনুধাবন করতে হলে এই একটি বইই সিন্দুকের চাবিকাঠির কাজ করবে অনুশীলিত পাঠকের হাতে।
'ফোটোগ্রাফ' শিরোণাম রচনায় তিনি বলেন,-"এ সভ্যতার শ্রেষ্ঠ অবদান, মানুষ থেকে মানুষকে বিচ্ছিন্ন কর। একা করে দাও। সোশ্যাল মিডয়াতে চল, প্রযুক্তির সঙ্গে স্থাপন কর সম্পর্ক। যে সম্পর্ক বিদ্যুৎ বাহিত। যে সম্পর্ক অর্থ বাহিত। "কিংবা' উত্তর নেই ' অংশে যখন লেখেন-"মূর্খের প্রয়োজন খুব। মূর্খেরা আসুক। তাদের জীবনবোধ, অভিজ্ঞতা আমরা লিখতে চাই। তাঁদের স্নেহ ভালোবাসাও আমাদের সম্পদ হোক।" তখন জীবন অভিজ্ঞতা পূর্ণ কবির জীবন সম্পর্কে, সমকালীন সমাজ-সভ্যতার সংকট নিয়ে হতাশা অভিমানটিও বেদনার জলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অথচ কী নরম ও কাব্যিকভাবে, কাউকে আঘাত না দিয়ে নিজের ভিতরেই গোপন ব্যথা চারিয়ে নেন কবি।
সেই তো কবিতা!
এভাবেই প্রতিটি রচনাপাঠ শেষ করলেই 'সময় যাপনের টুকরো' পাঠককে এক অনন্য কবিতার আস্বাদন দেয়। শেষ পংক্তিগুলোর কাব্যিক আবেদন ও চমৎকারিত্বে প্রতিটি লেখাই হয়ে উঠেছে এক একটি কবিতা। যেমন-
ক)"এমন কি ঘর আছে আমার ? বৃষ্টিও কি আছে?"
খ)"ধ্যাৎ, আমার নিজেরই কোনো মানে নেই"
গ)"এ এক জীবনে সীমার সঙ্গে আর যেন দেখা না হয়"
ঘ)"দুয়ারে ঝুলছে বাপ-ঠাকুর্দার আমপ্ললব, দুলতে দুলতে মাথায় লাগছে আমার"
ঙ)"আমাকে না জানিয়ে যে শিশির ঝরে, যাকে দেখানো যায় না, সেই তো আমার বড় পুরস্কার। সব সময় তাকেই করি নমস্কার।"
চ)"লুকোচ্ছিস? কেন লুকোবি? কান্না লুকিয়ে ফেলাও এক পাপ"
ছ)"হে নিদ্রাহীন, অসংখ্য মানুষের সঙ্গে পেতেছি তোমার শয্যা।  ইত্যাদি।"
কবিজন্মের সাধনা, নিষ্পাপ প্রেমের সাধনা, ভালোবাসার সাধনা। আলোচ্য বইয়ে জীবনকে প্রগাঢ়ভাবে ভালোবাসেন এমন এক নিখাদ কবিই উঁকি দিয়ে যান বারবার। দৈনন্দিন প্রতিটি মুহূর্তে এক ভালোবাসার কাঙাল হৃদয় যেন টুকরো টুকরো মানুষ হয়ে  ছড়িয়ে পড়তে চায় চারপাশে। শিশুর হাসির মতো,খেলার মতো,পালকের মতো। ভারহীন। সহজ।কেননা কবির কাছে- "ভালোবাসা এক সংস্কৃতি।যত্রতত্র যেমন থুতু ফেলব না তেমনি অযথা মানুষকে বিদ্রুপ করব না। ছোট করব না। ক্ষতি করব না মানব প্রকৃতির।…ভালোবাসাই উদ্ধার করবে বণ্য প্রাণীদের।ধাপে ধাপে আলোর কিরণ। প্রজাপতি ফড়িঙের নাচানাচি। শিশুদের মুখের দিকে চেয়ে আমাদের পথচলা।"(বিপন্নতা)
এভাবেই বিপন্নতা সরিয়ে এক সম্পন্ন বিস্ময়ে, এক প্রকৃত কবির দৈনন্দিন জীবন-অভিজ্ঞতার পাঠ ও লেখার সমন্বয়ে ' সময় যাপনের টুকরো' বইটি  অনুভবী হৃদয়ের যাপন অধিকার করে নেয়।
কবিকে আন্তরিক শ্রদ্ধা। তাঁর নির্মল জীবন পাঠ, পাঠককে এক আপাদমস্তক কবি -জীবনের পাঠ দিয়ে ধন্য করবে, ঋদ্ধ করবে এই বই।
'কবিজন্ম এক সাধনা'। সেই সাধনার নিরবচ্ছিন্ন দিকনির্দেশ 'সময় যাপনের টুকরো'।








খাঁটি বা জা'ত লোকগান বলতে যা বুঝায় আজও তার নাম "বিয়ের গান" । এই গান সম্পূর্ণরূপেই সমষ্টির সৃষ্টি । কোন একজন ব্যক্তির রচনা নয়, কেউ ইচ্ছে করে এ গান রচনাও করে না । এই গান জোর করে লেখা সাহিত্যিক লোকগান নয় । কবে কোন্ আদ্দিকালে এই গীতগুলি লোক সমাজের বিকাশ ধারায় স্বতঃস্ফূর্তভাবেই উঠে এসেছে, সেগুলিই ঘুরেফিরে আজও চলছে মন্ত্রের মতো । লিখছেন ---
           
                                তপন পাত্র
"""""""'''''''"""""'''''''"""'""""''''''""""""""''''""""""''''"""""""'''''""''''''''''""''''''''''"''''''''""



          মানভূমের বিহার গীত
        """"""""''''''"""""""'''""""'''"""'""""""""""""""""""""""''

                  আমাদের সামাজিক জীবনে বিবাহ একটি অপরিমেয় গুরুত্বপূর্ণ মানবিক অনুষ্ঠান । নাগরিক জীবনযাত্রায় বিবাহ অনুষ্ঠান ব্যক্তিবিশেষ , পরিবার ও আত্মীয়-স্বজন-কুটুম্বাদির মধ্যে সীমাবদ্ধ । কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম সীমান্ত বাংলা তথা মানভূম- পুরুলিয়ার লৌকিক জীবনযাত্রায় এই আনন্দঘন অনুষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট সমাজের ভূমিকা বিশেষ মর্যাদার সঙ্গেই স্বীকৃত । এই অংশের তপশিলি জাতি , উপজাতি সহ লোকায়ত জীবনে বিবাহ অনুষ্ঠানে ব্রাহ্মণের দরকার হয় না , প্রয়োজন হয় না যাগ-যজ্ঞাদি ক্রিয়াকর্মের ।

                       বিবাহ উপলক্ষে এক ধরনের গীতির ভূমিকা অবিচ্ছেদ্য , যা মূলত সমবেত নারীদের কন্ঠে গেয় । এই যৌথ সংগীতের এমন এক বিশেষ লৌকিক রূপ আছে যে কারণে তা খাঁটি লোকসঙ্গীতের অভিধায় অভিধিত । প্রকৃতপক্ষে খাঁটি বা জাত লোকসংগীত বলতে যা বোঝায় তার সবক'টি বৈশিষ্ট্য এই সংগীতের মধ্য বিদ্যমান । লোকসঙ্গীতের অন্যান্য শাখায় আমরা ইদানীং যে সমস্ত সংগীত গুলি লক্ষ‍্য করি সেগুলি কোন না কোন ব্যক্তিবিশেষের রচনা, সমষ্টির মুখে মুখে ফিরে একটি বিশেষ রুপপ্রাপ্ত নয় । কাজেই সেগুলি খাঁটি লোকসংগীতও নয়, সেগুলিকে কোনো একজন ব্যক্তি দ্বারা রচিত সাহিত্যিক লোকসংগীত বলা যেতে পারে । কিন্তু এই লোকসঙ্গীত ধারাবাহিকভাবে রচিত হয় না, কবে কোন্ আদ্দিকালে মানুষের মুখে মুখে ফিরতে ফিরতে সৃষ্টি হয়েছিল, আজও সে ক'টাই তদ্রুপে বা আংশিক রূপান্তরিত হয়ে মহাকালের পথ ধরে অনেকটাই মন্ত্রের মতো চলে আসছে । কেউ কখনো সাধ করে এই সংগীত রচনা করতে বসেনি । এই গীতির নাম "বিবাহ গীতি", "বিবাহ সংগীত" বা "বিয়ের গান" ; স্থানীয় ভাষায় "বিহার গীত", "বিয়া গীত", "বেহা গীত" ইত্যাদি ।

                সাধারণত যে কোন লোকগানে দেব-দেবীর বন্দনা , আঁখড়ার বন্দনা ইত্যাদি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ কিন্তু এই গানে দেব-দেবী বন্দনা নেই ,পুরাণকথার তেমন কোনো ঠাঁই নেই ; পরিবেশ-প্রতিবেশ , আর্থ-সামাজিক চিন্তা-ভাবনা , সাধারণ ঘরোয়া কথা-বার্তা , মান - অভিমান , লৌকিক ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ ও শ্রমচর্যা এই গানের বিষয়বস্তু । এগুলি যে সমাজের গান সেই সমাজে শ্রমচর্যায় যেহেতু আজও অনেকটাই নারী-পুরুষের সমানাধিকার, তাই এটি ঘটে থাকা স্বাভাবিক । কিছু কিছু রামায়ণ ও মহাভারত কথা হয়তো এসেছে এই গানে ,তবে তা নিতান্তই পারিবারিক বিষয় কে জড়িয়ে নিয়ে ।

                         বিভিন্ন জাতি , উপজাতি , জনজাতি সম্প্রদায়ের বিবাহ পদ্ধতি মূলত ব্রাহ্মণ্য বর্জিত । বর্তমানে কোন কোন জাতির মধ্যে পুরোহিত নিয়োগের প্রথা প্রচলিত হয়েছে । কারণ সংরক্ষণ , অনুকরণপ্রিয়তা, সমাজের শিকড় থেকে নিজেদের পৃথক করে মাহুর হিসাবে প্রতিষ্ঠা করার মানসিকতা , সমাজের স্বাভাবিক বিবর্তন । তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই লৌকিক আচার আচরণের মধ্য দিয়েই বিবাহ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয় । আজও বিবাহ অনুষ্ঠানের বিভিন্ন মুহূর্তে স্ত্রী আচারের সাথে সাথে নানারকম গীত পরিবেশিত হয় । যদিও তা দিন দিন ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে আসছে ।

                     বিবাহ বহু প্রাচীনকাল থেকেই সর্বাধিক অর্থনৈতিক সমস্যা জর্জরিত সামাজিক অনুষ্ঠান । বড়ো কারণ একটাই --পণপ্রথা ; তা কখনো কন্যাপণ কখনো বরপণ। আর তারই পাশাপাশি রয়েছে অগণিত মানুষকে অনুষ্ঠান উপলক্ষে বারবার ভুরিভোজনের ব্যবস্থা করা । এছাড়া সীমান্ত বাংলার পশ্চিম প্রান্তের অগণিত মানুষ ভূমিহীন দুঃস্থ ঋণ ভারে জর্জরিত । তাই দিনমজুর ক্ষেতমজুর শ্রমজীবী মানুষের বিয়ের গানে অর্থনৈতিক সমস্যা এবং সামাজিক জটিলতার প্রতিচ্ছবি তো আছেই কিন্তু সবচেয়ে সুস্পষ্টভাবে রয়েছে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বিবাহ সংক্রান্ত প্রত্যেকটি ঘটনার সুস্পষ্ট প্রতিচ্ছবি । 

                        বিয়ের গান বিবাহ অনুষ্ঠান শুরু হবার পূর্বে নবসম্বন্ধ পাকাপাকি হওয়ার সময় আরম্ভ হয়ে যায় । এই গান বিবাহ অনুষ্ঠান ছাড়া আর কখনোই গাওয়া হয় না । নিষ্প্রাণ আচারানুষ্ঠানসর্বস্ব বিষয়টিও গানে গানে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে । গান গাওয়া হয় দেনা-পাওনাকে নিয়ে । এই সমাজে একসময় কন্যাপণের প্রচলন ছিল । তার পরিচয় মেলে একটি গানে ---

        " উঁচু উঁচু ঘর গিলান গম্ভীর গম্ভীর পিঁড়া 
        তার ভিতর ভমরা গুজরে ,    
        আজাকে যে দিবে ভমর আঁজলা ভরা টাকা ,
       তবে ভমর হইব তোমারি ।"

            বিয়ের বিষয়টি চূড়ান্ত করার জন্য শুধু আজার হাতে টাকা তুলে দিলেই হবে না । ভাই , জ‍্যাঠা সকলকেই তাদের নিজের নিজের পাওনা মিটিয়ে দিতে হবে ।
 
       "ভাইকে যে দিবে ভমর এঢ়ি ঢাকা ধুতি
         তবে ভমর হইব তোমারি। 
        জ‍্যাঠাকে যে দিবে ভমর
         আঁজলা ভরা টাকা তবে ভমর হইব তোমারি।"


                 বিয়ের বিষয়টি চূড়ান্ত হয়ে যাওয়ার পর প্রথম অনুষ্ঠানে বর-কনের সুদ‌ঢ় হৃদয় বন্ধনের প্রসঙ্গ ফুটে ওঠে গানে । আমরা সাধারণত সাত পাকে বাঁধা'র কথা শুনি , কিন্তু এই লোকগানে এসেছে দড়ি দিয়ে হৃদয় বাঁধার কথা, তবে সে দড়ি অবশ্যই শনের দড়ি নয়, সোনার দড়ি ।

      "আজ বালাকে বাঁধব
        আজ বালাকে বাঁধব 
        সোনার জোতে ।
       এমন কার শক্তি আছে,
           ওগো, বলি, বাঁধন ঘুচাতে ।"

                     এরপর বিয়ের লগ্ন এগিয়ে আসে । তার আগে গাত্রহরিদ্রা । কন্যা পক্ষের দুশ্চিন্তা কাঁসাই নদীতে তো শিলনোড়া পাওয়া যাবে হলুদ বাটার জন্য ; হয়তো বাজার থেকে হলুদও জুটে যাবে কোন রকমে । কিন্তু যদি তেল ফুরিয়ে যায়, তেল পাওয়া না যায় , তাহলে কী হবে ?

   " কাঁসায়ে'রি শিল-নড়া নগরের ই হলুদ গো ,
     ভাল ক'রে হলুদ বাটবি যেমন কন্যার অঙ্গে সাজে গো ।
      তেলের ভাঁড়ে তেল্অ নাই মা, তেল ফুরাঁইয়ে গেছে গো 
   তখন বাছা কাঁদিতে লাগিল গো।
    বাপু গেল বুঝাইতে না ন কাঁদ গো ।
      তখন বাছা কাঁদিতে লাগিল গো ।"

               কিন্তু যখন যামাইদাদা বুঝাতে গেল , তখন হয়তো এক ভিন্ ধরনের সোহাগবশত কান্না থেমে গেল ।

   "বহনাই গেল বুঝাইতে না ন বাছা কাঁদ গো,
    তখন বাছা হাঁসিতে লাগিল।"

                  বরের ক্ষেত্রে বিয়ে করতে যাবার আগে এবং কনের ক্ষেত্রে বিয়ে শুরু হবার পূর্বে বৃক্ষবন্দনা করা বিবাহের অন্যতম অনুষ্ঠান । এই অনুষ্ঠানের পর বর গাছতল থেকেই বিয়ের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন কনের বাড়ি অভিমুখে । বরের মা তখন গান ধরেন ---

    "তুমি যে যাবে পুতা শ্বশুরেরই বাড়ি 
   দিঁয়ে রাখ দুধকেরই ধার ..."

         পুত্র মাতৃঋণ , মাতৃ দুগ্ধের ঋণ কখনো শোধ করতে পারে না । কোন মাও তা চান না । এ নিছক সমাজ-পারিবারিক সংস্কার মাত্র । তাই পুত্র কিংবা পুত্রের পক্ষ নিয়ে অন্য কোন নারী গায় ---

   "কী অ যে দিব মাগো দুধকেরই ধার গো
     মা গো আ'নে দিব জনমের কামিনী ..."

              আজীবন সেবার জন্য দাসী আনবে এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে ছেলে যায় বিয়ে করতে । মেয়েরা গায় গান ---

   "ঝালিদার শহরে কীসের বাজনা বাজিছে ,
    আন রে বিরাটের অলি চিনব বরের আজাকে ,
   দেখলি বরের আজাকে, চিনলি বরের আজাকে ,
   কত সনার গয়না আ'নেছ
    সাধের লাতির বিহা দিতে ।"

           সবই দেওয়া হয় । বিবাহও হয়ে যায় । এ সময় অনেক অনেক গান গীত হয় । বিবাহিতা মেয়েটির মায়ের চোখে অশ্রু ঝর্ণা । তাই দেখে কন্যা বলে ---

   "এতদিন যে মার্-অ মাইগ, আদাড় পিঁদাড় ভাঙ্গে
    আজ ক‍্যানে কাঁদ মা চ'খে আঁচল দিয়ে ।
   সেই যে মা গা'ল দিঁয়েছ খালভরি ব'লে ,
    আজ ক‍্যানে কাঁদ মাগ ছামড়া খুঁটা ধ'রে । "

              বিয়ের রাত্রিকালীন অনুষ্ঠান শেষ । সকাল হলেই মেয়ের শ্বশুর বাড়ি যাবার পালা । বর বলে ---

   "আজিকা রাতিয়া সোনার মিরগি ডাকে ,
    উঠ লো কন‍্যা ভাঙল বিহান ,
    বার বছর কন্যা মা-বাপেরই ঘরে
    তবু কন্যা সাধ না মিটিল ?

                 অনেক কান্নাকাটি পর কন্যা শ্বশুর বাড়িতে যাবার জন্য পা বাড়ায় । মনের গভীর দুঃখে গান গায় না, কিন্তু দুঃখ গান হয়ে ফুটে ওঠে । 

   " বার টাকা পন লিল্ হ
     বিহা দিল দুরাম দ‍্যাশে 
     আরঅ কি রহিব মাই ঘরে,
     আরঅ কি রহিব বাপ ঘরে
     বু'ঝে লিহ গো মাই এই ভব সংসারে ।"
  
               নববধূ শ্বশুর বাড়িতে পৌঁছে গেছে । তাকে দেখার জন্য ননদিনীদের ভীড় । তারা কনে বউয়ের চেহারা নিয়ে বিদ্রুপ করে 
---

     (১) আম ধরে থঁকা থঁকা তেতুল ফলে বাঁকা ,
     কী দে'খে বিহা করলি দাদা,ঠ‍্যাং দুটাই পেঁকা ।"

     (২) ছুটু মুটু ডিহালি 
           ক‍্যানে লো তুই বিহালি 
           জনহা'র ঘাঁটা খাঁইয়‍্যা দিদি
          ক‍্যানে এত শুকালি ।"

                    বৌদি কে লক্ষ্য করে, রোগা পাতলা চেহারা দেখে এই গান ।

                  এদিকে মেয়েরও পছন্দ হয়নি বর । সে কথা এখন মনের ভিতর গুমরে উঠছে ।

       " একশ' টাকা লিলি বাবা দিলি বুঢ়া বরে হে ,
       বরের সঙ্গে যাতে হ'ল পুরু'ল‍্যা শহরে হে ,
      পুরু'ল‍্যার ল'কে বলে ইটা তুমার কে বঠে ?
      লজ্জাকে কারণ বলি ঠাকুদ্দাদা বেঠে হে ।"

              তবুও বিবাহিতা বধূর স্বামীই ভরসা ।

       " থালা-বাটি মাজিব ,
         শিকায় তু'লে রাখিব,
        ভা'ঙ্গে গেলে 
        আমার শ্যামের গলা ধরে কাঁদিব ।"

                শত দুঃখেও স্বামীর ঘর করতেই হয় মেয়েদের । দৈনন্দিন জীবনে কষ্টের অন্ত থাকে না । 

      "কাঠ নাই, পাৎ নাই ,
        জনহা'র খাড়ায় রাঁধি গো
       জলঘটি লিয়ে শ্যামকে
       আ'স আ'স ডাকি গো ।"

                  প্রতিদিনের খাবার তৈরি হয় শুকনো জুনহার (ভুট্টা) গাছকে জ্বালানী হিসাবে ব্যবহার করে । খাবার সাজিয়ে দিয়ে স্ত্রী তার স্বামীকে ডাকে । হাত-পা ধোয়ার জন‍্য ঘটি ভর্তি জল বাড়িয়ে দেয় । এইভাবে দুখে সুখে দিন কাটে বেশ । দিন যায়, ক্ষণ যায়, কনে বউ মা হয় । তারপর একদিন তার ছেলে কেঁদে কেঁদে মাকে খুঁজে বেড়ায় ---

     " ছে'লা খুঁজে মাই মাই 
       ছে'লার মা ত ঘরে নাই --
       ছে'লার মা গেল দাদনে
       ছে'লা কাঁদে ধাদিকার বনে।"

              ধাদিকা পুরুলিয়া জেলার বান্দোয়ান থানার অন্তর্গত একটি ছায়া সুনিবিড় বনাঞ্চল বেষ্টিত গ্রাম । ধাদিকার বনে কাঁদছে এক শিশু । মা নেই তার ঘরে । "দাদন" অর্থাৎ "ঋণ"এর দায়ে আজ সে যেন সর্বংসহা ধরিত্রী। পরিবারের ঋণের টাকা শোধ করতে না পারলে একসময় মহাজনেরা সেই পরিবারের স্ত্রীলোককে গ্রহণ করতেন সাময়িকভাবে ভোগ্য দ্রব্য হিসেবে । সীমান্ত বাংলার পল্লী অঞ্চলের লোকায়ত জীবনের করুণ মর্মন্তুদ আর্থ-সামাজিক অবস্থার বাস্তব প্রতিচ্ছবি এটি । মানব জীবনের শ্রেষ্ঠ আনন্দ অনুষ্ঠানেও আমরা শুনতে পাই নিরানন্দ ধ্বনি । ভাবতে অবাক লাগে , পার্থিব জীবনের এমন একটি আনন্দঘন অনুষ্ঠানের গান যদি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত শোনা যায় , ঘটনা পরম্পরায় যা গীত হয়, তাহলে দেখা যাবে সর্বত্রই জড়িয়ে রয়েছে, ছড়িয়ে রয়েছে একটি ধীর স্থির বিষন্নতার সুর , কিঞ্চিৎ ব্যতিক্রম শুধু রঙ্গ রসিকতার দু'একটি গানে।




________________________________________________

ঔপন্যাসিক দীপংকর রায়ের ধারাবাহিক উপন্যাস---
"জলশ্যাওলার বিরহকথা" --- এবার সপ্তম পর্ব
________________________________

জলশ্যাওলার বিরহকথা

দীপংকর রায়

              উত্তর-পশ্চিম কোনে ছাদের একটি ধারে মাদুর পেতে কার্তিক-শেষ অঘ্রাণ-শুরুর এই সময়ে অল্প অল্প হিমের মধ্যে তারা কি এই রাতের  আকাশে হাজার হাজার নক্ষত্রদের ঘোরের ভেতর এখানে ভেসে যেতে এলো, নাকি এই আলো অন্ধকারের রূপ দেখতে আরো বেশি করে ছাদের এই কোনাতে এসে বসেছে তারা  ?  
             মানুষের কোনো কাজের ঠিকঠাক উত্তর পাওয়া ভার, কিন্তু এখন কেন সে এলো ? আগে কেন যেতে চেয়েছিলো না ? 
             এসব কথা অনেক কথার মধ্যে তলিয়ে ভূত হয়ে থাকলেও সে জানে কেন তার মন দশ বছর আগের সেই সব রোমাঞ্চকর মুহূর্তেই ফিরে যেতে চাইছে ! কিন্তু কিই বা সাযুজ্য আছে তার সঙ্গে এর ? 
              এই একরত্তি মেয়েটির কী এমন আচার-আচরণ দেখে তার মধ্যে এমন মুগ্ধতা প্রবেশ করলো ? কেনই বা মেয়েটি, এই ধেড়েকেষ্ট ননদে-জামাই-এর সঙ্গে এমন ভাবে, এতটা গদগদ হয়ে যাচ্ছে আজ ? 
               মোহিত হবার মতন এমন তো কোনো বিষয় নেই তার মধ্যে। যার জন্যে এতটা আবেগে থরথর হয়ে উঠতে পারে ! তবু কীভাবে যেন এই দুটি দিন সে তার সমস্তটা সময় কেড়ে নিয়েছে। সে যতটা না ভাবছে, মেয়েটি কি বউ হয়েও ততটা ভাবনায় তলিয়ে দেখছে এইসব ? একবারও কি জীবনের সেইসব অসহায়ত্বের দিকে তাকিয়ে দেখেছে সে ? আরও পড়ুন




                       আমাদের বই






এই সংস্করণের ছবি পেতে সহায়তা করেছেন আলোকচিত্র শিল্পী শুভাশিস গুহ নিয়োগী মহাশয়। ওঁর কাছে আমরা বিশেষ ভাবে কৃতজ্ঞ।



সম্পাদক : উত্তম মাহাত
সহায়তা : অনিকেতের বন্ধুরা
যোগাযোগ : হোয়াটসঅ্যাপ - ৯৯৩২৫০৫৭৮০
ইমেইল - uttamklp@gmail.com







মন্তব্যসমূহ

  1. অনবদ্য সংখ্যা। চমৎকার সব কবিতা দিয়ে সাজানো। অরণি বসুর লেখা বিষণ্ণ করে । তপন পাত্রের লেখায় তার চর্চা,গভীর ভাবে দেখা লৌকিক জীবনের ছন্দ ফুটে উঠেছে। সমৃদ্ধ করে। উমা মাহাতোর কলমে নির্মল হালদারকে নিয়ে আলোচনা যথাযথ... তাঁরই (নির্মল হালদার) একটি সাম্প্রতিক লাইন এই প্রসঙ্গে মনে পড়ছে "শিশুর মতো সহজ লাগছে শিশুর মতো গভীর"...
    এই পত্রিকার সর্বোচ্চ সমৃদ্ধি কামনা করি।

    উত্তরমুছুন

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ছবি প্রদর্শ-শালা ।। আলোকচিত্র ।। মোহন পরামানিক

ছবি প্রদর্শ-শালা ।। আলোকচিত্র ।। শঙ্কর মন্ডল

ছবি প্রদর্শ-শালা ।। আলোকচিত্র শিল্প ।। মুকেশ কুমার মাহাত