ডরোথী দাশ বিশ্বাসের এক গুচ্ছ কবিতা



ডরোথী দাশ বিশ্বাসের এক গুচ্ছ কবিতা

১.
নেই পিছুটান...


আকাশ বনানী জল মাটির সংসার,
দিঘল দিনমান, দিগন্ত ডোবে না ...
পত্রহীনা শীর্ণ শাখা, তবু স্থিতিস্থাপক,
কে ঐ দোলায় বসে বোনে স্বপ্নজাল ?

নেই এখানে ঝরাপাতার ফিসফাস,
জাদুমন্ত্রে কোলাহলও পোষ মেনেছে,
বলাকার কাছে শেখা এ বিরল ধ্যান,
মুক্ত এ প্রকৃতিও রচে অন্তরাল।

মুক্ত মন এই উদার আকাশে
ছড়িয়ে দেয় যত নিরুদ্ধ বিষাদ,
নীল জলে স্পন্দিত বেদনা যত
ভাসিয়ে আনে রোজ চন্দনসকাল।



২.
এক ছিলো শৈশব...


এক ছিলো শৈশব, ভীষণ রঙীন!
আপন মনেতে তার কাটে সারাদিন।

সারাদিন ঘরে বসে ভালো তো লাগে না,
মেঘ এসে জানালায় কেন ধরা দেয় না!

কিভাবে যে কেটে যায় ভাদ্রের বেলা,
মেঘ আর রোদ্দুরে লুকোচুরি খেলা।

বৃষ্টি এলো যেই নিবিড়ধারায় -
শিশুটির মন আর ঘরেতে না রয়।

গাছের গুঁড়িটি পড়ে আছে যেখানে
বৃষ্টিতে মাখতে সে আসে সেখানে

আকাশের পাখি নয়, আছে পোষ মানা,
শিশুটির পায়ে পায়ে ঘোরে দুটি ছানা।

ঝুম ঝুম বর্ষাতে হাওয়া অবিরল,
কচুপাতা ছাতাতে শিমুল তুলোর বল।

শিশু ভেজে রিমঝিম জলীয় রেখায়
মানবিক হতে তারে কে বলো শেখায় ?



৩.
চৌখাম্বা...


হে মৌনী পর্বতস্তুপ, গঙ্গোত্রী শিখরে,
পাথরের মঞ্চ যেন দিগন্ত বিস্তৃত,
চার স্তম্ভ চৌখাম্বা দেবসভা ঘরে
প্রথম আলোর টিপ, দিন যে আগত।

ভিউপয়েন্ট বুঝি ঐ দেওরিয়া তাল,
গাড়োয়ালী হিমালয়, পবিত্র সে স্থান,
সবুজের ছোঁয়া পেয়ে সাজের বদল,
প্রকৃতির রূপসুধা করো তুমি পান।

পাখির কাকলী আর ঝিঁঝি ঘন্টাধ্বনি,
উত্তেজিত শাখামৃগ করে হুপ হুপ,
ধূপের সুবাস ছাড়ে দেবদারু জানি,
প্রকৃতির ধ্যানমগ্ন অবারিত রূপ।

সূর্যের অভয় স্পর্শে উষ্ণ পবিত্রতা,
নশ্বরের মুগ্ধ চোখে অবিনশ্বরতা।



৪.
খ্যাঁওম্যাঁওমার্জারবিল্লীবাহাদুর...


মেঝে ভেসে যায় দেখো টলটলে জলে,
মার্জার বিস্মিত হয় প্রতিবিম্ব দেখে,
গায়ে ডোরাকাটা দাগ চোখদু'টো জ্বলে,
বিশাল চেহারা ভেবে খুশি ঝরে চোখে।

ঠিক যেন বাঘ বাঘ আমি যার মাসী,
জলদগম্ভীর ডাক মিউ মিউ নয়,
ছোট্টটি নই তো আর ঘরে থাকা পুষী,
সাহসেতে খুব দড় করি নাকো ভয়।

একই যে পরিবার ফেলিডি ফ্যামিলি,
শিকারে আমিও দক্ষ, তীক্ষ্ণ দাঁত নখ,
রাজকীয় পদক্ষেপে হেলে দুলে চলি-
ব্যাঘ্রসম মান পাবো চেপে যায় রোখ।

মার্জারের মনোভাবে দেখি মনস্তত্ত্ব,
ব্যাতিক্রমী চিন্তনেতে বিকাশে ব্যক্তিত্ব।



৫.
প্লাইয়া বণিতা


উজ্জ্বল গৈরিক আকাশের ভালে টিপ
সূর্য অস্তমিত এ ক্ষণে
বাতাস মৌসুমী এ সাগর মোহময়ী
এ কোন স্বপন দোলা মনে

এক ডুব সাগরে তৃষ্ণা মেটাতে পারে
বিজড়িত চুলে জলছাঁট
সিন্ধুজলের ঘ্রাণ আকুল করে প্রাণ
যেন শঙ্খচিলের পাখসাঁট।

শূন্য যে উপকূল জাহাজের মাস্তুল
কিছু নেই কেউ নেই সুবিশাল
জলরাশি সুগভীর জেলে ডিঙি নেই ভিড়
নৌকো ভাসে না নিয়ে পাল

কাজল জলের পটে দৃপ্ত গ্রীবাতটে
সূর্যের শেষ রশ্মিরেখা
রেখে যায় মাধুরী ছায়ায় ছায়ায় ঘিরি
দিব্য প্রকৃতির পাই দেখা।



৬.
লাইটহাউস...


