পাবলিক স্পেস, বাহ্যিক বিচরণ ভূমির লিঙ্গরাজনীতি
পাবলিক স্পেস, বাহ্যিক বিচরণ ভূমির লিঙ্গরাজনীতি
(দ্বিতীয় পর্ব)
মধুপর্ণা কর্মকার
‘পাবলিক’ এর জেন্ডার কি? কারা আসলে এই ‘পাবলিক’?
আর ‘পাবলিক স্পেস' এ কাদের অলিখিত দখল ? এই 'পাবলিক স্পেস' এর পরিধি খুব অদ্ভুত। শুধুমাত্র স্থানিক বিস্তার নয়, স্থান এবং সময়ের দ্বিপাক্ষিক সমন্বয়ে তৈরি হয় 'পাবলিক স্পেস' এর চরিত্র এবং বৈশিষ্ট্য। এই পরিসরে কর্ম সূত্রে, ইচ্ছা সূত্রে মানুষজনের চলাচল। এই পরিসরের অভিজ্ঞতা সামাজিক অবস্থান অনুসারে আলাদা আলাদা ভাবে হয়। লিঙ্গ বৈষম্যের সুবিস্তৃত জটিল বিন্যাস দ্বারা এই স্পেসও অধিকৃত। এই নির্মিত পরিসর একজন নারী এবং একজন পুরুষকে ভিন্ন ভাবে দেখে এবং ভিন্ন ভিন্ন ভূমিকায় প্রত্যাশা করে। যে পরিসর সর্বসাধারণের ব্যবহারের জন্য সেখানে এই “সর্বসাধারন" এর একাংশের প্রতি ঝুঁকে থাকে পক্ষপাতের পাল্লা। কারণ পিতৃতান্ত্রিক সমাজ জন্মসূত্রে এবং বিশেষ লিঙ্গ পরিচয়ের জন্য বাড়তি কিছু সুবিধা ও ক্ষমতা ব্যবহারের বন্দোবস্ত করে রেখেছে। তাই সর্বসাধারনের ব্যবহার্য জায়গায় তাদের আস্ফালন আর সুবিধাভোগ চোখে পড়ার মত বেশি। 'ঘর' এবং 'ভিতরের ঘর' থেকে যখন কাজে বা ইচ্ছায় মেয়েরা বাইরে আসে, তাদের পড়তে হয় নানাবিধ সমস্যায়। 'সর্বসাধারন' এর বিচিত্র 'নিরপেক্ষ' আদলের ভিতরে তাদের অবস্থান মুহুর্তে মুহুর্তে বদলানো হয় লিঙ্গভিত্তিক সামাজিক নিয়ম অনুসারে। এই পরিসরে একজন মেয়ের 'অধিকার' ততটাই যতটা লিঙ্গপরিচয়ের ভিত্তিতে একটি সমাজ তাকে দিয়ে থাকে। তাই ‘সর্বসাধারন’এর জন্য উন্মুক্ত পরিসরে তার স্থান ক্রমে সংকুচিত হয়ে আসে, তার জন্য বরাদ্দ হয় বৃত্তের ভিতরে অনেক ছোট মাপের আরেকটি বৃত্ত। যার চারপাশে ঘুরছে নর্ম, নিষেধাজ্ঞা ইত্যাদি। তাই পাবলিক স্পেসে তার চলাচলের পোশাকের বিধি আছে, কোন সময়ে সে এই পরিসরে আসবে, এই পরিসরে সর্বোচ্চ তার থাকার সর্বোচ্চ সীমা নির্দিষ্ট আছে। এই সব সীমা এবং বিধির বাইরে গেলে 'বিপদে' পড়তে হয়, এবং সমস্ত বিপদের দায় চাপানো হয় তারই উপর। লিঙ্গবৈষম্যপূর্ণ সমাজে একটা সময়ে তারা এবং তাদের গতিবিধিই হয়ে ওঠে 'বিপদের কারণ"। এইভাবে লিঙ্গবৈষম্যপূর্ণ সমাজ তার হিংস্র নারীবিদ্বেষের নখদাঁত গুলো লিঙ্গরাজনীতির ভিতরে লুকিয়ে রাখে বা বলা ভাল লালন পালন করে। তাই পোশাক, আচরণ, বডি ল্যাঙ্গোয়েজ, হাসি, হাঁটাচলা সবকিছুতেই তাকে 'ঠিক' হতে হয়, ‘ঠিক’ থাকতে হয়। কারণ তার গতিবিধি মাপা হচ্ছে নিয়মের ফিতে দিয়ে। একটি নজরদারি, একটি দৃষ্টি তার চারপাশে আছে যা আপাত অদৃশ্য কিন্তু যার উপস্থিতি অনুভূত হয় প্রকট ভাবেই। তাই 'সর্বসাধারন'এর ব্যবহারের জন্য রাস্তায়, গণপরিবহনে, উদ্যানে,পার্কে, মাঠে, সৈকতে, বাজারে মেয়েদের এক ধরণের অদৃশ্য নিয়ম মেনে এবং আতঙ্কে চলাফেরা করতে হয়। শিল্পা ফাডকে “হোয়াই লয়টার” এ মুম্বাই এর পাবলিক স্পেসের ছবি তুলে ধরেছেন অপূর্ব নারীবাদী বিশ্লেষণে। সেখানে অবশ্য আরো অনেক মাত্রা যুক্ত হয়েছে স্থানিক বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে। আবার ইন্টারসেকশনালিটির লেন্স থেকে দেখলে বোঝা যায়, ভিন্ন সামাজিক অবস্থানের নারী পুরুষ ভিন্নভাবে এই বাহ্যিক পরিসরের অভিজ্ঞতা লাভ করেন। একজন উচ্চবর্ণীয় পুরুষ যেভাবে এই পরিসরে অবস্থান করে একজন নারী সেভাবে করতে পারে না। আবার একজন উচ্চবর্গীয় নারী যেভাবে এই পরিসরের অভিজ্ঞতা পান, সেভাবে ভিন্ন অবস্থানের নারী পান না।
বাহ্যিক পরিসর স্থানিকভাবে শুধুমাত্র নয়, দিনরাতের সময়ের বদলের সঙ্গে বদলায় নিজের চরিত্র। একজন দিনে যেভাবে বাহ্যিক পরিসর ব্যবহার করেন, রাতে সেই একই জায়গায় কে চলাচল করছেন, কতক্ষন চলাচল করছেন তার মাত্রা, ব্যাখা বদলে যায় আমূল। মেয়েরা যে জায়গা গুলোতে দিনে আপাত নির্দ্বিধায় চলাফেরা করে, বিকেল গড়িয়ে সন্ধে নামলে সেই জায়গা গুলোই হয়ে ওঠে অগম্য। দিনে যে যানবাহনে যাতায়াত করে মেয়েরা ইচ্ছামত, সন্ধ্যা বা রাতের দিকে সেই একই জায়গা হয়ে ওঠে ভয়ের কারন। সূর্যালোকে যে রাস্তা গুলো দিয়ে হেঁটে একা যেতে কোনো সমস্যা হয় না, সূর্য ডুবলে অথবা ভোরে সেই সব রাস্তা আর মেয়েদের জন্য 'নিরাপদ' থাকে না। দিনের আলোয় যা নিরাপদ (!) অন্ধকারে অথবা বৈদুতিক আলোয় সেই সব পাবলিক স্পেসের চরিত্র বদলে যায় মেয়েদের জন্য। পারতপক্ষে সেখানে যাওয়া যায় না, গেলে একা নয় যেতে হয় অনেকের সঙ্গে, সঙ্গে পরিবারভুক্ত পরিচিত "বিশ্বস্ত" পুরুষ সদস্য থাকতে হয়, (এই বিশ্বস্ততার যে চরিত্র বদল সেইসব ভয়াল সময়ের পাবলিক স্পেসে হবে না। তার কোনো নিশ্চয়তাও সমাজ দিতে পারে না।) অন্যথায় ঘটতে পারে 'বিপদ', 'দূর্ঘটনা' ইত্যাদি এবং তার পূর্ণ দায়িত্ব নিতে হবে সেই মেয়েটিকেই। পাড়ার বৈকালিক চন্ডীমণ্ডপ থেকে প্রশাসন সকলেই জানাবে- যেতে বারণ করা হয়েছিল, গেছিল তাও। গেছ এখন নিজে সামলাও অথবা সবাই জানে ওদিকে ঐসময় যেতে নেই। তুমি গেছিলেই বা কেন ? বিপদ তো হবারই ছিল। হয়েছে। এই পোশাকে যেতে নেই। পোশাকের জন্য হয়েছে বিপদ ইত্যাদি ইত্যাদি।
হস্টেলে চিরকাল নটার মধ্যে ফিরে আসতে হত আমাদের। পাঁচ দশ মিনিটের দেরীতেও ঘটে যেত রৈ রৈ কান্ড। রাত নটার পরে হস্টেলের বাইরের পৃথিবীটা কেমন, আবছা অন্ধকারে রাস্তা গুলো কেমন দেখায়, আলোর নীচে গাছগুলোর কেমন ছায়া পড়ে, পূর্ণিমার জোৎস্নায় কি মোহময় হয়ে ওঠে চারপাশ, রাতে জীবজন্তু গুলো কি ছুটোছুটি করে খুব বেশি এইসব তৃষ্ণার্ত জিজ্ঞাসা ঘুরে বেড়াত অনেকেরই ভিতরে। রাতের শান্তিনিকেতন কেমন আমরা কোনোদিন দেখিনি। কোনো কোনোদিন বিভাগে অনুষ্ঠান থাকলে নটার পর আধ ঘণ্টা বা এক ঘন্টা পরে ফেরার অনুমতি থাকলে সেদিন খুশির মাত্রা থাকত তুঙ্গে। ছেলেদের হস্টেলে অবশ্য হস্টেলে ফেরার কোনো নির্দিষ্ট সময়ের নিয়ম নেই। রাতদিনের চব্বিশ ঘণ্টা, সমস্ত জায়গার সমস্ত কোনায় তারা নিরাপদ বোধ করে এবং যেতে পারে। প্রশ্নটা সেখানেই, মেয়েদের কাছে পৃথিবীটা স্থানিক ভাবেও যেমন ছোট হয়ে আসে, এখানে ওখানে যেতে নেই ইত্যাদির কারনে আবার সময়ের দিক থেকেও রাতে প্রায় আট দশ ঘন্টা তারা বাইরে আসে না, অন্ধকারে বিপদ আর ঘরের বাইরে 'নিরাপত্তা' নেই এই অজুহাতে।
সর্বসাধারণের ব্যবহার্য প্রতিটি জায়গায় অগম্য, দূর্গম্য 'ভালো' 'খারাপ' সবজায়গায় দিনে চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে যেকোনো সময়ে যাওয়া, সময় কাটানো প্রতিটি মেয়ের অধিকারের মধ্যে পড়ে। তাদের আশংকার কারন কারা? বিপদ, দূর্ঘটনা কারা ঘটায়? কাদের জন্য অনিরাপদ' হয়ে ওঠে কোনো জায়গা? অন্ধকার নামলে অথবা নির্জনে কেন 'ভয়' লাগে রাস্তা দিয়ে যেতে? কোনো কোনো জায়গায় কেন একার থেকে কয়েকজন মিলে যাওয়া নিরাপদ? সমস্যা গুলো আসলে যে বা যারা সেইসব জায়গায় গিয়ে বিপদে পড়ছে তাদের কোথাও নেই, তাদের একফোঁটা দায়িত্বও সেখানে নেই। দায়িত্বটা তাদের যাদের কারনে কোনো জায়গা দিনের আলোয় নিরাপদ থেকে অন্ধকারে অনিরাপদ হয়ে ওঠে, যাদের কারনে বহুমানুষের উপস্থিতিতে গম্য এবং নির্জনে একা একটি মেয়ের পক্ষে অগম্য হয়ে ওঠে। খবরের কাগজে রোজ ‘পাবলিক স্পেস'- সর্বসাধারনের ব্যবহারের জন্য বরাদ্দ জায়গায় ঘটে যাওয়া লিঙ্গহিংসা আর দূর্ঘটনা'র খবর প্রতি দিনই একটা প্রশ্নকে প্রাসঙ্গিক করে তোলে 'পাবলিক' এর জেন্ডার কি? পাবলিক আসলে কারা? পাবলিক স্পেসে সার্বিক গম্যতা কাদের জন্য বরাদ্দ?
---------
মধুপর্ণা কর্মকার। বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র। বর্তমানে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে মানবীবিদ্যা চর্চাকেন্দ্রে গবেষণা করেন। লিখেছেন - ' গার্লস হস্টেল ; আবাসিক নারীর মানসভূমি।'(২০১৮)
তাঁর ব্লগ লিঙ্কে প্রবেশ করুন
তাঁর লিঙ্কট্রি লিঙ্কে প্রবেশ করুন
মধুপর্ণার গত সংস্করণের লেখা পড়ুন

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন