চতুর্থ বর্ষ ।। চতুর্থ ওয়েব সংস্করণ ।। ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩০ ।। ০৫ জুন ২০২৩
ইদানিং সমস্ত রাজনৈতিক দলেরই এক শ্রেণীর নেতাদের শিষ্টতা ভুলে যাওয়ার একটা প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। মাঝে মাঝেই এই ঘটনা চিন্তিত করে তুলছে মানুষকে। বিশেষ করে যে মানুষগুলো একটু শান্তিতে বাঁচতে চায় নিজের পরিবার পরিজন নিয়ে।
তাদের এই অশিষ্ট নেতাদের সঙ্গে লড়াই করার বা তাদেরকে সরাসরি কিছু বলার ক্ষমতা নেই। নেই নিজেদের সন্তানদের এইসব নেতাদের দ্বারা দূষিত পরিবেশ থেকে দূরে সরিয়ে রাখার ক্ষমতা। তাহলে কি এই প্রবণতা চলতে থাকবে? দীর্ঘায়িত হতে থাকবে অশিষ্ট এইসব নেতাদের আস্ফালন?
সাধারণ মানুষের এই ব্যথার উপশম হতে পারতো, যদি প্রশাসন তৎপর হতো। এদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্ৰহণ করতে পারতো। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, আমাদের রাজ্যের, শুধুমাত্র রাজ্য বলবো কেন, আমাদের দেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থার উচ্চ পোস্টে বসে থাকা কর্মকর্তারাও সামান্য কিছু চাওয়া পাওয়ার বসে বশীভূত হয়ে এই মুর্খ নেতাদের পদলেহন করতেও পিছুপা হন না। যদিও এই কর্মকর্তারা নিজের যোগ্যতা বলে সেই উচ্চাসনে প্রতিষ্ঠিত করেছেন নিজেদের।
এঁদের কেউ না কেউ এগিয়ে এসে এই অশিক্ষিত নেতাদের, মুর্খ নেতাদের, স্বার্থান্বেষী নেতাদের কলার চেপে ধরলে জীবনভর সাহস পেত না এমন অশিষ্ট কথাবার্তা উচ্চারণ করার। আর এই পদক্ষেপ যত তাড়াতাড়ি নেওয়া যেত ততই মঙ্গল। কারণ দিন গড়িয়ে যাওয়ার সাথে সাথে তাদের লাগামছাড়া মনোভাব আরও বেশি বৃদ্ধি পাচ্ছে। যার ঢেউ গিয়ে আঘাত করবে প্রশাসনিক কর্তাদের পরিবারের ওপরেও। তখন কি ক্ষমা করতে পারবেন নিজেদের?
মনে রাখা দরকার, আগুন কাউকে চিনে চিনে পোড়ায় না। ঝলসে দেয় বুদ্ধিমান, ক্ষমতাবান, এবং অতি সতর্ক ব্যক্তিকেও।
উত্তম মাহাত, সম্পাদক
______________________________________________
যাঁদের লেখায় সমৃদ্ধ হলো এই সংস্করণ
______________________________________________
সুমন বন্দ্যোপাধ্যায় / সুশান্ত সেন / দুর্গা দত্ত / বেণু মাহাত / অঙ্কন রায় / সুনীতি গাঁতাইত / রামানুজ মুখোপাধ্যায়
______________________________________________
সুমন বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতা
অলিখিত_১
এইসব অপর্যাপ্ত আলো
তোমার ছায়ার নিচে বসে বিশ্রাম নেয়
আমাদের সান্ধ্যযাপন
নিভু নিভু হ্যারিকেন হাতে
মাঠ থেকে ফিরে আসে
যেসব অনুচ্চারিত শব্দ
আমি তাদের কাছে দায়বদ্ধ নই কোনভাবেই
ইচ্ছে করে না লিখতে
নদী পেরিয়ে গান উঠে আসছে
আর জোনাকি জ্বলছে তোমার নাভিতে।
অলিখিত ২
শুকনো শালপাতা ওড়ে দিগন্তের নিচে
মধু বালিকার মতো মেঘ
সমস্ত সন্দেহ
তুমিও পেরিয়ে এলে
খুলে যায় অমোঘ আড়াল
নিরবধি দূর কাঁটাবন
হরিণীর জল ভেঙে ভেঙে
তোমাকে ছড়িয়ে দেবো সামান্য লেখায়
নিভে যাওয়া আগুনের দিকে।
সুশান্ত সেনের কবিতা
১.
পালানো
প্রাণ নিয়ে দৌড়ে দৌড়ে কোথায় পালাবেন ?
সব রাস্তা ত বন্ধ।
বন্ধ রাস্তার দু পাশেই প্রহরী
ওত পেতে আছে।
বাজিয়ে যাচ্ছে পাগলা ঘন্টা
একটু সন্দেহ হলেই।
পাগলা ঘন্টা কি কেবল
পাগল'রাই বাজায় !
না ঘণ্টার ভেতর লুকিয়ে থাকে
পিতৃপুরুষের যুগ যুগ ভরা
না - পাওয়া বেদনার কথা।
দৌড়ে দৌড়ে কোথায় পালাবেন মশাই ?
২.
নিমন্ত্রণ
কবিতা ব্যাঙ ও গোধূলি একাকার করে
সূর্যটা ডুবে গেল।
তখন সব পেয়েছির আসরে নামল
করাঘাত।
কে কে বাড়ি আসেনি তার হিসেব নিকেশ
করতে দেখা গেল
রসগোল্লা কম পড়িয়াছে।
তখন রসগোল্লার খোঁজে ময়রার দোকানে
পৌঁছে গেলাম,
কিন্তু ময়রা'কে পাওয়া গেল না।
ময়রা তার শস্রুমাতার আহ্বানে নিমন্ত্রণ
খাইতে গিয়াছে।
দুর্গা দত্ত-র গুচ্ছ কবিতা
১.
আলোর মা
বলতে গিয়েই থমকে গিয়ে দাঁড়ালো দক্ষিণে
অনেকদিন ঘর দেখেনি অনেকদিন সিঁথি
শূন্য নয় শুধু, সে তো হারিয়ে যাওয়া জিরেত
মনে পড়লো, বলতে গিয়ে, ছিল আলো- র বাপ।
ঘর ছাইত অন্য লোকের, নিজের চালে খড়
জোগাড়যন্ত করলে খেতো কালবোশখির হাওয়া—
বলতে গিয়েই দু'চোখ জুড়ে পান্তা ভাতের থালা,
সঙ্গে ঈষৎ নুনের ছিটে নরম রোদ শীতের …
আঁচল কোথায় ? আঁচল ভেজে অচেনা কোন রোগে
দুচোখ জুড়ে শীতের হাওয়া দরমা বেড়ায় খেল
চোখ বুজলেই স্বপ্নে ওঠে সবজি চাল ডাল
ঘুম ভাঙলেই উঠোন কোথায় খোঁজে উতল বুক !
অনেক দিন ঘর দেখেনি, দখিন খোলা মাঠ
অনেক দিন হারিয়ে গেছে আলোর মা'র জিরেত…
২.
মনকেমন
কুড়িতে ভেজানো মহুল , সঙ্গে গুড় , বাখরও মেশানো —
হাড়িভর্তি উনানে বসায়
মতি বাউরি
সেই কবে পুবে গিয়ে অকালবিধবা ----
নল বেয়ে ফোঁটা ফোঁটা নেশা ঝরে যায়
অন্য এক মুখঢাকা হাড়ির ভেতরে
ঘরের ভেতরে গেলাসে গেলাসে কিছু মুখ দিয়ে মহুলে মহুলে বুঁদ মতিকেও পান করে কেউ কেউ কখনো সখনো
মহুলসুন্দরী মতি গেলাস বাড়িয়ে দিয়ে
টুসু গান ধরে —
মা গো আমার মন কেমন করে
যেমন শোল মাছে হুপাল মারে
মা গো আমার ……
৩.
এলোকেশী সংবাদ
বেগুনকোদর থেকে বুধপুরে
জাগ্রত বাবা বুদ্ধেশ্বর
কোল আলো করবে বলে মানসিক করেছে বাঁজা বৌ
সারারাত গর্ভগৃহে একা একা
ভোরে উঠে ডুব দণ্ডিকাটা
প্রসাদী ফলমূলে ভরে পেট , গর্ভে হাহাকার
পুরুতের নির্দেশে
এই কমাস রা-কাড়া বারণ , গর্ভগৃহে পড়ে থাকা বাবাকে জড়িয়ে --
যদ্দিন না গর্ভে বীজ আসে !
চোখের তলায় কালি বাড়ে ।
সুয্যি ওঠে সুয্যি ডোবে , চাঁদ ছোঁয় ত্রিশূলের ডগা
বাঁজা বৌ দিনরাত পড়ে থাকে গর্ভগৃহে পাথর জড়িয়ে ….
বীজের আশায়
৪.
পুষ্পমালারা
মাথায় বোশেখ
ব্রতের উঠোনে গর্তে পুণ্যিপুকুর
আঙুল ডোবানো জল , পোতা আছে ভাঙা বেলডাল
পুষ্পমালা-রা আসে
ডালে ডালে কাঁটায় কাঁটায় টগর সাজায়
কাঁটা লুকোনোর খেলা
বৃষ্টিহীন
সারাটা জীবনে
৫.
ভোট পরব
গেল তো গেলই
ফেরবার নাম নাই
ভাত আর শাকসেদ্ধ জুড়িয়ে জুড়িয়ে কাদা
সুয্যিও পাটে নেমে গেল
ও বৌ দেখ্ দেখি
কুলহির মুড়ায় এত কীসের ভাসান ! এত আলো !
ফুল দিয়ে কাকে বা সাজালো ! কীসের গাজন ?
নুনু কি উখানে আছে ? বৌ উঠে দেখ্
বৌ দেখে
ভোট দিতে গিয়ে খাটে শুয়ে শুয়ে ফিরে আসছে ঘরে
ফুলে ফুলে ঢাকা তার গোঁয়ার মরদ ---
আশে পাশে অচেনা দরদ ।
বৌ এর মরদও যেন ভিন্ দেশী লোক
ভোটের বাজারে যেন নামী দামী কোনো সিনিমা আটিস্ ---
সন্ধ্যা নামে ডালে ডালে কুলহির মুড়ায়
সন্ধ্যা নামে বৌ এর আঁচলে —
সন্ধ্যা নামে নুনু-দের দুয়ারে দুয়ারে…
৬.
দ্রৌপদী : এক
দ্রৌপদীর ঘুম আসে না
থানকাপড়ের মতো ফটফট্যা চাঁদের আলোয়
দেখতে পায় তার বুঢ়া নুনু
লং খাওয়াচ্ছে ডাগর ' সাড়া ' -কে ,
কান ম'লছ্যে লুকিয়ে লুকিয়ে।
রাগ বাড়াতে হব্যেক যে !
কাল মুরগা লড়াই ।
সাঁঝশেষে ফিরে আসছে বুঢ়া নুনু
কোল খালি ….
গামছায় হেড়্যার গন্ধ
দ্রৌপদীর চোখে নামে বর্ষার কাঁসাই —-
৭.
দ্রৌপদী : দুই
নিম আর বেগুন নিয়ে দিন কাটে দ্রৌপদী বাউরির
শুকনো ডোবার পাশে
আরও শুকনো ছোট নিমগাছে
তেলমেখে টকটকে চকচকে লাল হয়ে বসে আছে দ্রৌপদীর কচি কচি নিম ---
উঠানের একপাশে ছাইপাশ খেয়ে খেয়ে
কাঁটা বেগুনের ঝোপ দ্রৌপদী বাউরির দিকে
একদৃষ্টে চেয়ে থাকে বিহানবেলায়
দ্রৌপদী ঢেঁকুর তোলে
জামবাটিতে ঢকঢক জল
৮.
দ্রৌপদী : তিন
সজনে গাছ —
দ্রৌপদীর সন্যা গাছ আছে
সন্যা গাছে সন্যা ফুল
সন্যা খাড়া সন্যা শাগ
ইবছরের চৈত ব'শ্যাখে গাদা ……
দুজ্জোধনের মা এর কাছ থেকে একটু বাটনা আর
বাড়িধারের কাঁটা বেগুন দিয়ে সন্যা ফুল
খাড়া দিয়ে নিমপাতা ,
সন্যা শাগ সিজা …….
সকাল সকাল বাঁধ যায় দ্রৌপদী ,
আজ দু'ডাল শামুক তুললেই ব্যাস !!
ভাতও জুটবেক আর
সন্যা শাগে কমবেক
পায়ের ফুলাটাও —-
সারাবছর ধরে
চৈত-ব'শ্যাখের স্বপ্ন দেখে দ্রৌপদী।
৯.
দ্রৌপদী : চার
খেজুর গাছটা কামাতে কামাতে
এ্যাকেবারে বুঢ়া লোকের গলা ---
ইবার ফঁটা ফঁটা ঝ'রব্যাক ।
নুনু ! আর কামাস না বাপ , নাম ।
দ্রৌপদীর চোখে অঘ্রানের বিকেল
দ্রৌপদীর চোখে উবছরের শেষ ঢোঁক
নুনুর বাপের …..
১০.
দ্রৌপদী : পাঁচ
কাঁচা হলুদ ঝিঙাফুল দেখে গায়েহলুদের কথা মনে পড়ে দ্রৌপদীর ----
এখন নুনু'র-ই হলো দুকুড়িপাঁচ
দ্রৌপদীরও মাথা জুড়ে তিনকুড়ির শননুড়ি ফুরফুরে হাওয়ায়
ঝিঙাফুলে ঝিঙা হয় , পোস্ত আর ইচলি মাছও হয়---
ঝিঙাফুল দেখে আর
দ্রৌপদী বাউরির জিভে
টলটল করে
কাঁসাইয়ের গান …...
১১.
জামতলের সেরেঞ
বুধনির
চোখের তলায় কালি, ভেজা ভেজা
হাঁটা চলা কিছুটা মন্থর
জামতলে বাঁধা সারাদিন
ঘাসে ও জাবনায়
বুধনি গাব্বিন গাই , এই- বিয়োলো বলে
এড়ুয়্যাল টসটস করে, ভারি
বোঁটায় টনটন
বুধনিকে আদর করে ছোট বৌ সকাল বিকাল
বকনা হ'ল্যে ' ফুলকি ', তার গলায় ঘুঙুর, আর
এড়্যা হ'ল্যে যা হোক একটা ---
কত কী যে ভাবে ছোট বৌ জামতল জানে
বুধনির এড়ুয়্যালে হাত , শিরশির করে জামতল
ছোট বৌ-এর বুকেও টনটন —
দাওয়ায় ঠেস দিয়ে শাশুড়ির ভেজা ভেজা চোখ।
তিন বছর হ'ল্য ছোট বৌ-এর তবুও …
জামতলে মেঘ নেমে আসে
ফোঁটায় ফোঁটায়
বুধনির পিঠ ভিজে যায়
বেণু মাহাত-র কবিতা
১.
ভাঙন
সন্ধ্যে হলেই মানুষ থেকে গাছ হই।
ডাল পালা গুটিয়ে মাটি আঁকড়ে
শান্ত হই।
নুন - তেলের কথা তখন মনে থাকে না।
সমুদ্র ঝাপসা হয়ে আসে,
পাহাড় ভেঙে টুকরো টুকরো হয়।
তারপর মৃত্যু হয়...
কাকভোরে আবার মানুষ হই।
২.
রূপান্তর
আলো দিতে দিতে একসময়
চাঁদও নিষ্প্রভ হয়,
দিনের মাটি-পাথর রহস্যময় হয়ে ওঠে।
চোখের সামনে পাহাড় জঙ্গল পুণ্য সঞ্চয় করে।
মেঝের উপর জলের দাগ,
ফিনাইলের শিশি গড়াগড়ি খায় -
জীবনের আক্ষেপ গুলো শিল্প হয়ে ওঠে।
অঙ্কন রায়ের কবিতা
১.
সুরের আগুন
আমি তো তোমার শুধু তোমার কাছে
চেয়েছি আমার গানে প্রেমের মালা!
তুমি তা একটুকু দাও, একটুকু দাও,
সে দানে হবেই আমার জগৎ আলা!
আমি তো সুরসোহাগের পথ বেয়ে ওই
পৌঁছে যাবই জানি তোমার মনে।
তুমি কোন্ উজান বেয়ে হারিয়ে ফেরো
থেকে যাও আমার বিজন বুকের কোণে!
আমি তো কতই গানে রাত পেরোলাম
ভোরের ওই সোহাগ মাখা অন্তঃমিলে
তোমাকে যত্নে রাখি, তাই তো শুনি
'তুমি যে সুরের আগুন লাগিয়ে দিলে!!'
২.
ছুঁয়ে থাকা
এক
সে বলে গিয়েছে চলে যাও দূরে সরে ।
কোনওমতে নয় কাছাকাছি বসে থাকা।
মনে মনে বলি এই তো পাশেই আছি,
হৃদয়তুলিতে অলীকের ছবি আঁকা!
সে বলে গিয়েছে আরও দূরে দূরে যাও।
ছুঁয়ো না ছুঁয়ো না, স্পর্শে অসুখ বাড়ে।
লিখে রাখি তাই ডায়েরির পাতা জুড়ে
ভালোবাসা আছে মনকেমনের পারে।
সে বলে গিয়েছে যদি ছুঁয়ে থাকো দোঁহে
মরণের মেঘ ছুটে আসে দলে দলে।
সে তো জানে নাকো বেঁচে থাকা এও নয়,
সরে থাকা বুঝি জীবনের কথা বলে?
দুই
আমার ভালোবাসার বারান্দাটায় শূন্য লেগে আছে।
জানিস দিনের পরে দিন কেটে যায় ধূ ধূ মরুর আঁচে।
আমি ছুঁইনি তোকে যুগযুগান্ত, হয়নি চোখের দেখা।
তুই কেমন করে বলতো, আমি থাকবো একা একা !
সেদিন পাখপাখালির পরশ লেগে রংবাহারি ভোর,
দেখি সোনার রোদে খুললে পরে দিগঙ্গনার দোর...
হাসে উল্লসিতা পৃথ্বী, তবু মড়ক লাগার ধাঁচে
আমার আদরছোঁয়া বারান্দাটায় শূন্য লেগে আছে।
আমার ভালোবাসার বারান্দাটায় শূন্য লেগে আছে।।
তিন
তোকে ছুঁয়ে থাকি যতদিন বেঁচে আছি।
নিঃসৃত প্রেম শরীরে শরীরে মেশা।
তবু দূরত্ব কত যুগ ঘিরে থাকে
সে হিসেব নিলে ছুটে যায় কালনেশা।
তোকে ছুঁয়ে থাকি যতদিন কবিতারা...
নিঃশেষ হতে বাকি আছে আরও কিছু।
অধরে অধর, চুম্বন- জর্জরে...
এখনও যাইনি নরকের পিছু পিছু।
তোকে ছুঁয়ে থাকি, থাকবো অশেষকাল।
দূরত্ব নয় আনবিক সংঘাতে।
তোকে ছুঁয়ে থাকি, না ছুঁলে মিথ্যে বাঁচা...
ধরা পড়ি প্রতি নিকষ কালোর রাতে।।
পীড়িত
সুনীতি গাঁতাইত
দহন সুখ ফেরী করে যাই,
কেউ নিলে আগুন হতে পারি
ঈশ্বর জানেন চিতায় কি সব শেষ হয়!
এই অবধি দৌড় শেষ, দিচ্ছে মানুষ হামাগুড়ি।
যম টানছে জীবন আর জীবন
চায়ছে অনিঃশেষ পরমায়ু।
রাঙাধুলোর পথে-পথে, হারানো আখরের সন্ধানে
রামানুজ মুখোপাধ্যায়
কাজ করতেন খনিতে। পড়াশুনো ইশকুলের গণ্ডী পেরোয়নি। জন্ম ১৯৫৩-র গোড়ায়, বীরভূম জেলার লোকপুরের কাছে ভাড্ডি গ্রামে। শিল্পী নারায়ণ কর্মকার। তিনি নিজেই গেয়েছেন এই গান: ‘আমি জাতে কামার/ দেখতে কালো/ খাদে খেটে খাই/ মাঝেমধ্যে ডাকলে লোকে/ দু-চারটে গান গাই’। দারিদ্র্যকে দু-চোখ ভরে দেখেছেন। তাঁর গানে উঠে আসছে সেই দুঃসহ জীবনের কথা। তিনি খোলা গলায় গেয়েছেন:
আমদেরই রক্ত-ঘামে ঘুরছে কুলি চাকা
কয়লা বোঝাই উঠছে ডুলি গুণছে বাবু টাকা
আমাদের জীবনের দাম নাই
তবুও খাদেই খাটতে যাই
বুকের ভিতর ভুমা বাজে সাথিহারা দুখ।
আমরা খাদে খাটা লুক
আমাদের পাথরপারা বুক।
গ্রামবাংলার প্রকৃতি-পরিবেশ যাঁদের কাছে ‘দূরতর দ্বীপ’-এর মতো, তাঁদের শ্রুতিকে কি এ-সব গান কখনো স্পর্শ করতে পারবে? কেমন করে একটি লোকগানের জন্ম হয়, তার কোনো ব্যাকরণ নেই। তত্ত্বজ্ঞানী মহাজন সে-পথের হদিশ জানেন না! আমাদের মতো ধুলিধূসর পথিকেরা মাটিমাখা গানেরই ভিতরে পেয়ে যায় সেই বারামখানার সহজ সাকিন। যেমন এই গানটিতে আছে সেই জন্মকথা:
এই বাংলার গাঁয়ে গাঁয়ে আমি সুর পেয়েছি
চলতি পথে ওঠা-নামায় তাল পেয়েছি
এই কালো কালো মানুষ যারা
হাঁটুর উপর কাপড় পরা
তাদেরই বুক ছুঁয়ে আমি কথা পেয়েছি
কত সহজ এই উচ্চারণ। এ-কথাগুলি-যে উঠে এসেছে শিকড় থেকে। বাবা গোপাল কর্মকার, মা যামিনী দেবী। নারায়ণের বাল্যকাল কেটেছিল দুঃসহ অনটনে। কামারশালায় হাতুড়ি পিটিয়েছেন, বিড়ি বেঁধেছেন। ছোটোবেলায় মুখে-মুখে ছড়া কাটতে পারতেন। গ্রামের ইশকুলে ক্লাস সিক্সে পড়ার সময় থেকে লেখালিখির শুরু। গল্প-উপন্যাস-গদ্য-কবিতাও লিখেছেন তিনি। আর বেঁধেছেন সহস্রাধিক গান। সে-সব গান রেকর্ড হয়েছে, প্রচারিতও হয়েছে আকশবাণী কলকাতা কেন্দ্র থেকে। তাঁর গানের একাধিক মুদ্রিত সংকলন আছে। ‘হৃদয়পুরের গান’ (২০১১) গ্রন্থে সংকলিত নারায়ণের এই গানটি চিরস্মরণযোগ্য:
কিবোর্ডে বাজছে একতারা
এখন লাউ লাগালে বাঁদরে খায়
বাঁশেরও তো দর চড়া।
বাউল এসে মঞ্চে ঢুকল
ছেড়ে আটচালা
প্যান্ডেলে মাইক বিজলিবাতি
অ্যালকোহল ঢালা
বাউল হল ফেরিওয়ালা
বিদেশিনীর ঘর করা।
কিবোর্ডে বাজছে একতারা।
... ... ...
বাউল ঢুকল চাকতির ভিতর
সিডি বলছে যাকে
বাউলপারা যন্ত্র মেশিন
মিডিয়া দর হাঁকে
বাংলার বাতাসে বাউল
উড়ছে কাপাস তুলোর পারা।
কিবোর্ডে বাজছে একতারা।
এ-গানের শেষে যে তুলোর উপমাটি আছে, এককথায় তা তুলনাহীন। নাগরিক জনজীবনের কাছে লোকসংগীত আজ বিনোদনের সামগ্রীমাত্র, হালকা হাওয়ায় সতত উড়ছে। চারদিকেই বাণিজ্য, বিপণন আর প্রচারের আলো তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। কোথাও ঘূর্ণিস্রোতে তলিয়ে যাচ্ছে জীবনের নানা জটিলতা। সহজ হওয়া এখন আর সহজ নয় তত। লোকগান কি সেই জটিলতর আবর্তগুলিকে ধরতে-ছুঁতে পারে? সিউড়ি বিদ্যাসাগর কলেজের ছাত্র লিয়াকত আলি গত শতকের সত্তরের দশকে বেছে নিয়েছিলেন ফকিরের জীবন। চেনা যাপনের ছককে তিনি আজীবন ভেঙে দিতে চেয়েছিলেন। দুবরাজপুরের ফকিরডাঙায় ছিল তাঁর বসত। কবিতা ছিল সারস্বত সঙ্গী। লিখেছিলেন ফকিরি গান। বাউলের বারামখানায় ছিল তাঁর সহজাত সঞ্চরণ। তাঁর ‘বাউল ও বিদেশিনী’ প্রবন্ধটি দুবরাজপুরের ‘চণ্ডীদাস’ পত্রিকায় ছাপা হওয়ার পর ছড়িয়ে পড়েছিল দূরের পাঠকদের দরবারে। বহু বিদগ্ধজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। ২০১৭-র নভেম্বরে, মৃত্যুর আগে, সম্ভবত এইটিই ছিল তাঁর লেখা শেষ গান:
পৃথিবীতে নেমেছে এক রঙিন অন্ধকার
চাঁদের গোলার ’পরে নাচে ব্যবসাদার . . .
বাজারি রাস্তা তিপান্ন গলি
পেত্নীতে পায় শ্রদ্ধাঞ্জলি
মদমত্ত খরচের কেলি
ভোগের খরিদ্দার।
পৃথিবীতে নেমেছে এক রঙিন অন্ধকার।
এ গান আর ‘জীবন মাঝে সহজ’ হতে চায়নি। আমাদের যাপনের নিরুপায় অসংগতিগুলিকে হাট করে খুলে দিতে চেয়েছে সর্বজনের মাঝে। নিজের গানগুলিকে চিহ্নিত করতে চেয়েছে ‘লিয়াগীতি’ নামে। সংকলিতও হয়েছিল তাঁর কিছু গান, ভূমিকা লিখেছিলেন সুখ্যাত বিদ্বান সুধীর চক্রবর্তী। কিন্তু বইগুলি সেভাবে প্রচার পায়নি। এভাবে অসময়ে চলে না-গেলে, কোথায় গিয়ে থামত লিয়াকতের কলম, ভাবতে ইচ্ছে করে!
বোলপুর থেকে পথ চলে গিয়েছে লাঙলহাটা, গুনুটিয়ার দিকে। সে-পথে লাভপুর থেকে একটু এগিয়ে বাকুল চৌরাস্তার মোড়ে পাকা সড়কের গায়ে চায়ের দোকান দিয়ে রুটিরুজি শুরু হয়েছিল গৌরগোপাল পালের। ১৯৫৪-র ২৫ ফেব্রুয়ারি তাঁর জন্মদিন। প্রথাগত পড়াশুনো বেশি দূর এগোয়নি। বিচিত্র তাঁর জীবন-অভিজ্ঞতা। করেছেন সেচ দপ্তরে খালাসির কাজ। ঘুরেছেন পথে-প্রান্তরে। ধনডাঙার কার্তিক দাস বাউল, সিউড়ির স্বপ্না চক্রবর্তীরা যেমন তাঁর গান গেয়েছেন, তেমনি গাঁঘরের প্রান্তজনের কণ্ঠের মাধুর্য ছড়িয়েছে তাঁর গান। তিনি লিখেছেন:
সর্ষের কাছে ওল জব্দ
মেয়ের বাবা পণে জব্দ
সবরকমের শব্দ জব্দ
অভিধানের পাতে।
নারীর কাছে পুরুষ জব্দ
কী দিনে কী রাতে।
এ-গান যেন লোকজীবনের প্রবাদে পরিণত হওয়ার সামর্থ রাখে। সজাগ তাঁর সমাজদৃষ্টি। বিশ বছর আগেই তাঁর ভাদু গেয়ে উঠেছিল: ‘ভাদু বাঁচি না আর পরানে, দেখেশুনে দেশের হাল/ নব্বই টাকা পোস্তর কিলো, ছ-টাকা সের ভাতের চাল’। এইসব গানে মুখ লুকিয়ে আছে আমাদের সামাজিক ইতিহাসের ছিন্ন সূত্রগুলি। বীরভূমের রুক্ষ মাটির দেশে বয়ে চলেছে নিরন্তর এই লোকসুরের ধারা। তারাই আমাদের আরশিনগরের পড়শি। আমরা কতটুকুই-বা সেইসব গীতিকারদের খোঁজখবর রাখি। দারিদ্র্যের দুঃখ ভুলে কণ্ঠশিল্পীরা আর অন্ধকারের অন্তরালে মুখ লুকিয়ে নেই। বাঁধা মঞ্চে এসে পড়েছে প্রচারের আলো। অথচ, গীতিকারদের প্রতি আমাদের বিস্মরণ আজ বাড়তে-বাড়তে আকাশ ছুঁয়েছে। বাঁধনহারা সময় তাই লোকগানের হারানো আখরগুলিকে সযত্নে তুলে নিয়েছে তার আঁচলে। আমরা যেন নিজেদের প্রয়োজনেই তাদের যত্ন-আত্তি করি।
[ব্যক্তিগত ঋণ: শ্রদ্ধেয় শ্রীপ্রবীর দাস। লেখাটি অংশত মুদ্রিত হয়েছিল ‘১৪০০ সাহিত্য’ (২০১৯) পত্রিকায়।]
______________________________________________
আগের সংস্করণের পাঠ প্রতিক্রিয়া
______________________________________________
১/ অসাধারণ ছবি গুলো। মনে হচ্ছে যেন রঙ তুলিতে আঁকা।
--------------সীমা মাহাত
২/ অসাধারন ভাবে সাজিয়েছেন ছবিগুলো।সামান্য একটা ধন্যবাদ দিয়ে আপনার শিল্পীমনকে বিড়ম্বিত করলাম না।ভালো থাকবেন, আর বিভিন্ন শিল্পীমনকে পথ চলার পাথেয় জুগিয়ে যাবেন।
------------আলোকচিত্র শিল্পী জয়দেব চক্রবর্তী
৩/ কবি দুর্গা দত্তের কবিতা ভালো লাগে।
এখানে মা সিরিজের কবিতাগুলো বেশ সুন্দর,টানছে আমায়।
বেশ পরিণত কবিতা।
ওনাকে শুভেচ্ছা জানাই।
---------------কবি পঙ্কজ মান্না
৪/ অপূর্ব সুন্দর ফোটোগ্রাফি।👌👌👌
ঝড়ের ছবিগুলি আতঙ্ক জাগায়।
---------------কবি সুনৃতা রায়চৌধুরী
৫/ এই সংখ্যায় দুর্গা দত্তের কবিতা এবং অমিত মন্ডলের কবিতা খুবই ভালো। পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতা ছুঁতে পারলেও ধরতে পারছি না। তবে বলা যায়, তার কবিতা গতানুগতিক নয়।
--------------কবি নির্মল হালদার
৬/ সব কবিতাই বেশ ভালো। দুর্গা দত্ত-র মা সিরিজ অনবদ্য। ময়ূখ দত্ত-র লেখা থেকে অনেক কিছু জানা গেল।
--------------কবি অমিত মণ্ডল
৭/ ভীষণ সুন্দর অনেক ছবি দেখে এলাম। কিছু জেনেও এলাম।
--------------অরণ্যানী অরণ্যানী
৮/ যাহা দেখি চোখ দিয়ে মন দিয়ে নয়।
সেই দেখা দেখ তুমি
অতলে গভীরে নামি,
জগৎ মাঝারে তাহা বর্ণছটা ময়।
ক্ষণিকের পৃথিবীতে আছে যত লেখা
জলে কিছু, স্হলে কিছু
ছুটে যাও পিছু, পিছু,
দেখাও আঙ্গুল দিয়ে শতেক অদেখা।।
শুভেচ্ছা সহ বন্ধু হিরণ্ময়।
-------------- কোনো এক পাঠক ছবি সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন ব্লগ পেজে
৯/ আমার খুবই পরিচিত, ছবিতে বাঁধানোর সূত্রে। যখন জানতে পারি তাঁর শিল্প কর্মের কথা ও দেখেতে পাই, তারপর আমার কাছে উনি অন্য জগতের মানুষ ও অন্য সন্মানের জায়গাতে আছেন। ওনার কাজ সম্মন্ধে মন্তব্য করা আমার পক্ষে ধৃষ্টতা হবে। খালি, চোখ ভরে দেখি, সেটাই আমার আনন্দ ও আরো যেন দেখতে পাই।
🙏 আমার আন্তরিক ভালোবাসা, শুভেচ্ছা ও শুভকামনা রইলো।
-------------- কোনো এক পাঠক ছবি সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন ব্লগ পেজে
১০/ চমৎকার সব লেখা। দুর্গা দত্তের কবিতার কাছে নতজানু হয়ে বসলাম....
-------------কবি সুজন পণ্ডা
______________________________________________
আমাদের বই
সম্পাদক : উত্তম মাহাত
সহায়তা : অনিকেতের বন্ধুরা
অলঙ্করণ : আলোকচিত্র, বাপি কর্মকার
যোগাযোগ : হোয়াটসঅ্যাপ - ৯৯৩২৫০৫৭৮০
ইমেইল - uttamklp@gmail.com



















বাহ! বেশ কিছু ভাল কবিতা পড়লাম। লোকগানের প্রবন্ধটিও মনকে টানল..
উত্তরমুছুন