আজ আমি সব বন্ধন ছিঁড়ে চলে এলাম সেই শান্ত পরিচ্ছন্ন সী বীচে
যেখানে পর্যটকেরা রৌদ্রকরোজ্জ্বল বেলাভূমিতে সানবাথ সেরে নেয়,
কখনো মগ্ন হয় ডুব সাঁতারে,

সম্পূর্ণ একা হয়ে আমি এসেছি সন্ধ্যায়,
রাতের আঁধারে,বঙ্গোপসাগরে গভীর স্রোতের কলধ্বনির সাথে শুধু একাত্ম হতে।

এই সেই ঊনবিংশ শতাব্দীর পুরোনো বাতিঘর,
দু'শো বছর ধরে অবিরত তোমাকে ছুঁয়ে গেছে সাগরের নোনা হাওয়া,
যেমন করে দীর্ঘমেয়াদী অবসাদ আমার চোখের পাতাকে ছুঁয়ে যায়,
পলেস্তারা খসে পড়েছে বার বার,
তবু সেজে উঠেছো তুমি, লাল সাদা রঙে,

কত জাহাজডুবির সাক্ষী তুমি,
কতো জলদস্যুর ক্রিয়াকলাপ দেখেও নিশ্চুপ,
ভূমধ্যসাগরের লাইটহাউস স্ট্রম্বলির মতো অবিরাম আলোর দিশারী তুমি, 
আজও বাতি জ্বালাবার দায় এড়াতে পারোনি।
আজও তুমি রাতের আঁধারে
যাত্রাপথের আলোকবর্তিকা।

তোমার কাছে সব কষ্ট গচ্ছিত রেখে যাবো আমি।



৭.
সোনালী ঈগল ও ব়্যাটল  সাপ


সোঁ সোঁ সোঁ                    ঈগল খায় পাক
ফোঁস ফোঁস ফোঁস           ফনা তোলে সাপ
ঊষর মরু প্রান্তর             ফণীমনসার ঝাড়
অসমযুদ্ধে জিতবে কে      শুভ বুদ্ধি যার

সোনালী ডানাটি মেলে ধরে
গলার কাছেতে দারুণ চাপ
ধারালো নখেতে জব্দ আজ
ভয়াল ব়্যাটেল সাপ

ঝুনঝুন ঝুনঝুন ঝুনঝুন     লেজেরই প্যাঁচে
ঈগল বুঝি হায়                 নিজের প্রাণ যাচে
ধূধূ ধূধূ ধূধূ                       ধুলিকণা ওড়ে
রুদ্ধ হয় শ্বাস                    কে বাঁচে মরে

সোনালী ঈগল সোনালী ঈগল 
কোথায় তোমার দেশ
তীক্ষ্ণ নখের আকশিতে 
ঝটপটানি শেষ

এ বন্ধনও নিবিড়               এ যে ডেথ ড্যান্স
জীবন্ত এ ছবি                   মেক্সিকান কোট অব আর্মস

অ্যাজটেকীয় উপকথায় 
অশুভ শক্তির বিনাশ হয়
সোনালী ঈগল সোনালী ঈগল
জয়ী হবে নিশ্চয়।



৮.
চিত্রার্পিতা...


শাখায় শাখায় কুঁড়ি ফুটিয়ে ক্লান্ত প্রেমিক সূর্য দিনান্তে আলোকরশ্মিজাল গুটিয়ে নিতেই অলীক এক জাদুঘরের নীরব কোণে শুষ্ক,শীর্ণ তবু রূপময়ী সেই মেয়ে আরাত্রিকের শুভ মুহূর্তে আধারে জ্বালে কর্পূর ও ঘৃতদীপমালা,ধূপ পোড়ে,মৃত্যুর অনিরুদ্ধ অন্ধকার ঠেলে চোখ ধাঁধানো হলদে শিখাকে আশ্রয় করে আরো কয়েকটা মুহূর্ত যেন বাঁচতে চাওয়া।

কে এই মেয়ে,যাঁর দৃষ্টি ছিলো মরণোন্মুখ চোখের পানাপুকুর,অথবা হৃদয় ছিলো তুন্দ্রার নিঃশব্দ তুষারপাতের ক্ষেত্র,এক সমুদ্র কান্না ধারণ করেছে সে কোন রোদনভরা বসন্তে,কান পাতলে সে রণনের অনুরণন বা সে ধ্বনির প্রতিধ্বনিও বুঝি কেউ শুনতে পাবে না,কেউ জানে না- সে দুখে আত্মমগ্ন,না সুখে আত্মহারা,এ চোখে যেন আটকে আছে কোন্ সুদূরতল্লাশী দূরবীন,সে পথ যেন আকাশগঙ্গার শ্বেতশুভ্র ছায়াপথ নয়,সেখানে পাতা আছে মহাকালের মৌনী ঘাসের গালিচা, রাতে ঝড়ের প্রাক্কালে ঘোর কালো আকাশের মতো থমথমে মুখে এ কোন চিত্রার্পিত নারী,যেখানে শিল্পীর সব রঙ রেখা মিলেমিশে একাকার হয়েও অসমাপ্ত রয়ে গেছে চিত্রকলা ? এ কোন নারী,এ কি কোন কবির উদ্ধৃত কাব্যপঙক্তিমালা যা হারিয়ে গেছে চিরতরে, হাতে তার দীপাধার,সম্মোহিতের মতো সে দৃষ্টিতে চেতনার পাথার সৃষ্টি হতে পারে কি কখনো ?







মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ছবি প্রদর্শ-শালা ।। আলোকচিত্র ।। মোহন পরামানিক

ছবি প্রদর্শ-শালা ।। আলোকচিত্র ।। শঙ্কর মন্ডল

ছবি প্রদর্শ-শালা ।। আলোকচিত্র শিল্প ।। মুকেশ কুমার মাহাত