শ্রীসদনে দৈনন্দিন – ১ / মধুপর্ণা
শ্রীসদনে দৈনন্দিন – ১
মধুপর্ণা
এক আশ্চর্য বিকেলে একটা ট্রাঙ্ক, একটা তোষক, বালিশ সমেত শ্রীসদনে রেখে গিয়েছিল মা। মেইন ব্লক ডর্মেটরি, তাতে আটজনের থাকার ব্যবস্থা। জানলার পাশে বেড, একটা টেবিল, একটা জিনিসপত্রের তাক আর একটা তক্তা। একটা নিজস্ব ছোট জগত ক্রমে ঘনিয়ে উঠেছিল এই অল্প জায়গায়। জানলার ওপারে চালতা গাছ, তাতে বিকেল হলে অজস্র টিয়া পাখি উড়ে বেড়ায়। রত্নাদি আর কুমকুমদির তত্ত্বাবধানে প্রত্যেকে আদৃত বোধ করে ঘরের বাইরে এসেও। সঙ্গে ফোন রাখার নিয়ম নেই। ওয়েটিং রুমে একটা ল্যান্ড ফোন সেখানে বাড়ি থেকে ফোন এলে মাসিরা ডেকে দিতেন তাতে পাঁচ-ছয় মিনিট কথা। বাথরুমে বালতি পেতে স্নানের জন্য লাইন দিতে হয় উত্তর শিক্ষা থেকে ফিরে৷ সেই নিয়ে বিস্তর হুল্লোড়।এইসব দৃশ্য গুলো, সময়ের ছোট ছোট ভগ্নাংশ মাথার ভিতর,মনের ভিতর ঘোরে। ঘুরতে থাকে কিন্তু ফুরোয় না। অ-শেষ একটি রিলের মত দৃশ্য গুলো একের পর এক। মানসভ্রমণ হয়। সেই উঁচু সিঁড়ি গুলো বেয়ে, বারান্দা পেরিয়ে, সিনিয়রদের 'গ্লিটারিং গার্লস' লিখে রেখে যাওয়া দরজা পেরিয়ে শ্রীসদনের ডর্মেটরির সেই বেডে কতদিন চুপ করে বসে থাকি। তুলসী মাসীর কণ্ঠ শুনতে পাই, "এত কাগজ কুচি কুচি করে বিছানায় তলায় ফেলো না, বাইরে ফেলবে” আর ফেলব না। এবারটাই লাস্ট। থালা নিয়ে দুবেলা জেনারেল কিচেন, কিচেনে সিনেমার গান চলত, হিন্দী সিনেমার গান। গ্যাংস্টারের গান, কাল হো না হো র গান। কতদিন এখনও খেতে বসে সেই সময়টায় ফেরার জন্য গান গুলো এমনি চালিয়ে রাখি। দেখে হাসে একজন। "কোনো মানে হয়!"
“ভালো লাগে আসলে, গানগুলো এক একটা কৌটো, যাতে কিছু ব্যক্তিগত সময় পুরে রাখা আছে"।
“নাও তাহলে, কৌটো খুলে সুগন্ধ নাও!"
অজস্র ভুতের গল্প ঘুরত হস্টেলময়। প্রায়শই নাকি ভুত দেখে লোকজন চালতা গাছে, হারিয়ে যাওয়া জিনিসপত্র নাকি চালতা তলায় রাত্রে পাওয়া যায়। সাদা ওড়না নিয়ে নাকি গাছে গাছে ঘোরে। সুতরাং সেপথে চোখ বন্ধ করে সোজা দৌড়। অথবা বারান্দার জাল দিয়ে দেখা যায় সে গাছ, তাই রাতে বাথরুমে যেতে গেলে রাম রাম রাম। "তোর বেডের ওপর যে সিলিং ফ্যানটা ঝুলছে সেটায় একজন গলায় দড়ি নিয়েছিল, ভয় পাবার কিছু নেই, তবে মাঝেমধ্যে রাতে চোখ খুলে কাউকে ঝুলতে দেখলে খাতে ভয় না পাস সেকারনে জানিয়ে রাখা!"একথা শুনে সে বেডে আর ঘুমোনো গেল না পরের একমাস। পাশের সরু তক্তায় রুমমেটের সঙ্গে দুজন ঘুমাই। আরেকদিন গল্প শোনা গেল, রবীন্দ্রসংগীতের ছাত্রী একজন আত্মহত্যা করেছিলেন এই ব্লকে, তিনি ভুলতে পারেন নি হস্টেল, তিনি সন্ধ্যের দিকে হস্টেলের কোনো রুম ফাঁকা থাকলে একা একা ঘুরে ঘুরে গান গেয়ে থাকেন। এইসব আমরা অনেকেই বিশ্বাস করতাম তখন। তখনকার এইসব বিশ্বাসের কয়েকটা স্বর্নালী কণা এখন আনন্দ দেয়। অনন্ত রিল থেকে ধারাবাহিক দৃশ্য গুলো কোমল হয়ে আসে। মাথার ভিতর সুখবোধ ছড়িয়ে পড়ে এইসব ভেবে। গবেষনা সূত্রে শ্রীসদনের নির্মাণ বিষয়ে বর্তমানে পড়াশুনা করতে গিয়ে দেখা গেল, কিছুর একটা উপশম হয়, শ্রীসদনের তৈরি হবার ইতিহাস পড়তে পড়তে যেন একটা নিরাবয়ব নরম স্পর্শ ঘনীভূত হয়ে পাশে বসে। একটা হস্টেল একটা সত্তা হয়ে ওঠে।
পরিচিতি
মধুপর্ণা কর্মকার। বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র। বর্তমানে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে মানবীবিদ্যা চর্চাকেন্দ্রে গবেষণা করেন। লিখেছেন - ' গার্লস হস্টেল ; আবাসিক নারীর মানসভূমি।'(২০১৮)
তাঁর ব্লগ লিঙ্কে প্রবেশ করুন
তাঁর লিঙ্কট্রি লিঙ্কে প্রবেশ করুন
মধুপর্ণার আগের সংস্করণের লেখা পড়ুন
মধুপর্ণার আগের সংস্করণের লেখা পড়ুন


মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন