প্রথম বর্ষ ।। সপ্তদশ ওয়েব সংস্করণ ।। ১৫ চৈত্র ১৪২৭ ।। ২৯ মার্চ ২০২১
সবাইকে জানাই দোল পূর্ণিমার শুভেচ্ছা।
এবারের ভোট অনেকটা ম্লান করে দিয়ে গেল পুরুলিয়ার দোল ও পলাশ পরবকে। অন্য বছর পুরুলিয়ার মানুষ রং খেলায় যেভাবে উৎসাহ দেখান এ বছর সেভাবে উৎসাহ দেখালেন না। ডান বাম, গেরোয়া রাম, বাংলার মেয়ে, পিসিমণি এইসব করে পরস্পর থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন হয়ে দূরে থাকলেন রং খেলা থেকে। আর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শিকার হওয়া থেকে বাঁচার তাগিদে দূরে থাকলেন পলাশ পরব থেকে। পুরুলিয়ার কোনায় কোনায় উৎযাপিত হয়ে আসা পলাশ পরবগুলো বন্ধই থেকে গেল এ বছর।
বাংলার মসনদে কে বসবেন কে বসবেন না তাতে আর যাই হোক পুরুলিয়ার মানুষের যে কর্ম-সংস্থান তৈরি হবে না এ বিষয়টি নিশ্চিত। তাই পুরুলিয়ার মানুষকে ভোলানোর জন্য ধরিয়ে দেওয়া হয় দু'টাকা কিলো চাল।
কে চায় এই কৃপান্ন? এই কৃপান্ন দিয়ে দাস করে রাখার চেষ্টা কখনও সম্ভব হবে না।
পুরুলিয়ার মানুষের প্রকৃত উন্নয়ন চায়লে কর্ম-সংস্থান তৈরি করা হোক এখানে। যাতে যুবকদের বাইরের রাজ্যে গিয়ে কাজ খুঁজতে না হয়।
মমতা, মোদী বা অন্যান্য নেতা নেত্রীবৃন্দ কেউ সাধারণ মানুষের কথা ভাবেননি। যদি ভাবতেন তাহলে সমস্ত রাজ্যে সমস্ত বিষয়ে সমকর চালু করার আগে সমস্ত রাজ্যে সমকাজে সমবেতন চালু করতেন। এক ব্যক্তি প্রতিদিন দেড় হাজার টাকা রোজগার করেন অন্য ব্যক্তি মাত্র দেড়শ। অথচ সমস্ত ক্ষেত্রে তাদেরকে কর দিতে হয় সমান। এ কোন শোষণ ব্যবস্থার মধ্যে বাস করছি আমরা? এর থেকে তো ইংরেজরা ভালো ছিল। কেননা আমরা তাদের কাছ থেকে ভালোটা আশাও করতাম না।
উত্তম মাহাত, সম্পাদক
_________________________________
পুরুলিয়ার শিব গাজন
তপন পাত্র
পুরুলিয়ার সাধারণ পরিচয় রুখা-শুখা ডাঙ্গা-ডহর, উচালী- নাচালী, খরা- ধরা ভখে মরা পড়া কপাল জেলা। দারিদ্র তার দেহের ভূষণ । অনাহার তার তপস্যা। অপুষ্টি যেন অঙ্গসজ্জা । তাই এখানে রূপসী বাংলা গেরুয়া শাড়ি পরে জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডের সামনে এক কঠিন কঠোর তপস্যায় মগ্ন প্রাণ । তবুও এর অন্তরের সুড়ঙ্গ পথে বয়ে চলেছে এক সুস্থ -সংস্কৃতির অমলিন ঝর্ণাধারা । এই আলোকের ঝর্ণাধারার স্বচ্ছগতি , আবেগ মথিত সুর সহজ-সরল মাটির কাছাকাছি আটপৌরে খাটোয়া মানুষের প্রেরণার উৎসভূমি ।
এখানে আগত আর্যরা প্রথমে বনচারী ছিলেন। তারপর পল্লীবাসী হলেন । প্রথমে তাঁদের ধর্ম বলতে ধেনু আর জীবিকা মানে ছিল পশুচারণ। আর্যেরা যখন পশুপালনজীবী, তখন পুরুলিয়ার আদিম অধিবাসী অস্ট্রিক এবং দ্রাবিড় গোষ্ঠীর প্রধান জীবিকা ছিল কৃষিকাজ। আর্যরা অস্ট্রিক ভাষা-ভাষী লোকজনের কাছ থেকেই কৃষিকাজ শিখেছিলেন এবং এভাবেই উভয়ের মধ্যে সংযোগ স্থাপন হয়েছিল।
এ কারণে আর্যগণ অনার্যদের কর্মের পাশাপাশি তাদের ধর্মের সাথেও বোঝাপড়া শুরু করলেন । অনার্যদের দেবতাকে বেদের প্রাচীন মঞ্চে স্থান দেওয়া হল । বৈদিক রুদ্র উপাধি গ্রহণ করে শিব স্থান পেলেন আর্য দেবতাদের দলে । কিন্তু তাঁর মধ্যে আর্য ও অনার্য এই দুই রূপ স্বতন্ত্রভাবে বজায় থেকে গেল । একদিকে শিবের দিগবসন অর্থাৎ সন্ন্যাসীর ত্যাগের লক্ষণ আর অন্যদিকে তিনি বীভৎস, ভাং-ধুতুরায় উন্মত্ত। একদিকে প্রকৃতিকে শান্ত করে নির্জন ধ্যানে তাঁর সাধনা । অপরদিকে চড়ক পূজা ইত্যাদিতে নিজের শরীরকে উন্মত্ত, প্রমত্ততায় মাতিয়ে নানাভাবে প্রদীপ্ত করে ভয়ংকরভাবে তাঁর আরাধনা ।
চড়ক বা গাজন পুরুলিয়ার উল্লেখযোগ্য উৎসব বা পরব । যে গ্রামেই শিব মন্দির সেখানেই শিবের গাজনকে বলা হয় "গাঁয়ের পরব" । এছাড়াও "চৈত্র পরব", " চৈৎ পরব", "ভগতা পরব", "কুঁঢ়া ফেলা", "ছো পরব", "আম-মুশরি খাওয়া পরব" ইত্যাদি নামেও পরিচিত এই শিবগাজন ।
চৈত্র সংক্রান্তির একদিন আগের দিনটিতে এই পরবের সূচনা । অর্থাৎ ৩০ তারিখে চৈত্রমাস শেষ হলে ২৮ চৈত্র আর ৩১ তারিখে চৈত্র মাস শেষ হলে ২৯ চৈত্র পরবের শুরু। চলে চারদিন। শেষ হয় নববর্ষের প্রথম দিন, পয়লা বৈশাখ । চারদিনের চারটি নাম। প্রথম দিন- ফলার। দ্বিতীয় দিন- জাগরণ, তৃতীয় দিন-ভগতা ঘুরা এবং চতুর্থ দিন- তেল হ'লদা।
ফলারের দিন ভক্তরা চলিত কথায় "ভক্তা"রা নখ ,চুল, দাড়ি কেটে স্নান করে শুদ্ধ হন। নিরামিষ অন্ন গ্রহণ করেন একবার। কোথাও কোথাও ভক্তারা এদিন শুধু ফলমূল খেয়েই কাটিয়ে দেন। তাই ভক্তার ফলাহার থেকেই ফলার শব্দটি এসেছে বলে অনুমান করা হয়।
উৎসব বা পরবের চারদিনই মূল ভূমিকা ভক্তাদের । মহিলা ভক্তাও থাকেন । কোথাও কোথাও তাঁদের বলা হয় পার্বতী। ভক্তাদের চারটি বিভাগ আছে । মূল ভক্তাকে বলে পাটভক্তা অর্থাৎ শ্রেষ্ঠ বা প্রধান ভক্তা। তাঁকে সাহায্য করার জন্য দেবল বা দেউল ভক্তা, ধর্মানুসারে এঁদের স্থান দ্বিতীয়। তৃতীয় স্তরে রয়েছেন সাধারণ ভক্তা বা রাণা ভক্তা আর চতুর্থ স্তরের ভক্তারা হলেন গাজন কটাল ।
পরবের প্রথমদিন অর্থাৎ ফলারের দিন সন্ধ্যায় শিবমন্দির থেকে সকল ভক্তা এবং অগণিত সাধারণ মানুষ চলেন নির্দিষ্ট পুকুরে । সেখানে তাঁরা স্নান সেরে পুকুর ঘাটে বৃত্তাকারে দাঁড়ান । পুরোহিত মাঝখানে তাৎক্ষণিক মাটির শিবলিঙ্গ স্থাপন ক'রে সংক্ষিপ্ত পূজা সেরে নেন । বেজে ওঠে ঢাক, ঢোল ,সানাই। জয়ধ্বনি ওঠে --- "শিবমনি মহাদেব"। সকলে ধীরে ধীরে নাচতে নাচতে, জয়ধ্বনি দিতে দিতে মন্দিরের দিকে অগ্রসর হন। একজন গাজন কটাল একটি লম্বা কাঁচা বাঁশ কাঁধে করে বয়ে নিয়ে আসেন । বাঁশের মাথায় বাঁধা থাকে লাল শালু । সেটি মন্দিরের গায়ে ঠেকিয়ে রাখা হয়।
সকলে মেলা প্রাঙ্গণে এসে পৌঁছালে পাট ভক্তা তাঁদের হাতে বেঁধে দেন তাগা। চলতে থাকে বেত বা ছড়ি খেলা আর উদ্দাম নৃত্য ঢাকের তালে তালে। ছোলা ভিজা ও গুড় বিতরণ করা হয় প্রসাদ হিসাবে । শেষ হয় সান্ধ্য অনুষ্ঠান। মধ্যরাত পার হলে পাট ভক্তা, পূজারী ব্রাহ্মণ ও ডোমেরা আবার সেই পুকুরে যান, মাটির ভান্ডে নিয়ে আসেন সামজল বা শান্তিবারি । সেটি মন্দিরে আম্রপল্লব ও বিল্বপত্র দিয়ে ঢেকে রাখা হয় শিবলিঙ্গের পাশে।
দ্বিতীয় দিন জাগরণ । এর নাম রাত গাজন। ভক্তাদের সারাদিন উপবাস । আত্ম নির্যাতন ,আত্মদহনের মধ্য দিয়ে অন্তর শুদ্ধির নানা সংস্কার পালিত হয় এই দিন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি হিঁদোল সেবা । আর সন্ধ্যায় আগের দিনের মতোই পুকুরে যাওয়া। ভক্তদের স্নান । পুকুর ঘাটে শিব পূজা। তারপর বিভিন্ন তীর্থস্থানের শিবের নাম ধরে জয়-ধ্বনি । "কাশীতে বিশ্বেশ্বর, বুধপুরের বুদ্ধেশ্বর , শালপাড়ার গদাধর , শিবমনি মহাদেব" ইত্যাদি । নারী-পুরুষ নির্বিশেষে দেউল ভক্তারা দন্ডী দিয়ে মন্দিরের দিকে এগিয়ে চলেন । সাধারণ ভক্তরা বেত দিয়ে তাদের এগিয়ে যাবার পথে রেখা টানেন আর ভেজা গামছা ভাঁজ করে বাতাস দিতে থাকেন । পাট ভক্তা একটি পাটাতনকে পুকুর থেকে স্নান করিয়ে নিয়ে আসেন কাঁধে চাপিয়ে । পাটতনটি শিবের প্রতীক। কোথাও কোথাও পাট ভক্তাকে কাঠের একটি পাটাতনে শুইয়ে সাদা কাপড় দিয়ে ঢেকে চারজন দেউলভক্তা শব বহন করার মতো পুকুর থেকে নিয়ে আসেন মন্দিরে । এই পাটাতনে সারিবদ্ধভাবে পেরেক পোঁতা থাকে । তাই এই শয্যা কন্টকশয্যা। মন্দির প্রাঙ্গণে পৌঁছানোর পর সকল ভক্তা মাটিতে লুটিয়ে থাকেন মৃত দেহের মতো । একসময় পুরোহিত মশাই আগের রাতে পুকুর থেকে এনে রাখা "শান্তিজল" বা "প্রাণবারি" ছিটিয়ে দেন তাঁদের গায়ে , মাথায় । এটি কল্পিত মৃতদেহে প্রাণ সঞ্চারের প্রতীক।
লোকবিশ্বাস আছে পূর্বপুরুষ যারা দেহত্যাগ করেছেন, তাঁদের মধ্যে যাদের স্বর্গবাস হয় নি আবার পূনর্জন্মও ঘটেনি তাঁদের পূনর্জন্মের প্রার্থনাতেই এই সব লোকাচার উদযাপন।
তৃতীয় দিন - "দিন গাজন" বা ,"ভক্তা ঘোরা" । আগের দিন চড়কগাছ-ডাঙায় চড়কগাছ স্থাপন করা হয়েছে । একটি প্রায় কুড়ি হাত লম্বা শাল গাছের গুঁড়ি মাটির গর্তে শক্ত করে বসানো হয়েছে । এর নাম গাছগাড়া। ওই গাছের মাথায় স্থাপন করা হয়েছে চরকি । এই চরকিটি গাছটির মাথাকে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকে । চরকির মাথায় একটি লম্বা দন্ড বাঁধা হয় । দন্ডটি চড়কগাছকে কেন্দ্র করে চারদিকে ঘুরতে থাকে । ভক্তাকে লোহার তৈরী শিক্ দিয়ে তার শরীর ফুঁড়ে চড়ক দন্ডটির সঙ্গে বেঁধে দেওয়া হয়, ভক্তা শূন্যমার্গে চক্রাকারে ঘুরতে থাকেন। কোথাও আবার লোহার শিক দিয়ে ভক্তার জিভ বিদ্ধ করা হয় । একটা লম্বা রড জিভের ছিদ্র দিয়ে এপার ওপার চালিয়ে দেওয়া হয় । দু'দিকে দুই ভক্তা রডটি ধরে থাকেন আর সকলে ঢাকের তালে তালে নৃত্য করেন। ঢাক বাজে
---ড্যাংটি প্যাটেং ড্যাডেং ড্যাং
ড্যাং ড্যাং ড্যাং ড্যা ড্যাং ড্যাং।
কোথাও কোথাও এই ভক্তা ঘোরা বা দিন গাজনের দিন জ্বলন্ত অগ্নিকুন্ডের গনগনে আঁচের ওপর পাটভক্তা ও অন্যান্য ভক্তরা হেঁটে পার হয়ে যান। তারপর কলাপাতায় রাখা গাইয়ের দুধের ওপর পা ডুবিয়ে পা ধুয়ে নেন। এদিনের আরেকটি আকর্ষণীয় অনুষ্ঠান "কাপ"। "কাপ" আসলে এক প্রাচীন "গো এজ ইউ লাইক"। কাপ বা সং সেজে বাড়ি বাড়ি চাল পয়সা আদায় করে গ্রামের ছেলে ছোকরারা। নাচতে নাচতে গান ধরে-
"কাপ নাচ নাচব না ,
না দিলে তো ছাড়ব না ।
এক পুয়া চাল লিব,
পেট না ভরলে গাল দিব।"
পরবের আর একটি অঙ্গ ছাতু ও আম- মুশরি । এদিন মানুষ পরিজনদের ডেকে গুড় দিয়ে ছোলা- গমের ছাতু খাওয়ান , নিজেরাও খান। দুপুরবেলায় ভাতের পাতে থাকে কাঁচা আম মেশানো মুশুরের ডাল।
সারা পুরুলিয়া জেলায় শতাধিক মেলা বসে । বিক্রি হয় শাঁখা, চুড়ি , ফুলফিতা, কাঁটা, পাউডার, বাঁশি ফ্যাটফ্যাটি, জিলিপি , মনোহরা, ঘুড়ি, আইসক্রিম, তালপাতার পাখা, পেঁপটি বাশি, ছোটদের ঢুলুক ইত্যাদি । চলে ফুলপাতানোর হিড়িক।
পরবের শেষদিন তেল হ'লদা । সকাল সকাল ভক্তারা প্রথমে কাঠের পাটাতনটিতে তেল হলুদ মাখিয়ে দেন, পুরোহিতের পায়ে তেল হলুদ দিয়ে প্রণাম করেন। তারপর নিজেরা তেল হলুদ মেখে নির্দিষ্ট পুকুরে গিয়ে স্নান করে আসেন । ভক্তাদের হাতের তাগা সুতা খুলে ফেলা হয় পুকুরের জলে । শুরু হয় গতানুগতিক জীবন । এই মেলার মূল উদ্দেশ্য বর্ষাকে আহ্বান জানানো । পূর্বপুরুষের পুনর্জন্ম কামনা এবং আত্মদহন ও আত্মপীড়নের মধ্য দিয়ে সারা বছর নীরোগ থাকার বাসনা ।
গণতান্ত্রিক অধিকার
নির্মল হালদার
অন্ন বস্ত্র বাসস্থানের অধিকার নাইবা থাকুক। ভোট দেওয়ার অধিকার আমার আছে। আমাকে যেতেই হবে ভোটের লাইনে। আমাকে দিতেই হবে ভোট। ভোট, আমার গণতান্ত্রিক অধিকার।
একটা সময় ছিল যখন কোনো ভোট আমি দিইনি। এই কারণে, আমি চিহ্নিত হয়ে গেছিলাম। এবং ভোটের দিন আমার কাছে সবাই জানতে চাইতো, কৌতূহলের সঙ্গে জানতে চাইতো, আমি ভোট দিয়েছি কিনা। যদি বলতাম দিয়েছি তাহলে, দেখতে চায়তো আমার কলঙ্কিত আঙ্গুল। আমি হেসে উঠলাম।
তখন পছন্দের বাইরে কোনো বোতাম ছিল না। আমি কি করে যাই ভোট দিতে। আমার নৈতিকতার বাইরে কি করে যাই, ভোটের লাইনে!
কেন না, ভোট একটি প্রহসন। ভোট, মানুষকে ঠকানোর এক কৌশল। ভোট, মানুষকে বোকা বানানোর এক ষড়যন্ত্র।
নেতা-মন্ত্রীরা বিভিন্ন মিডিয়াতে প্রচার করে থাকেন, প্রচার করছেন, আপনার ভোটাধিকার প্রয়োগ করুন। জনগণের কাছে আবেদন করছেন, আপনার ভোট আপনার অধিকার।
তোমার বেঁচে থাকাও আমার অধিকার। আমার শিক্ষা আমার অধিকার। আমার স্বাস্থ্য আমার অধিকার।আমার অন্নবস্ত্র আমার অধিকার। বাসস্থান আমার অধিকার। কোন্ অধিকার আমি পেয়েছি?
গতকাল বুড়ি সবজিওয়ালির কাছে জানতে চাইছিলাম, মাসি ভোট দিবে তো? মাসি বললো,
আগে পেট। পেট ভরানোর জন্য বাজারে আসবো সবজি বিকতে, তার পরে সময় পেলে, ভোট দিতে যাব। এই বুড়ি সবজিওয়ালির কথা নেতা-মন্ত্রীরা কী শুনতে পান? এক রিকশাওয়ালাকে বলছিলাম, ভোট দিতে যাবে নাকি? সে বললো, যদি রিকশা টেনে চাল নুনের দাম টা বের করতে পারি, তবেই ভোট দিতে যাব-------।
আমার চা ওয়ালা, যার কাছে প্রতিদিন চা খেয়ে থাকি সকালে, সে বললো, বেলা বারোটার পর দোকান বন্ধ করবো, তা বাদে যদি মন করি, ভোট দিতে যাব।
এইসব ছবির দিকে আমাদের নেতা মন্ত্রীরা এবং রাজনৈতিক দলগুলি কী তাকিয়েছে ভুল করে?
আমরা বরং ভুল করে তাকিয়ে দেখতে পাই, চৈত্রের পলাশ। আগুন রাঙা পলাশ। যেনবা প্রতিবাদী কন্ঠস্বর হয়ে বলছে, আর নয় এবার দূর হটো------দূর হটো ------- আমরা ধরে ফেলেছি রাজনৈতিক দলের কারচুপি। আমরা আগে চাই, আমাদের বাঁচার অধিকার।
ফুটপাতে শুয়ে থাকা মা ও শিশুর মুখে যে মাছিরা বসছে, আগে তাড়াতে চাই। তাদের জন্য ব্যবস্থা করতে চাই, যে ব্যবস্থা থেকে তৈরি হবে মাথার আচ্ছাদন। যে ব্যবস্থা থেকে, দু'মুঠো আসবে।
ভোট নয়। জোট নয়। খুনোখুনি নয়। হাসি চাই।মানুষের মুখের হাসিতে এই পৃথিবী খুঁজে পাবে তার সৌন্দর্য।
পৃথিবীর মধ্যে ভারত বর্ষ বৃহৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। তার যথাযথ অর্থ করতে হলে, মানুষকে বাঁচার অধিকার। কথা বলার অধিকার দিতে হবে।
বাংলার দুরবস্থা বাংলার ভোট
বিবেক সেন
জয়হরিপুর গ্রামে খেতমজুররা একটা আন্দোলন করেছিল। জমিতে কাজের মজুরি বাড়ানোর জন্য। আন্দোলনের চাপে জমি মালিকরা সে বছর মজুরি বাড়ালো ঠিকই কিন্তু পরের বছর ঝাড়খণ্ড থেকে শ্রমিক নিয়ে গেল, গ্রামে এসে গেল চাষের যন্ত্র, ধানকাটা, মাড়াইয়ের যন্ত্র।
বর্দ্ধমানের একটা গ্রামে বাম আমলে বর্গা হয়েছিল মৌখিক ভাবে। বাস্তবে নাম রেকর্ড হয়নি। নেতারা বলেছিল হয়ে যাবে। দলিত, আদিবাসী কৃষক আর মাথা ঘামায়নি। ২০১১ তে ক্ষমতা বদলের পর ধনী জমির মালিকরা আদালতের রায় নিয়ে এসে সেই জমি ছিনিয়ে নেয় লাঙ্গলের মালিকের থেকে। আদালত যার জমি তার।
বর্গা রেকর্ড করা জমি ব্যারাকপুর এলাকার। আদিবাসী বর্গাদার। জলের অভাবে পাঁচবছর চাষ হয়নি। মালিক বিক্রি করে দেয় প্রোমোটারের কাছে। সহজেই বর্গা উৎখাত। এখন সেখানে হোটেল।
অনেকদিন বাংলার গ্রামে গ্রামে ঘুরছি। এসব চিত্র চোখে পড়ে। ভোট এলে পতাকায় মুড়ে যায় গ্রাম। নেতারা আসে। সব দলের নেতারাই আসে। গ্রামের অন্ত্যজ কুটীরেও আসে। তারপর যে অন্ধকার ছিল সেই অন্ধকার। গ্রামের ছেলেরা দল বেঁধে চলে যায় শহরে, ভিনরাজ্যে। চলে যায় যে সব জেলায় জল আছে সেখানে চাষের কাজে। যারা যেতে পারে না ১৫০ টাকা রোজেও কোন কাজে লেগে যায়। একশদিনের কাজ কত দিন পেলে? আশ্চর্য প্রশ্ন। দিনের শেষে দোকান থেকে পাঁচ টাকার ডাল, পাঁচ টাকার তেল কিনে রান্না হয়। কুড়িয়ে আনা পাতা আর লকড়ি দিয়ে। পুকুরে কলমি, শাঁপলা, গুগলি পেলে ভাল।
উন্নতি কি হয়নি? হয়েছে কিছু। বর্গা অপারেশন আর মজুরি বাড়ানোর লড়াই বামেদের হাত ধরে। দিদির আমলে দুটাকা কিলো চাল। কিন্তু এদের বিপুল ক্ষুধার সামনে সেসব কিছু না। এদের অভাবের সামনে ধূলোর মত এইসব ফিসক্যাল পলিসি। নেতারা কর্তারা আসেননি ওদের দাওয়ায়। ভাবেননি এইসব গালভরা পলিসির বাইরে দারিদ্র্য দূরীকরণ করার যে পন্থা রয়েছে।
আরেকটা ভোট এসে গেছে। পতাকায় মুড়ে গেছে বসন্ত। ধূলো উড়ছে। আমার প্রাজ্ঞ বন্ধুরা জোটের মর্ম লিখছেন। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি নিয়ে লিখছেন। বিকাশ আর সাম্যের কথা লিখছেন।
আমি অনেক পুরোনো একটা গান ভাঁজছি মাথায়। যেন কেউ শুনতে না পায়।
কোন এক যুবকের কাহিনী শোন
হয়ত বা কাহিনী হাজার
যার রক্তের রংয়ে আঁকা ছবিতে ভরা
বাংলার ক্ষেতখামার...
পল্লব গোস্বামীর কবিতা
১.
বৃষ্টি
গতজন্মের
না ফুটতে পারা শোকফুল...
আজীবন -
গুলমোহর হয়ে ছড়ায় |
২.
পলাশ
ঠিক যেন অন্ধ বাউল
ঠিক যেন বাতাস ফকির
ফুরিয়ে যেতে যেতে
তান তোলে -
আকাশ -পাতাল |
৩.
প্রেম
হারিয়ে যাওয়া ধুলোয়
যেটুকু খোওয়াব পড়ে থাকে
সেটুকু পথেই
তুমি শুধু আমার |
৪.
ডাকনাম
স্মৃতিদেরও একটা ডাকনাম থাকে |
যেমন থাকে , নীড়ের ভেতর পাখি
পাখির ভেতর নিরালা
তোমারও একটা ডাকনাম ছিল ,
এক আকাশগঙ্গা ইউটোপিয়ার মতো |
৫.
রুপান্তর
আমি তার কালোকিত চোখে প্রশ্ন রাখলাম-
'এমন রৌদ্রের মাঝেও কি বৃষ্টি হয় ? '
সে হাসতে হাসতে সমুদ্র হয়ে গেল ...|
৬.
অবেলা
দীর্ঘ শোনপাপড়ি বিকেলে
নেবুরঙা সূর্যের আলোর মতো
শান্ত - নরম , শুয়েছিলে তুমি মেয়ে
আমার পাশেই ,
কোনো এক অবেলায় |
পাততা পাততা বুটা বুটা
শুভাশীষ ভাদুড়ী
আমি তো ভিখিরি লোক
যেখানে যেমন মুঠো পাই
পাততা-পাততা বুটা-বুটা...
বেলা শেষে ছমুঠো চড়াই
হাঁড়িতে আগুন লাগে
চালে ডালে যুদ্ধ চলে খুব,
একঘর খিদে নিয়ে
সামনে, বসে রয়েছি বেকুব
হাওয়া লেগে উস্কে ওঠে
ফ্যান উপচে আঁচ নিভে যায়--
আধা পোড়া, আধ-সেদ্ধ,
তবু খিদে গ্ৰাসের সহায়
আমি যে ভিখিরি লোক,
কাজেকর্মে মারের দোহাই
পাততা-পাততা বুটা বুটা
বাড়া পাতে খিদে মেখে খাই।
মহিউদ্দিন সাইফের কবিতা
১.
দেহাতি
দিনশেষে ক্ষুধার্ত সাঁঝ এসে বাড়িয়ে দেয় সরীসৃপ জিভ ।
আমরা উপকথাজীবীরা
মহোৎসাহে বসে পড়ি যে যার বস্তাসন পেড়ে ।
আঁচল-কোঁচড়ে নতুন ধানের খই হাসে ।
জ্বলে ওঠে দাওয়ায় কুপি ।
দূর অন্ধকার থেকে বিহারীনাথ ঠেলে আসে মঙ্গল কোড়া ।
হাতে অমোঘ পাশুপতি লাঠা, কাঁধে ধেড়ে ইঁদুর কোঁচবক ।
আর মাথা পাশে বাঁশের পর্দা ঠেলে উঁকিমারে নেফেরতিতি চাঁদ ।
আমরা সবাই সূচীমুখ, রহস্যকে গাঢ় করি ।
টেনে টেনে গায়ে জড়াই আঁধারের চাদর ।
বুড়ো মঙ্গল মরা কোঁচবকের মুখ দিয়ে বলিয়ে যায়
বেহুলার সেদিনের বাসরের কথা ।
২.
দেবতা
বনগর্ভের ছায়াচ্ছন্ন পাথর ।
মাথা বেয়ে জটাজাল নামে ।
কে জেনেছে স্বভাব তাঁর ?
জটাজুড়ে কী ছোটে ?
কী নিহিত কঠিন কঠোর নীরবতায় ?
এই নৈবেদ্য, স্বর্ণাসন, ধূম আর ধামের জীবন ক্লেদাক্ত, ভীরু আর রোমাঞ্চহীন ।
দুর্বাঞ্ছা নিয়ে ঘর ।
এ অনীশ্বরতার যন্ত্রণায় কে থাকতে চায় ?
সমাধিস্থ ঘুমন্ত গাছ পেতে দেয় ছায়া-বৃষ্টি-হিম পেরোনো নিস্পন্দ উদাসীন শ্রমণ-শিকড় ।
সুধায়-বেদনায় কেঁপে ওঠে ঊর্ধধড়
কুন্ডলিনী শিখাময়
জাগে বিবমিষা, আবার শান্ত হয়…
মুচড়ে ওঠে মন ।
কঠিন পাথর থেকে আসে জলদগম্ভীর নবা,
"অভিরূপ বত ভো দোসিণা রত্তি ।
লক্ষণা বত ভো দোসিণা রত্তি ।
পাসাদিকা বত ভো দোসিণা রত্তি ।"
৩.
বেদনা
বেদনা,
এই ভাস্করটিকে দেখলে মন বসে শিল্পে ।
ঘরকন্না স্বভাব হয় তখন ।
অজ্ঞাতের সেলাইগুলো কেটে খুলে দেয় দর্পগতি চলাচলের পথ ।
এবং অরণ্যরূপ জ্যোৎস্না ছেড়ে
বেরিয়ে আসে সুক্ষ্মলতাপাতাবৃত প্রশ্নাবলী নিম্ফ…
খাদে খোয়ানো ছেলের নাচতে থাকা বাবা,
একটি অশিক্ষিত বিপ্লবী…
নিজের লালায় লেপ্টে থাকা নার্সিসাস কি ব্রহ্মবিদ ।
একটি ভবঘুরে ছিন্নবস্ত্র দেবকন্যা,
একজোড়া পায়রা সক্রেটিসের চোখের মতো ।
আর একটি কিমিয়াবিদ : তন্ময়, প্রত্যয়ী, বিরুদ্ধাচারী।
ফুলকি
গার্গী মুখার্জী
কবিতা তোমার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকি।
সব কাজ সেরে বসব তোমার মুখোমুখি।
যেন অনন্ত অপেক্ষা তোমার জন্য।
তারা ফোটা রাতের নিস্তব্দ অাঁধারে কথার মালা গেঁথে রাখি তোমাকে সাজাব বলে_
পবিত্র প্রভাতে রক্তিম সূর্যের মত এক নতুন দিনের স্বপ্নের আশার আল্পনা দিয়ে তোমাকে অাঁকব বলে- প্রভাতের ওই লাল রং চোখে ধরে রাখি।
কিন্ত কখন নিঃশব্দে তুমি হারিয়ে যাও ধরে রাখতে পারিনা আমি।আমার জন্য তুমি অপেক্ষা করনা কবিতা।
কাজের মাঝে হৃদয়ের অনেক গভীর থেকে তোমাকে ডেকে যাই।
মনে মনে তোমার সাথে বাস করি তাই
কালো রাতেও আলো খুঁজে পাই।
সৌভিক বসুর কবিতা
আবহসংগীত
১।
বহুদূর আকাশের গায়ে
উড়ে চলা মাছগুলি নদীকে হারায়
২।
বহুদূর ওপারের মাঠে
তুলো ওড়ে, দলছুট পাখিদের সাথে
৩।
আঁধার সর্বস্ব জিভ পেতে চায় রহস্যের যোনি
সুতীব্র ফুলের গন্ধে জেগে ওঠো আদিম রমণী
৪।
টিলার উপরে বৃষ্টি, এখানে আমার নেই ঘর
অন্ধকারে হাতি ডাকে মেঘের ভিতর
৫।
সুদৃশ্য ময়ুর, তুমি বলে এসো তাকে
বহুদিন বসে আছি পাহাড়ের বাঁকে
৬।
কে তুমি রহস্যময়ী, বনপথে বাজালে নুপুর!
আমের মুকুল ঝরে মনে হয় গৃষ্মের দুপুর
৭।
বেহালা বাদক রাতে ফিরে যান ঘরে
একাকী ময়ুর ডাকে একটানা মেঘের ভিতরে
৮।
বহুদূর আকাশের গায়ে
উড়ে চলা মাছগুলি নদীকে হারায়
৯।
হলুদ ঘাসের মতো ম্রিয়মাণ বিকেলের আলো
মেয়েটি হাওয়ার বশে পাখি হয়ে গেলো
১০।
সারারাত মানুষের ঘরে
মূর্তিগুলি ভেঙে যায় ঝড়ের ভিতরে
১১।
প্রতিটি মুহূর্ত আমি ভালোবেসে যাই
যেভাবে কাঠের বাড়ি পুড়ে হলো ছাই
১২।
কে তুমি আড়াল থেকে বলেছ আমায়
বুকের পাঁজর নাকি খুলে রাখা যায়!
১৩।
কিছুটা জেনেছি আর কিছুটা গোপন
রহস্যে জড়ানো ওই মেয়েটির মন
১৪।
মিলন হলোনা বলে যারা আজ দূরে রয়ে গেলো
ঈশ্বর তাদের জন্য আরও এক জন্ম রেখে দিলো
১৫।
ফলের বাগানে ঘেরা কাঠের বাড়িটি, তার পাশে
দূরের পাহাড়ে দেখি রাতের লন্ঠন উড়ে আসে...
বর্ণপরিচয়
রাজীব চৌধুরী
আমাদের বর্ণপরিচয়
জুড়ে ছিল বাবুই পাখির বাসা
আঁধারের গোল আলো হারিকেন
পথশেষে নিঃঝুম চাইবাসা।
কত বাসা চাইতে চাইতে ভাঙে
কত চিতা নাছোড় ধোঁয়ার পাকে
মৃত্যুকে আরও কালো নিয়মের
বেষ্টনে তামসিক করে রাখে।
আঁধারের গায়ে গায়ে লেগে থাকে
আগুনের শান্ত পরশমণি
দূরে গ্রাম তিরতির করে কাঁপে
তারাদের অনন্ত শিঞ্জিনী।
আমাদের বর্ণপরিচয়
লাল হয়ে সহিংস সন্ত্রাসে
বুলেটের ফুটো ফুটো লেখা ব্রেইলে
অন্ধের লাঠি হয়ে ভেসে গেছে!
দুই হাতে ঘাতক অথবা মৃতের
শীতলতা বরফ হয়েছে জমে
জানা নেই সময়ের পাকে পড়ে
এ বরফ পাথর হবে কি ক্রমে?
নৌকো
পারমিতা ভট্টাচার্য
ভাবনাগুলো স্পষ্টত কোথাও ঘটে না,শুধু মনে মনে আমি সেজে নিই।
হীনতায় ডুবে যাবার আগেই জড়িয়ে নিই দর্পিত বেশ, চন্দনে এঁকে তুলি মুখ!
এই যে এখন আমি দেখতে পাচ্ছি...
আপনি একটু ঝুঁকে পড়ছেন আমার লেখা, আর ভাবছেন ―
"চেনা হল না তো মেয়েটিকে" !
অথবা, আপনার সাদাকালো দাড়ি নামছে বইয়ের অক্ষরে...
আলতো ছুঁয়ে যাচ্ছেন আমায়...
যে জলেই থাকি,
নৌকো আপনিই ভেবে কুটো ধরে ভাসি !
এতটা বয়স হল মহাকবি , তবু
ডাকিনিরা হানা দেয় বিদ্যুল্লেখায়... প্রহরে প্রহরে!
উৎপল চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা
১.
তোমাকে দেখেছি
সীমাবদ্ধ আকাশের চৌকাঠ পেরিয়ে
সুদূর দক্ষিণ
ফুল ফোটানো সমস্ত আলোয় বাঁধা তোমার দিগন্ত পাড়
সমগ্র পৃথিবী শেষে তুমিই আগুন
সকল আলোর উৎস মুখে তুমি অন্ধকার
তবুও তোমাকে রাখি এমন শীতল প্রকাশে
অহংকারের এই সীমাহীন অনুভবে মানুষ
তোমাকে ছোঁয়ার অপেক্ষায় হাজার হাত
ক্ষতবিক্ষত আঙুল
বিষন্ন সময়ের উঠোনে নামে রোদ
আলোর নৈঋতে বাঁধা হাওয়ার সমাধি
এমন প্রসন্ন বিভার ভেতর চোখ রাখি
রাখি ডান হাত আর লালায়িত জিভ
তোমাকে দেখেছি সেই আদিরূপে
কখনো জীবিত ....কখনো মৃত.. ..
সুনির্বাচিত সুখ ছুঁয়ে
নিঃসঙ্গ এমন পুরুষত্বের অপেক্ষায়
২.
বাঁদনা পরবের রাত
প্রথম ডোরবেলটা বাজতেই
সুষম অন্ধকারে হাওয়ার চিঠি,
দ্বিতীয়টা রূঢ়. . . . বড্ড কানে লাগে
তৃতীয়টার আঘাতে উঠতেই হোলো
না উঠে আর উপায় কি
দরজা খুলতেই স্বচ্ছন্দ বয়েসী
সেই বিখ্যাত ছেলেটির নাকে রুমাল
হাতে ফরাস দেয়া ঘড়ি
টেরিকাটা চুলে বহর দিতে দিতে সে বলল
আঙ্কেল, ওই দেখুন সাইপ্রাস গাছের মাথায়
চাঁদ উঠেছে
ধারালো কাস্তের মতো একফালি বাঁকা চাঁদ
এ চাঁদ লেলিন দেখলে তার কন্ঠ রুদ্ধ হোতো
মার্কস দেখলে বিপ্লব
প্রশ্ন করলাম . . . আর আমি ?
ছেলেটি জবাব না দিয়েই চলে গেলো
অল্প একটু ভাবনার পর চোখ তুলে দেখি
বিপ্লবী চাঁদ আকাশের বুকে ঝরিয়ে দিচ্ছে
শান্তির আলো
দূরে .....বহু দূরে ...বাতাসে সাঁওতালি সুর
মনে পড়ে গেলো .....আজ বাঁদনা পরবের রাত
প্রবহমান
সন্দীপ বাউরী
সকালের স্নিগ্ধ আলো ঝরে পড়ছে নদীর চরে, যেখানে পানকৌড়ি টুপ করে ডুব দিয়ে তুলে নিচ্ছে শামুক কিংবা ছোটো মাছ।
যেখানে গুনগুনিয়ে ভ্রমর লাল শিমুল আর পলাশের তফাৎ করতে পারছে না।
যেখানে বাংলার ক্লান্ত কৃষক শরীর এলিয়ে দিচ্ছে নিম কিংবা বটের তলায় বিছানো শক্ত সবুজ গালিচাতে।।
চম্পার মতো গ্রীষ্মের খরতাপ মাথায় নিয়ে পথিক তখনো চলেছে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে।।
নীল নীলিমার দিগন্তরেখা, যেখানে গোধূলি হারিয়ে যাচ্ছে সন্ধ্যার অন্ধকারে শান্তির নেশায় ।।
আমিও তেমনি রূপে হারিয়ে যাবো শান্তি সুধা পান করতে করতে দিগন্ত রেখার নীল সীমানার অভ্যন্তরে।।।
আয়নাকে
কুমারেশ তেওয়ারী
আয়নাকে আয়না বলতে নেই, তাকে
হৃদয় নামেই ডেকে দেখো, অথবা পরমেশ্বর
কীভাবে সমুদ্র জেগে উঠে জড়াবে তোমাকে!
সমুহ অবাক হয়ে দেখবে তখন
কত ঢেউ তবু ডুবে যাচ্ছো না তুমি, বরং
কীর্তন আর ঝুমুর শোনাতে শোনাতে ঢেউগুচ্ছ
ছুঁড়ে দিচ্ছে তোমাকে অনন্ত আকাশের দিকে
তুমিও এ্যালবাট্রস, কী প্রকাণ্ড ডানা, ব্যপ্তির প্রকাশ!
ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছো গ্রাম্য কিশোরির মুখ
ধানের বুকে জমতে থাকা দুধ
দুধের ভেতরে থাকা সুজাতা পায়েস
অন্তঃসত্ত্বা নারীটির ভ্রুণ, ভ্রুণের ভেতরে আলোর আঙ্গিক
ছুঁয়ে যাচ্ছো নৌকোর গলুই আর ফসলের উন্মোচন
উড়তে উড়তে ক্লান্ত তুমি
ঠাটের বিলাবলের কোমল নিষাদ ছুঁয়ে নেমে এলে
দেখতে পাবেই আয়নার গোপন ভেতরে
সন্দীপন পাঠশালা ঘিরে কী আলো কী আলো!
বন্যা লোহারের কবিতা
১.
অভিসার
জোনাকির হাতছানি পর্যন্ত নেই
এমন ঘনিষ্ঠ আঁধারে
সাক্ষাৎ ভালো না ।
কারুকাজখোচিত অঙ্গ , তবু
স্বভাবদোষে তুমি আধারটি নিশ্ছিদ্র নও
আমি তো বালির মত
ফস্কে যাবই যেকোনো অবসরে ।
২.
আরোহণ
প্রতিটি সরণ
স্মরণীয় হতে চেয়ে
কাঁপিয়েছে দেহ।
বাতাসের বিদ্রুপ !
নিজেকে দেখেছি আমি
আলোর গতিপথে ; উজ্জ্বল
নির্ভার ধুলো যেভাবে ওড়ে
পুরাতন গণ্ডিতে ফিরব না কখনো ।
৩.
বিচ্ছেদ
বিচূর্ণ আলোয় পাখির স্নানদৃশ্যটি
দেখেছে যে উঠোন; তাকে
ফেরানো যাবে না গৃহস্থ অভিমুখে
উৎকণ্ঠার আবহসঙ্গীতে
বেজে ওঠে ঘর,
আমিই কেবল স্থানুবৎ
ধীর লয়ে পেরিয়ে যায় প্রতিটি আবেগ ।
সায়ন্তন ধরের রহস্য গল্প
ব্লু রকেট রহস্য
ক্যালেন্ডারের শীতকাল হলেও সূর্যের তেজ এত প্রখর যে মাঝে মাঝে মনে হয় বসন্তকে অতিক্রম করে গ্রীষ্ম এসে গিয়েছে। পৌষ-মাঘ শীতকাল, আর মাঘের শীতে বাঘ পালায় শুনেছি, সেই মাঘ মাসের ২৫ তারিখ আজ অথচ দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস এর আশেপাশে। প্রীতমের অবশ্য তাতে লাভ হয়েছে। রাজধানী থেকে প্রচুর পর্যটকের সমাগম হচ্ছে। স্থানীয় মানুষেরাও একটু ঠান্ডার আশায় ডুয়ার্স-তরাই ঘুরছে। তাই তার উপার্জনটাও ভাল হচ্ছে। ওয়েল মেনটেনেন্স, ভালো ব্যবহার, দক্ষ ও সেফ ড্রাইভিং ও সঙ্গে গাইডের কাজ হয়ে যাওয়ায় প্রীতম ও নীল সুইফ্ট এর চাহিদা বেশি। তাই নির্ধারিত সময়ের কিছু আগেই কার লোন শোধ হয়ে গেছে। প্রীতমের মনটা তাই বেশ ফুরফুরে । আজ শনিবার দেব কুটীরে গেলে নীলাদ্রিদের সঙ্গে দেখা হবে এই আশা নিয়ে দেব কুটীরে এল সে। দেব কুটীরের বারান্দায় বসে ছিল নীলাদ্রি, সুজন, ত্রিহানা। নীল সুইফ্ট এর আওয়াজ শুনেই তাকাল গেটের দিকে। আরও পড়ুন
দাদুর সাইকেল
কল্পোত্তম
আমার দাদু যখন সাইকেল কিনেছিলেন সারা গাঁয়ের লোক দেখতে এসেছিল। বাঃ! বাঃ! বলে গর্ব করেছিল সকলেই। দাদুরও গর্ব হয়েছিল খুব। গাঁয়ের সকলের আগে সাইকেল কেনার গর্ব।
তিনিই একমাত্র মরদ, একমাত্র বাপের বেটা। সবার আগে সাইকেল কিনে দেখিয়ে দিলেন, কোনো অংশেই কম নন তিনি। বারবার ডাকাতি হওয়ার পরেও তাঁর যে কিছুই করতে পারেনি কেউ তা বুঝিয়ে দিলেন আরেক বার।
আমার তখন জন্ম হয়নি। সত্যি কথা বলতে গেলে, বিয়ে হয়নি বাবারও। বাবা তখন ছাত্র। কাঁটাডি স্কুলের চালাক শিয়াল। ছাত্র, শিক্ষক, শিক্ষিকা, সকলেই ঐ নামেই ডাকতেন। চালাক হওয়ার ফল স্বরূপ পেয়েছিলেন উপাধি।
বাবার মুখেই শুনেছি। এই সেই গল্পের ফাঁকে পুরোনো এই গল্পগুলো বেরিয়ে আসে মাঝে মাঝে।চালাক শিয়াল উপাধিতে কেউ কেউ এখনও ডাকেন। বাবার স্কুলের বন্ধুরা বাবার সামনে চলে এলে ঐ বলেই ডাকেন। সর্ব্বেশ্বর, জামিনী, হেমলতা প্রভৃতির মুখে নিজের কানেই শুনেছি।
সাইকেলটা কেনা হলো। কিন্তু চালাবেন কে? কেউ তো জানেন না। পলাশ জঙ্গলের পাশের মাঠে শুরু হলো অনুশীলন। সকাল, বিকেল, দুপুর যখনই সময় পান তখনই সাইকেল নিয়ে হাজির। একজন চড়ে বসেন উপরে, অন্যজন সাহায্য করার জন্য ধরে থাকেন ক্যারিয়ার। আর তাদের দেখার জন্য গাঁয়ের লোকের ভিড়। যখনই সাইকেল বেরোয় তখনই সমস্ত কাজবাজ ফেলে ছুটে আসে দেখতে।
গাঁয়ে সড়ক থাকলেও সেদিকে যান না। সেদিকে গাড়ি ঘোড়া। দু'একটা গাড়ি চললেও কখন আসে তার কোনো ঠিক নেই। একটুতেই বিপদ। মাঠেই সুরক্ষিত। গাড়ি নেই, ঘোড়া নেই, পড়লেও পাথর নেই। ধুলো ঝেড়ে উঠে গেলেই বেশ।
একটু একটু চালাতেই অনেকদিন লাগলো। তারপর শুরু হলো পাশ কাটানোর অনুশীলন। জঙ্গলের ভেতর গিয়ে চালানো। গাছেদের পাশ কাটিয়ে যেতে পারলেই বেশ! গাড়ি ঘোড়া, শহরের মানুষ সবাইকে পাশ কাটিয়ে যেতে পারবেন অনায়াসে। সমস্যাতে পড়বেন না কোথাও।
সমস্যাতে পড়তে হলো তখনই। গাছেদের ফাঁকে ফাঁকে চালাতে গিয়ে নাজেহাল হতে হলো তাঁকে। কিছুতেই ঘোরে না। সাইকেলের হ্যান্ডল সোজায় যেন যেতে চায় সব সময়। ঘুরলেও গাছের দিকেই ঘোরে। একবার, দু'বার, তিনবার, অসংখ্যবার গাছে গিয়ে ধাক্কা মারে সাইকেল। সামনের কভারটা বেঁকে যায়। আঘাত লাগে পায়েও। সকলেই বলে, "সাইকেল শিখতে গেলে রক্ত তো নেবেই। রক্ত না দিয়ে সাইকেল কি শেখা যায়?"
সাইকেল শেখা হলো রক্ত দিয়ে। শুরু হলো যাতায়াত। গ্ৰাম-গঞ্জ, রাস্তাঘাটের মানুষকে অবাক করে শুরু হলো হাট-বাজার, দোকানপাট, আত্মীয়দের বাড়ি যাওয়া।
যেখানেই যান সেখানেই একই ছবি। সাইকেল দেখা মানুষের ভিড়। ভ্যাবাচেকা হয়ে ওঠা সকলের। রাস্তায় যেতে যেতে সাইকেলের আওয়াজ পেয়ে তাকিয়ে থাকে মাঠের লোক, ক্ষেতের লোক। গাঁয়ের ভেতর যেতে যেতে তাকিয়ে থাকে গ্ৰাম সুদ্ধ মানুষ। আর আমার দাদু সাইকেল চালিয়ে চলে যান এক গ্ৰাম পেরিয়ে আরেক গ্ৰামের দিকে।
সম্পাদক : উত্তম মাহাত
সহায়তা : অনিকেতের বন্ধুরা
গাজনের ছবি- তপন পাত্র
পলাশের ছবি- দীপাংশু মাহাত
লাইন ড্রইং- দেবাশিস সাহা
যোগাযোগ : হোয়াটসঅ্যাপ - ৯৯৩২৫০৫৭৮০
ইমেইল - uttamklp@gmail.com







মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন