চতুর্থ বর্ষ ।। দ্বাদশ ওয়েব সংস্করণ ।। ৭ আশ্বিন ১৪৩০ ।। ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৩
শুধুমাত্র পুরুলিয়া বা পশ্চিমবঙ্গ নয়, সারাদেশেই জাতি বিবাদ এবং ধর্ম বিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। পরিস্থিতি এমন দিকে গড়াচ্ছে যা অত্যন্ত ভয়ঙ্কর। আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে আমরা এই জাতি বিবাদ এবং ধর্ম বিবাদের কোন্ ভয়ংকর আগুনে নিক্ষেপ করে যাচ্ছি, তা ভাবলেও গা শিহরিত হয়ে ওঠে। আমরা কি সত্যি সত্যিই তাদেরকে সুরক্ষিত করে যাচ্ছি? নাকি সুরক্ষিত করার নামে আরও বেশি করে বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছি?
ভোটব্যাংকের রাজনীতি করতে গিয়ে ভারতবর্ষের প্রতিটা দলই শুরু করেছে তোষণ নীতি। যার ফলস্বরূপ জন্ম নিচ্ছে জাতি বিবাদ, ধর্ম বিবাদ, কর্ম সংকট এবং অর্থনৈতিক চরম সংকট।
কর্ম সংকট এবং অর্থনৈতিক সংকট ঢাকাতে রাজনৈতিক দলগুলো আরও বেশি করে ভুলভাল নীতি প্রণয়নের দিকে এগোচ্ছে, যাতে তাদের দোষগুলোকে আড়াল করা সম্ভব হয়। ধোঁকা দেওয়া যায় পাবলিককে। আর তাদেরকে বাঁচাতে বদ্ধপরিকর তেল মারা মিডিয়াগুলোও নিজেদের কর্তব্য ভুলে কেবলমাত্র তাদেরই জয়গান গেয়ে চলেছে সবসময়। তারাও পালন করে চলেছে দলের মুখপাত্রের ভূমিকা। এহেন পরিস্থিতিতে কোন্ দিকে এগোবে দেশ? নিশ্চয়ই শান্তির দিকে না। বিশ্বশান্তির বাণী ছড়ানো এক, তাকে বাস্তবায়ন করা আরেক। তাই বিশ্বশান্তি আমাদের কাছে অধরাই থেকে যাচ্ছে এখনও।
দলতন্ত্রের এই দ্বিচারিতা পাবলিক ধরে ফেললেও তাদের কাছে নতুন করে কিছু বিকল্প নেই। শেষ পর্যন্ত তাদেরকেই জেতাতে হবে। তাদের সঙ্গেই থাকতে হবে। তাদেরকে নিয়েই চলতে হবে। এর চেয়ে কষ্টদায়ক আর কী হতে পারে, বলতে পারেন কেউ?
উত্তম মাহাত, সম্পাদক
______________________________________________
যাঁদের লেখায় সমৃদ্ধ হলো এই সংস্করণ
______________________________________________
গৌতম দত্ত / ডরোথী দাশ বিশ্বাস / তৈমুর খান / গীতশ্রী সিনহা / বেণু মাহাত / নিমাই জানা / রামানুজ মুখোপাধ্যায় /
______________________________________________
উড়িয়ে ধ্বজা অভ্রভেদী রথে
গৌতম দত্ত
কতদিন যে ঝড় ওঠেনি
দিনান্তের রঙ নিয়ে আকাশে
আবিরের মতো লালধূলো
ধূলোয় উড়ছে এঁটোপাতা
স্বর্গ নরক
তবেই তো ধারাস্নানে
স্নিগ্ধ হয় মাটি
চরাচর
কবে যে দেখতে পাবো আবার
কবে যে
ডাকের সাজের মতো
রামধনু উঠবে আকাশে
ডরোথী দাশ বিশ্বাসের কবিতা
১.
ঘুঘুর বাসা
সাঁইত্রিশটি বসন্ত প্রতিকূলতার সাথে ফুল ফুটিয়ে ক্লান্ত হলো পলাশ গাছ
এলো শরৎ
নীলকন্ঠ পাখিটিকে ডেকে বললো,
যাও উড়ে---
মাঝে নীল হ্রদের জল ছুঁয়ে ওপারে
যেখানে ঝাঁ চকচকে বহুতলে আঁক কষে লাভক্ষতির বিচারে মগ্ন সভাসদগণ।
নিয়ম নীতির ধার ধারলে আখেরে ক্ষতি।
পলাশ গাছ আর পারে না।
ফুল ফোটানোর মেয়াদ শেষ।
এসব দেখে হতাশ হয়ে
নীল কন্ঠ উড়ে এলো ফের নীল হ্রদের তীরে তার আস্তানায়
পলাশ গাছের কানে কানে বললো,
'তোমার অত সহজে মুক্তি নেই,
যে লগনে জনম তোমার,
সোনার চামচ জোটেনি ঠোঁটে।
তাই বলে ভেবো না, মুক্তি পেলো তারা অনায়াসে,
দেখবে, তাদের অর্জিত ধনেও টান পড়বে অচিরেই।'
নীল হ্রদের ওপারে আসলে ওটা ঘুঘুর বাসা।
২.
কবিয়াল তোমাকে...
কবিয়াল,
যখন আমি হাসির গোলাপ সাজিয়ে রেখেছি তোমার দেওয়া ফুলদানীতে---
তুমি তখন রাজধানীর আকাশে এক উড়ন্ত উড়োজাহাজ হয়ে পাক খাচ্ছো নিরন্তর।
তোমায় দেখছে যারা, তাদের চোখে আর্তি।
তোমার পথ চেয়ে ক্লান্ত হলো চোখ,
এসে গেছো--- দর্শণ সীমার ভেতরে, এমনই গ্রীন সিগন্যাল।
হঠাৎ ঝনাৎ করে ফুলদানীটা পড়ে গিয়ে চৌচির।
সেসব কথা বলতে গেলে চরম ঔদাসীন্য দেখালে।
নৈঃশব্দের বজ্রনির্ঘোষে কানপাতা দায়।
তাতেও স্বস্তি নেই।
সহজ রূপের আড়ালে এ কি বর্বরতা তোমার?
পথরোধ করতে তিন মাথার মোড়ে ফেলে রেখেছো জগদ্দল এক পাথর।
আঘাত করার এত শক্তি কোথায় পেলে বলো?
গুচ্ছ কবিতা
তৈমুর খান
১.
নিশিবেলায়
পাখির মতো ক্লান্ত দিন
চলে যায়
যেতে যেতে ডাকে
ডাকার সংকেতে
নিভে যায় আলো
আঁধারের চুলগুলি জড়াই
প্রিয়ার মতোন চোখেমুখে
২.
আমার ঘর
এখানে শহর নেই
মাটির বাড়ির দাওয়ায়
নিঃস্ব পিতার ছায়া পড়ে আছে
মায়ের নিকোনো উঠোনে বৃষ্টির দাগ
আমাদের কিশোরবেলা আজও ছুটোছুটি করে
অদূরে মাটির কলসি ঠাণ্ডা জল নিয়ে বসে আছে
পিপাসা পেলে যাই তার কাছে
পাতার জ্বালে সেদ্ধ হয় ভাত
নতুন ধানের গন্ধে ঘর ভরে আছে
৩.
খিদে
পালাতে পারি না কোথাও
আমি ও আমার ছায়া কাছাকাছি থাকি
দুপুরে গরম ভাতের ঘ্রাণ এলে
খিদে পায়
রোজ রোজ খিদে পায় শুধু!
এই পুকুরের ঘাটে দু'দণ্ড বসি
বহু পুরনো সিঁড়িতে দেখি নূপুরের শব্দ লেগে আছে
আলতা পরা খালি পা কার উঠানামা করে?
দুয়ার খোলা আছে
বাগানের হাওয়া আসছে বসন্তের আমন্ত্রণ নিয়ে
সব কুঁড়ি ফুটবে এবার অনুরাগের পরশ পেয়ে!
পালাতে পারি না,
মাঝে মাঝে কোকিলের মতো ডাকি—
কেন ডাকি?
আমার ছায়াটি বোঝে সব, শুধু আমিই বুঝি না;
আমার শুধু খিদে পায়
এ আর এক অন্য খিদে—
খিদের আগুনে হৃদয় সেঁকি! আরও কবিতা পড়ুন
সাম্প্রতিক বোধ
গীতশ্রী সিনহা
যদি ভালোবাসা পাই, আবার লিখতে হবে নিবিড় রাতে
নয় সেই অনুকরণ - প্রেম ও বিচ্ছেদের পদ্য, শব্দবন্ধ
এসো অন্তিম মৃত্যু, তোমার ভোরের আগুনে যাত্রারম্ভ হোক
হে প্রেম, হে পুষ্পের দেবতা, জঠরে দিয়েছো নাতিদীর্ঘ
ক্ষত, যেন প্রহরান্তর মোষপাড়ায় শৃগাল - ডাক
সবুজ দূর্বাঘাসে গঙ্গাফড়িং- এর নাচ বড়ই দুর্লভ
ঘুম নেই, বিশ্বাস নেই, তাপ নেই... স্তূপাকার দীর্ঘশ্বাস
অস্থির চেতনার মধ্যে ক্রমশ নিভে আসে ট্রেনের গতি
নিজস্ব কোনো গন্তব্য নেই, নির্ভরযোগ্য কূপ নেই, নেই গভীরতা
ছিলো যা অতীতে... আর্যসভ্যতা সব লুঠে নিয়ে গেছে
বস্তুর কাছাকাছি জমা হয়েছে আজ পিশাচ ও নর্তকীর ঘুঙুর
শুধু ঝংকার, আত্মার কলরব, রুচিহীনতা
হে পুষ্পের দেবতা হে রাখাল বালক, আমার নিজস্ব কোনো
দেবযানী নেই। একদা ইন্দ্রিয় ছিলো, বর্তমানে শস্য - পোকা মাঠ
হে প্রেম, হে পুষ্পের দেবতা, আমাকে সাহস দাও... আকর্ষক গন্ধ দাও
বশীকরণ বিদ্যা শেখাও।দূরে দাঁড়িয়ে ঐ দ্বৈত ছায়া, জয় চাই না...
প্রত্যাশা নেই সেই ঈপ্সিত মগ্নতায় ---- হারানো জাগরণ ।
অপ্রকাশ্য চুক্তিপত্রের ঠিকানা
বেণু মাহাত
ভগ্ন চৌকাঠের উপর নির্জীব সন্ধ্যা একাকী বসে।
নকশী কাঁথার গায়ে ক্ষতরা তখনও গল্পে ব্যস্ত,
শেষ তারাখসাটা আকাশের বুকে আঁক কাটে,
কালপুরুষের নিঃশব্দ পদচালনার দূরত্ব মাপে জোনাকি।
ছিন্ন ভিন্ন আর্ট পেপারে বিবর্ণ জলরং,
ষাটোর্ধ্ব টুলে মোমবাতির আলোয় রসায়নতত্ত্ব গেলে পড়ে,
আধপোড়া রাত্রে অপ্রকাশ্য চুক্তিপত্র
অবসন্ন হস্তাক্ষর সমেত ঢাকা পড়ে ফাইলের নীচে।
নিমাই জানার দুটি কবিতা
১.
লাল শ্মশানের ক্রোমোজোম ও সরীসৃপ সাপের পাশুপত
ঋগ্বেদ ছুঁয়ে দেখবে বলে যারা দুমুখো সাপের মুখ থেকে বিষের থলি বের করে ছুঁড়ে দিচ্ছিল একটা জলপ্রপাতের ডগায় তারা ঠিক গতকাল কিউমুলোনিম্বাসের মতো শ্বেতাঙ্গ শরীরের উদ্বায়ী ধ্বংসাত্মক অতি জাগতিক উত্তরাখণ্ডের শুক্রানুর চেয়ে আরো চটচটে বিষাক্ত সাপের অষ্টম লিঙ্গের ছাই ভর্তি ক্রোমোজোম নিয়ে লাল ঋণাত্মক ঘরের ভেতর এক একটা পানিপথের আকাশ আবিষ্কার করল ,
যুদ্ধ যে শুধু নাকাড়া , কোরিয়ান বর্শা , পাশুপত বাজলেই হয় তা নয় একটা ছত্রাকের উল্টানো টুপির মত বিছানায় চারটি জৈবনিক মুখের গমন অঙ্গ থাকা দরকার
মৃত্যু এভাবেই শ্মশানের কাছে এসে নপুংসক হয়ে যায় আমি কিছু দীর্ঘ সাপের জানুভঙ্গ বৈসাদৃশ্য আর কাঞ্চনজঙ্ঘার ব্রহ্মাস্ত্র সাপেদের তলপেট থেকে লাল সরীসৃপ মাখানো লবণাক্ত অসুখ গুলোকেই নিয়ে রক্তাধিক্য অঞ্চলেই রোপন করে আসি , কিছু আপেলের ব্যতিক্রমী সরলবর্গীয় সাপ সোজা রোহিনী নামক গোপন অন্তঃপুরে তিন প্রোটিয়াম যুগের কল্প বিষয়ক মূলরোমে বর্ণহীন বমি রেখে আসে, যৌন অক্ষম সৈনিকেরা ও শুধু দুই হাতে পিণ্ড চটকানোর মতোই নিষিদ্ধ আত্মার আঠারোটা খন্ড মিলে রেখে ছিল কমলালেবুর দক্ষিণ অ্যালামিন প্রোটিন সংশ্লেষ ক্ষেত্রে , ঝাউ গাছেরাই মাংস ভক্ষণকারী উটেদের কাছে গোলাপী পরিচ্ছদ খুলে রেখে আবারো দুই হাতে নর্তক হয়ে ওঠে
ইচ্ছে করেই আমি হাসপাতালে যাই মৃতদেহের টেট্রা চোখের মতো শীতল জননাঙ্গ গুলোকে মুখে ঢুকিয়ে শ্মশানের কাছে এসে কিছু অনুদ্বায়ী মানুষদের জঙ্ঘাতন্ত্রের যুদ্ধ দেখব বলে , ঋষি গৌতমী, লাল দাক্ষিণাত্যে যেতেন ইস্ট্রোজেনিক মায়াপুর নিয়ে
২.
ফসফরিক আত্মা ও লাল অন্তঃপুরের আখরোট
কিছু ফসফোরিক কার্সিজেনিক ডরমেন্ট আগ্নেয়গিরির অতি বিষধর পাচনতন্ত্রের নীল করিডরে যারা চাঁদের মতো উলঙ্গ বাৎসায়ন পুঁতে রেখে গোলাপি গাছেদের নয়ন তারা দ্রাঘিমায় কিছু ডিম্বকীয় অবিভাজিত স্তন বৃন্তের মৃতদেহ সৎকার করে আমিও বশিষ্ট্যের মতো ময়ূরীদের পরকীয়া বাগানের চারপাশে উটের তলপেট থেকে নির্গত আখরোটের অন্তঃপুরে ঢুকে বিদেহী আত্মার যৌন ক্ষমতা ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাই
ঝলসানো লাল মাংসের চক্রাকার আদিভৌতিক মাংস খন্ড দিয়ে প্রতিটি গোপনাঙ্গ দোকানে একটি কাঁচ ঘরের সুদৃশ্য আয়না কক্ষ তৈরি থাকে , যেখানে সরু সরু কেঁচোর মতো একটা পুরুষ মানুষ অতি ধীবর ধ্বজভঙ্গ ছায়াগুলোকে আকাশের দিকে উড়িয়ে লাল নক্ষত্রের সাথে একা একা স্নান করে নেমে বিশুদ্ধ নাইট্রোজেনের উভয় লিঙ্গ বাতাস ছিঁড়ে খায় , আমি শুধু লাল কাপড় জড়ানো রৈখিক বন্ধনহীন কসমিক সেন্টারে নিজের হাইপোথ্যালামাসে ডিএক্টিভেটেড তেজস্ক্রিয় বিদ্যুৎ তার গুঁজে দিচ্ছি
না এখানে কোন আগুন নেই আগুনের মতো কোনো স্থপতি নেই আগুনের মতো কোনো ধীবর নেই আগুনের মতো কোনো আর্জেন্টাম নাইট্রাইট খাওয়া মৎস্যজীবী নেই আমরা যারা নিকোটিন খাই কালো কাকড়া বিছার স্ত্রীলিঙ্গ মিশিয়ে তারা শ্মশানের চারপাশে জলন্ত কাঠের অগ্নিপিণ্ডে একটি সরলরেখা পুঁতে দিয়ে আসি খাগড়াগেড়িয়ার অবিন্যস্ত বিরুপাক্ষ পুরে
মরফিন মেশানো মোমবাতি অতিধ্রুব পদের বরফ মেশানো আমার আঠারো জন্মের পূর্বের কোন বাবা ধারালো ছুরি দিয়ে আমার নাভি কেটে দিচ্ছে। আমি মায়ের উলঙ্গ দৃশ্য দেখে ব্রহ্মাকে বলেছিলাম এ জন্মের সব লিম্ফোসাইট পাপ কথা
কাশ ফুলের হাওয়া
রামানুজ মুখোপাধ্যায়
১.
শরৎ এলে পথে-ঘাটে, মাঠে, নদীর ধারে মাথা দোলায় কাশফুল। সকালবেলার শিশির মেখে ঝরে পড়ে শিউলি। বাতাসে ভেসে আসে এক আশ্চর্য সুঘ্রাণ। এবার প্রতিমার চোখ ফুটবে। মৃণ্ময়ী হবেন চিণ্ময়ী। প্রথমে রঙ দেওয়া হবে গণেশের প্রতিমায়। শিল্পী তার আগে বলবেন, ‘নাড়ু আনো, গণেশ তো চোখ মেলেই খেতে চাইবে’! ছোটোবেলায় সে-ছিল এক গভীর চিন্তার বিষয়। অনেক বড়ো পর্যন্তও এ-কথাকে সত্যি ভেবেছি। বাড়ি থেকে চেয়ে এনেছি নাড়ু। দুর্গার চোখ বড়ো-বড়ো, টানা-টানা। শিল্পী এবার চাইবেন জ্যামিতি বক্সের কম্পাসটি। আমারই কম্পাসের সাহায্যে আঁকা হত দেবীর চোখের তারা। কী আনন্দ!
সূত্রধরদের বাড়িতে কত স্নেহ, কত সমাদর পেয়েছি। এইসব মৃৎশিল্পীদের হাতের কাজ দেখি আর একটু-একটু শিখি। কেরোসিনের মোটা শিখার লম্ফ জ্বলছে বারান্দায়। তাতে চাপা দেওয়া হয়েছে মাটির বড়ো খাপুড়ি। খাপুড়ি মাটির পাত্র। তৈরি করেন কুমোররা। মুড়ি ভাজার কাজে লাগে। লম্ফর শিখা থেকে কালি পড়বে খাপুড়ির গায়ে। তার সঙ্গে আঠা মিশিয়ে তৈরি হবে কালো রঙ। উঠোনে শুকনো পাতার আঁচে ফুটছে তেঁতুলের বীজ। তেঁতুল বীজের আঠা মেশানো হবে রঙে। রঙ তৈরির কাজে লাগবে কাঁচা বেলের আঠাও। ছাগলের গায়ের বড়ো লোম আর গোরুর লেজ থেকে তৈরি হবে তুলি। খড়ি মাটি, লাল আর নীল রঙ তো সহজলভ্য। প্রয়োজনে বাজার থেকে কিনে আনা হবে হলুদ রঙ। তারপর কাঠের বড়ো পাত্রে মিশিয়ে মিশিয়ে অন্য রঙগুলি তৈরি করা হবে প্রয়োজন অনুযায়ী।
আমাদের গ্রামের সূত্রধরদের পিতা-পুত্র দুই শিল্পী বিশ্বেশ্বর ও লক্ষ্মীকান্ত এ কাজে সুদক্ষ। এই সুযোগে তাঁদেরকে আমার শ্রদ্ধা নিবেদন করি। দক্ষ শিল্পী ছিলেন চিত্তরঞ্জন সূত্রধরও, তিনি প্রয়াত হয়েছেন। গ্রামের অন্য দুই কৃতী শিল্পী সহদেব সূত্রধর ও আনন্দ সূত্রধর দূর-দূরান্তের পুজোমণ্ডপে, মন্দিরস্থাপত্যে তাঁদের অসামান্য শৈল্পিক দক্ষতার সাক্ষ্য রেখে চলেছেন। হাতে তৈরি রঙের দিনও ফুরিয়েছে। এসেছে কেমিক্যাল রঙ। বিশ্বেশ্বর প্রয়াত হয়েছেন। লক্ষ্মীকান্ত সূত্রধরের বয়স ষাট-অতিক্রান্ত। আনন্দ-সহদেবরাও পঞ্চাশোর্ধ্ব। তাঁদের উত্তর-প্রজন্মের কেউ মৃৎশিল্পের কাজে এগিয়ে আসেনি। বনকাটির সূত্রধর বংশের তরুণ শিল্পী প্রসাদ সূত্রধর এ কাজে আশার আলো দেখাচ্ছেন। কালক্রমে সূত্রধরদের এই পেশাও কী তাহলে হাত-বদল হয়ে চলে যাবে অন্য কোনো পেশাদার শিল্পীদের কাছে?
২.
(উৎসর্গ: এক যুগ আগের বন্ধু Elomelo Roddur-কে)
পুকুরের জলে ভাসছে গুচ্ছ-গুচ্ছ শোলার ডাঁটি, দড়ি দিয়ে বাঁধা। সেগুলি একে-একে তুলে এনে বারান্দায় বসে নকশা তুলছেন নারায়ণ কর্মকার। তাঁর ধারালো ছুরিটি রাখা আছে দু-টুকরো শোলার ভাঁজে। পাশে রাখা কয়েক বান্ডিল বিড়ি। কাজ চলছে সারাদিন। সন্ধের পরেই গ্রামে অন্ধকার। লম্ফ, হারিক্যান, লন্ঠন। টিমটিম করছে আলো। ইলেকট্রিক যদি-বা এলো, লো ভোল্টেজ অথবা ঘন ঘন লোডশেডিং। আর সারাদিনের কর্মক্লান্তি তো থাকেই।
গ্রামীণ কামারশালাটি তাঁদের। সারা বছর কামারশালার কাজ। হাপর টানা, হাতুড়ি পেটানো। খড়ের ছাউনির পরিবর্তে এলো টিনের চাল, ডাক পড়ল কর্মকারদের। বর্ষার আগে বরাত অনেক। লাঙলের ফাল পাজানো, কাস্তের পুরি কাটা। বৃষ্টি নামলে বাড়বে গাছপালা, ঝোপজঙ্গল, লতাপাতা। খোঁজ পড়বে কুড়ুল-কোদাল-কাটারির। বর্ষার টান ফুরিয়ে এলে শরতে, পুজোর আগে অন্য ব্যস্ততা। চাই ডাকের সাজ।
চারপাশের সম্পন্ন গ্রামগুলিতে পারিবারিক দুর্গাপুজো সংখ্যায় অনেক। প্রায় সব প্রতিমাই একচালের, সাবেকি। একই কাঠামোর মধ্যে সবগুলি মূর্তি। দুর্গা-অসুর, কার্তিক-গণেশ, লক্ষ্মী-সরস্বতী। ছুতোররা বলেন ছয় পুতুলের প্রতিমা। প্রত্যেকের রঙ আলাদা। একই কাঠামোর মধ্যে এতগুলি রঙের সমাহার, তাই সাদা শোলার সাজ চাই, বর্ণবৈচিত্র্য হবে।
রঙিন কাগজের নকশা, চুমকি, রাঙতা, বাদলা --- চকচক করছে চারদিকে। রুলময়দা আর তুঁতে দিয়ে আঠা তৈরি হচ্ছে হাঁড়িতে। গ্রামে এবং গ্রামের বাইরে অন্তত পাঁচ-সাতটি প্রতিমা সাজাবেন তিনি। পুজো এগিয়ে এলে বাড়ির অন্যান্যরাও হাত লাগাবেন কাজে। পারিবারিক পুজোগুলিতে প্রতিমায় ডাকের সাজ পরানো শুরু হবে চতুর্থীর দিন থেকে। একার হাতে একটি বড়ো প্রতিমায় ডাকের সাজ পরাতে অন্তত চার-পাঁচ ঘণ্টা সময় লাগে। নারায়ণ কর্মকারের মৃত্যুর পরে চারপাশের পাঁচ-সাতটি গ্রামে শোকের ছায়া। প্রতিমা সাজাবেন কে? উত্তরসূরীরা কামারশালের কাজটুকুই জানেন। ডাকসাজের কাজে তাঁদের আগ্রহ নেই। সময় ও ধৈর্য চাই। তুলনায় পারিশ্রমিক কম। গ্রামীণ পারিবারিক পুজোর সমস্যা নানা। সুখ-সমৃদ্ধির সময়ে মাতৃ আরাধনার সূচনা হয়েছিল, কালক্রমে কমে এলো অর্থনৈতিক আয়, বড়ো সম্পত্তি সন্তানদের মধ্যে ভাগাভাগিতে শতটুকরো হল। অথচ বাজার ক্রমশ দুর্মূল্যের। সেখানে যে সাধ থাকলেও সাধ্য থাকে না। সেইখানেই সংঘাত বাঁধে। শহরের শিল্পীদের গ্রামে এসে কাজ করার আগ্রহ কম। কর্মকাররা ডাকের সাজ তৈরি না করলে এগিয়ে আসতেন সূত্রধররা। সূত্রধরদের শিল্পদক্ষতা যে বহুমুখী।
নারায়ণ কর্মকারের কনিষ্ঠ পুত্র দেবদাস কর্মকার এই ধারাটিকে অক্ষুণ্ণ রেখেছেন। মুকুট পরানোর সময়ে চাই উঁচু টুল অথবা টেবিল। টেনে আনা হয় নিকটবর্তী কারও বাড়ি থেকে। আগে বসবে মুকুট, তারপর চূড়া, তারপরে কানপাশা। আগে চেলি, পরে ব্লাউজ। চেলিতে কী অপূর্ব সব কলকার কাজ। থার্মোকল যতদিন আসেনি ততদিন শোলার কাজে কৌলীন্য ছিল।
একচাল প্রতিমার সৌন্দর্যে ঠিকরের ভূমিকা অনেকখানি। চাল ঠিকরে আর কোল ঠিকরে। চালি আঁকাও এক আশ্চর্য শিল্প। এখন অনেকেই দশকর্মার দোকান থেকে কিনে আনেন চালির ছবি। এবার মায়ের আগমন কিসে? নৌকায়। বিসর্জন গজে। দুই প্রান্তে থাকবে সেই আগমনী ও বিজয়ার ছবি। শীর্ষে থাকবেন শীর্ষেন্দু। মন্দিরেই আঁকা হবে। কাছে হলে কেউ চালিটি কাঁধে নিয়ে পৌঁছে দিয়ে আসবেন ছুতোরঘরে, আবার আঁকা হয়ে গেলে তুলে আনবেন মন্দিরে। চালি সুন্দর না হলে যে পুজোর চালচিত্রটাই মাটি হয়ে যায়!
এতগুলি প্রতিমা সাজাতে সাজাতে ষষ্ঠীর সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত্রি নেমে আসে। প্রতিমা সাজানোর পরে মন্দিরে পড়ে থাকে দু-এক টুকরো রঙিন কাগজ, চুমকি আর চকচকে বাদলা। সে-সব টুকরো কচিকাঁচাদের হাতে যেন সাত-রাজার-ধন মানিক!
______________________________________________
আগের সংস্করণের পাঠ প্রতিক্রিয়া
______________________________________________
১/ প্রিয় উত্তম,
সম্পাদকীয় গুণাগুণের উপরেই নির্ভর করে একটি কাগজের বাঁধন ও গঠনশৈলী..... তারপর থাকলো তার লেখক নির্বাচন ও লেখা ....দুটিই এখানে গুরুত্বপূর্ণ ।
সেই ক্ষেত্র থেকে অনেকটা ঝুঁকিপূর্ণ যদিও সত্যের দিক থেকে তবুও সম্পাদককে এই ঝুঁকি জেনে বুঝেই গ্রহণ করতেই হয় ---- যা করতে পেরেছ কিনা এখনো বলা যাবে না তবে এগিয়ে চলেছো ......
সুজন পণ্ডার লেখাটি বানানো নয় । হয়ে ওঠা ...... জীবন্ত ....
ভালোলাগলো ভীষণ ।
ছবি প্রদর্শন-শালা বিভাগে আলোকচিত্রী সিদ্ধার্থ বসু মনমুগ্ধকর এই জন্যে, ছবি তো তোলে অনেকেই....... কিন্তু মগ্নতাকে কি ক্যামেরায় তোলা যায়, দৃশ্যের ? যায় মনে হয় যা শিল্পী তাঁর অন্তরের চোখটি চালান করে দেন ক্যামেরার মধ্যে দিয়ে । তেমনই এক একটি ছবির মধ্যে দুর্গা-মুখ নির্মাণ শিল্পীর গভীর মগ্নতার ছবিটিকে তিনি কি অপূর্ব ভাবে ধরে ফেলেছেন !
সব শেষে আবারও বলি, কবিতা আর পদ্য এক না । এই গভীর সত্য বুঝতে বুঝতেই সময় ফুরায় আমাদের ।
ভালো থেকো আনন্দে থেকো ।
----------কবি ও ঔপন্যাসিক দীপংকর রায়
২/ সময়োপযোগী সম্পাদকীয় এবং চমৎকার কিছু কাব্য সম্ভারে সাজানো এবারের 'অরন্ধন'। শেষ পাতে মিষ্টির মতো সুজন পণ্ডার লেখা অণুগল্পটি। সব মিলিয়ে সুন্দর একটি পত্রিকা পড়লাম। 'অরন্ধন'এর সর্বাঙ্গীন উন্নতি কামনা করি।
চমৎকার ছবিতে লৌকিক জীবনের কথা পরিস্ফুট হয়েছে। আলোকচিত্র শিল্পীকে ধন্যবাদ।
----------কবি সুনৃতা রায়চৌধুরী
৩/ সিদ্ধার্থ বসুর ফটোগ্রাফিতে পুরুলিয়া ঘরানা স্পষ্ট হয়ে আছে।
তবুও বলবো, পুরুলিয়ার সমাজচিত্র তাঁর ফটোগ্রাফির বিষয়, এই কারণে তাঁর প্রতি আমার শুভেচ্ছা রইল।
সংঘমিত্রা ঘোষের কবিতাও চমৎকার।
---------কবি নির্মল হালদার
৪/ লেখা, ছবি দুটোই সুন্দর।
সম্পাদকীয় চাবুক।
কুর্নিশ দাদা, ভালোবাসা রইলো।
-----------কবি শ্যামাপদ মাহাত (বাঁশি)
৫/ এই পত্রিকার সম্পাদকীয় বরাবরই নজর কাড়ে, স্পষ্ট উচ্চারণে সত্যের সামনে আমাদের দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন।
এবারের সংখ্যাটিতে প্রথম থেকেই অসাধারণ সব কবিতার আয়োজন।
আশা করি, পাঠকের ভালোবাসা পাবেন কবিতার নির্জন সাধকেরা।
----------কবি পঙ্কজ মান্না
______________________________________________
আমাদের বই
সম্পাদক : উত্তম মাহাত
সহায়তা : অনিকেতের বন্ধুরা
অলঙ্করণ : চাইনিজ পেন্টিং, আন্তর্জাল
যোগাযোগ : হোয়াটসঅ্যাপ - ৯৯৩২৫০৫৭৮০
ইমেইল - uttamklp@gmail.com














মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন