জলশ্যাওলার বিরহকথা

জলশ্যাওলার বিরহকথা

দীপংকর রায়



৯ম পর্ব


 একত্রিশে কার্তিক, পনেরোই নভেম্বর :

            অলস এক বেলা । অনেক দিন পর এখানে আমার সঙ্গে গাছাড়া দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।  
               কোনো কাজ নেই। খাওয়া আর ঘুম। আর মাঝে মাঝে যা মনে আসে তাই লিখে যাওয়া। যে প্রেরণায় এর আগে অন্যান্য কিছু লিখতাম তা কোথায় কত দূরে যে হাওয়া বাতাসে গুঙিয়ে বেড়াচ্ছে, তাকে আর খুঁজে পাই না। কয়েকবার ভেবেছি এদিক ওদিক একটু যাই, কিন্তু কী এক ভয়ে কেন যে কুঁকড়ে আছি তাও বুঝতে পারছি না।  
             ভাবি, যেখানে যাই, গিয়ে একটু শান্তি পাবো, তাও তো মনে হচ্ছে না। তবে সব জায়গাতেই যেতে হবে যে একথাও তো সত্যি। নিজের অবস্থার কথা কাকে আর বলি ! এদিকে এদেশে এলে ধার বেড়েই চলে। ঈশ্বরের কোনো অনুকম্পাই কী আছে আমার জন্যে কোথাও একটু ? 
               সকালে ভাবলাম টেলিফোন করবো, কিন্তু করতে গেলেই যে খরচ তা সামলে উঠতে পারবো বলে তো মনে হয় না ! এখানে একটি ছেলের সাইকেলের পেছনে উঠে ঈদগাঁয় গেলাম। আজ ঈদুজ্জোহা পালন করছে মুসলমান সম্প্রদায় ---- ছোটো ছোটো ছেলে-মেয়েদের নতুন জামা কাপড়ে টুপি মাথায় দিয়ে ঈদের মাঠে যাওয়া দেখে ভীষণ ভালো লাগছিল। যদিও কিছুক্ষণ বাদে আর একটি কথাও মনে পড়ছিল, পুজো-পাব্বনে দিন দিন মানুষজনের সমাগম কমে আসা দেখে। যেমন প্রতিমা নিরঞ্জনেও দিন দিন আর আগের মতো লোকজন হয় না। জোড়োনের নৌকোও লাগে না আর আগের মতো। দিন দিন প্রতিমা-মূর্তি পাল মশাইকে ছোটো করতে বলে বলে , এখন আর  সে কাজেও বেশি মানুষের প্রয়োজন হয় না। চারজন মানুষ হলেই নিরঞ্জন হয়ে যায়। সঙ্গে থাকে কিছু কচিকাঁচা। ঢাকিও আগের মতো তার উদ্দাম নাচ দেখাতে পারে না, ধুনুচি নাচেও আর আগের মতো নৌকার মাঁচা নাচতে থাকা দেখা যায় না। সন্ধ্যা লাগতে না লাগতেই কয়েকটি ঘাট ঘোরাঘুরি করার পরেই বিসর্জনের নৌকার মুখ ঘুরিয়ে ফিরে আসে ঘাটে। 

               আজ আর দীর্ঘ করতে ইচ্ছা করছে না লেখা। কোথা থেকে নতুন কিছু ভাববো যে তাই ভাবছি । সত্যি কি তা হবে ! কেবলই এক গভীর উদ্বেগে ভেতরে ভেতরে লেটিয়ে  রয়েছি। অথচ যাতে মাথা ভর্তি হয়ে আছে,  সে কাজটাই করতে পারি না। 
                সকালে উঠেই কলকাতায় ফোন করলাম। দূরে থাকলে সংসারের প্রতি টান বাড়ে। ছেলের সঙ্গে কথা হলো। সাথী ধরলো না। কেন যে ও এরকম করে ! আসার সময় যদিও বার বার বলেছিল, সপ্তাহে একবার ফোন করবে। ঘনঘন ফোন করে টাকা নষ্ট করো না। ওখানে তোমাকে কে দেবে অত টাকা ? মিনিটে বাইশ টাকা লাগে এখন। এর আগে তো বাইরের থেকে করতে মিনিটে লাগতো পঞ্চাশ টাকা। এক মিনিটে তো আর কথা শেষ করা যায় না। তাহলে বোঝা যায়, টাকার শ্রাদ্ধ হত কীরকম !  
                তাই ওর কথা ধরলে , এখন কলচার্য কম হলেও আশি টাকা কাটলো দেখলাম। সে যাই হোক, আমার মন তো খানিকটা দুশ্চিন্তা মুক্ত হলো ! যদিও দুশ্চিন্তা আমি খুব বেশি একটা করি না এসব নিয়ে। 
                তাই ওর কথা রাখতে পারলাম না। জীবনে এত চুলচেরা হিসেব করে কি বেঁচে থাকা যায় !  
                আজকেই রাড়ীখালী ছাড়বার কথা ছিল , কিন্তু তা হলো কই ? এখানে ছাড়ার আগে ইচ্ছা ছিল তার সঙ্গে একবার কথা বলবো। কিন্তু সাহসে কুলিয়ে উঠতে পারলাম না। ভাবলাম, আমার ফোন করাকরিতে তার যদি কোনো সমস্যা তৈরি হয় ! তাই ভাবলাম, থাক পরে দেখবো। সেই জীবনানন্দের ভাষায় --- 'কে হায় হৃদয় খুঁড়িয়া বেদনা জাগাতে চায় আর…. '  
                আমার অবস্থাও হয়তো তাই খানিকটা । কিন্তু এখানে এলে যে তার কথাই মনে পড়ে বারবার। 
                খাওয়া, ঘুম , একটু এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি , আর ব্যর্থ চেষ্টা করে যাওয়া লিখবার জন্যে। গদ্য ? দূরস্ত ! গদ্য লেখা কি খুব সহজ কাজ ? একটানা একজায়গায় বসে একটা ঘোরের মধ্যে ঘটনাপুঞ্জের সারতসারে পৌঁছনো কি খুব সহজ কাজ ?  
                তাই সেই সুস্থতাও নেই শরীর মনের ,যা নিয়ে এগোবো। ইচ্ছা তো ছিল, দেখি পরের ধাক্কায় পারি কি না। একটুখানি প্রেরণা পেলেই কিছু একটু হয় ; কিন্তু সেই দুর্লভ বস্তুটির দেখা পাওয়া যাবে কোন্ মাহেন্দ্রক্ষণে ?  এখন বেলা যে অনেক, নিছক ঘটনার পর ঘটনা সাজিয়ে একটা কিছু গড়ে তোলার স্বাদ যে কোথায় তলিয়ে গেছে! ঠিক যেভাবে চাই, যে আলোড়নে সেসব গড়ে ওঠে, তা কখন যে কে কোথা থেকে পাবে, সে যেন এক রহস্যের বিষয়। 
               এই যে সকালবেলায় কুয়াশা জড়িয়ে গুরুপদর ছেলের বউ ও ছেলে, বড় মামার ধান মাড়াই করতে এসেছে, ধানমাড়াই মেশিনে, একশো পঁচিশ আঁটি ধান মাড়াই করে সে পাবে শুধু খড়গুলো। তাও একেবারে বিনে পয়সায় নয়। শয়ে পঞ্চাশ টাকা দিতে হবে আরো তাকেই ! 
             এখানে কি গল্প লুকিয়ে নেই ?  
             সেই ছেলেবেলায় দেখা গুরুপদর বউয়ের স্নেহ মমতা মাখা দুটি হাতের কত পরিচর্যার কথাই তো স্মৃতিপটে আঁকা আছে। নবগঙ্গা, তুমি এত নিষ্ঠুর হলে কী করে ? সেই মালো সম্প্রদায়, একবেলা ঝাঁকা বোঝাই মাছ পেলেই তো তাদের আহ্লাদের আর সীমা থাকে না। নদীতে নাকি মাছ নেই। তাই তাদের জীবিকাও নেই। পাল্টে গেছে জীবিকার ধরণ।  কটি গাই-গোরু , তাদের দুধের উপরেই এখন সংসার চলে। এবং সেই কারণেই এই ধান মাড়ানো। খড়ের যোগাড়। জাতব্যবসায় ভাত নেই যে !

চৌঠা অঘ্রাণ , ১৯ নভেম্বর 

                গতকাল বৃহস্পতিবার ছিল। দুপুরের দিকে রাড়ীখালী থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। পেছনে পেছনে পাড়ার কালু ভুলুর মতো হাওয়ায় বাতাসে চলতে থাকলো আমার নানা স্মৃতিরা ----- যত তাদের বলি, আর কতদূর আমার সঙ্গে সঙ্গে পা মেলাবি ? এবার ফিরে যা। এরপরে এ পাড়ার তোদের জাতভাইএরা যদি দেখে তোরা চলে এসেছিস এত দূর, তাহলে দেখবি তাড়া করবে, কেউ কি কারো জায়গা দেয় ? এই যেমন তোরা যা কিছু গুছিয়ে-গাছিয়ে জড়ো করে রেখে দিস সারা বছর ধরে, তার পরে আমি এলে সমস্তক্ষণ তো কেঁউ কেঁউ আছেই তোদের, কুঁই কুঁই করে কতো আহ্লাদে আটখানা হওয়া ; কি মনে করিস, আমি কি জানি না তোরা যে সকল সময় আমার সাথে সাথেই থাকিস ! ওই যে, যখন নদীর ঘাটে যাই, তখন জলের উপর যে ঢেউ খেলে যায়, সেখানেও তো তোদেরই লেজ নাড়া ; তা কি আমি বুঝি না ভেবেছিস, কতো কিছুতে যে তোরা ধানে পাটে ঘাসে পাতায় যে মায়া কাজল বিছিয়ে রেখেছিস, সেখানে তোরা যে কত কিছুতে  রূপান্তরিত হয়ে আমার হৃদয়-মনে মাথায় হাত বুলিয়ে দিস, কতবার যে আমি তোদের এই খেলায় ভিরমি খেয়ে পড়ি, তার কতটুকু জানিস ?  তাই বলছি, যা এখন এখান থেকে, আমি নদী পার হয়ে ফিরে যাই, তোরাও ফের। আমি এবারে আর কারো সঙ্গে সঙ্গে এগোই ----- । 
                পেছনে পেছনে মায়া-মমতায় গড়া এই সব সহযাত্রী হতে চায় যারা, কিছুতেই সামনে তাকাতে দেয় না, পেছনে টানে, কি করি তখন ? নিরুপায় হয়ে তাড়াই। জুলজুল করে ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকে। ভারি কান্না পায় তখন। চোখে জল এসে গেলেও তাড়াই দু হাত তুলে, বলি, যা যা, যাতো এবার ----; 
               শুক্র ও বৃহস্পতিবার কোনো অবসর ছিল না। তাই  শনি, আজ লিখবার চেষ্টা করছি ----  
                গতকাল যখন সাথীর বোনের বাসায় এসে দাঁড়ালাম, তখনি তো এদের হাতে ধরিয়ে দিলাম, তারপর তো চললো এগোনো আর পেছনো কিছুক্ষণ ! কলকাতায় এর উপস্থিতি ছিল যেন ঝড়ের গতি। গেল, এবং সমস্ত জয় করে ফেললো। এবং তার পরের দিনই চলে গেল। আর তারপরই সব চুপচাপ। দীর্ঘদিন কোনো সাড়া শব্দ নেই। আজ হঠাৎ আবার তার সঙ্গে দেখা। বুঝতে পারছি না। কী চাইছে। সমস্ত সময় একেবারে জড়ানো ছায়া যেন আলোয় পড়ে। এমন করছে যেন কতকালের সম্পর্ক ! কেবলই মনে হচ্ছে ও যেন কিছু বলতে চায়। নাকি তাও না ! তবে কেন কেবলই আড়ালে নিয়ে যাচ্ছে আমায় জামার খুঁটটি ধরে টানতে টানতে ?  তারপর কোনো কথা নেই কেবলই চেয়ে থাকছে মুখের পানে। এ আবার কোন্ পাগলের পাল্লায় পড়লাম রে বাবা ! মনে মনে ভাবছি, অল্প বয়েস, তাই ছেলেমানুষী মন তো, তাই অমন ! 
                যত এইসব ভেবে মনকে স্বাভাবিক করি ততই মনে হয়, না তো, তাও তো না ! এই মায়াচোখের দেখা  কোথায় আমি যেন দেখছিলাম, মনে নেই। নাকি সেসব মনে করতে চাইছি না ?  
                সেইসব অনিদ্রা রাত্রি গুলি, রক্তচাপ বেড়ে যাওয়া, কী পেয়েছিলাম ? তবুও পেরেছিলাম কি দু'হাত দিয়ে ঠেলে ফেলে দিতে ? পারিনি। শুধু শুধু কটা রাতের ঘুম, বেঁচে থাকা, অসুস্থতা, এইসব নিয়ে যেন কিছুক্ষণ কসাইখানায় গলায় দড়ি পরিয়ে ছাগল হয়ে ঝুলতে থাকা, কাটা ছাগলটির দাবনা থাই অণ্ডকোষের ঝুলে থাকা, পাঁজরা বের করা হাড়পাঁজরার  সঙ্গে ঝুলতে থাকা চর্বি যকৃৎ-এর দশা দেখতে থাকা যেন। মনে মনে ভাবা, কখন আমার ডাক আসবে, আর আমাকে অন্ধকার ঘরে নিয়ে গিয়ে এই পৃথিবীর শেষ ম্যা ….ম্যা … করতে করতে স্তব্ধ হয়ে যাওয়া সেই অবস্থার কথা মনে পড়ছে শুধুই, সেই দিনটার কথা মনে হল যখনই ----  
                কিন্তু এ যেন মনে হচ্ছে আরো অন্য খেলা !  
                গতকালই তো তার সঙ্গে কথা হলো, একটি কথাই বার বার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে, বার বার প্রতিধ্বনিত করে তুলতে চাইছিল যেন, "এসব দিয়ে আর কী হবে , রাগ দুঃখ অভিমান দেখলেন তো ? দেখছেন তো জীবন কীভাবে ফুরিয়ে আসছে একটু একটু করে !"   
                সেই থেকেই ভাবছি তার কথাগুলি। ভাবছি। আজ ভীষণ ভাবাচ্ছে সে।  
                 কিন্তু এর মধ্যে এই মায়া টান যে ! এই ন্যাওটা ভাব, পাশে রেখে জড়িয়ে ধরে  সমস্ত শহর রিক্সায় চড়ে চক্কর, এইসব,  এসব কি শুধু মাত্র এদের রীতি রেওয়াজ, না অন্যকিছু ? 
                মাগুরার এ এক বিখ্যাত পুজো। কার্তায়ণী। এ পুজো কলকাতা কেন সারা ভারতেই হয় কিনা জানি না। এই পুজোর জন্য এখানের মানুষের সারা বছর ধরে একটা অপেক্ষা থাকে। আনন্দ উৎসব হয়। মন্ডপে মন্ডপে লাইট জ্বালিয়ে বক্স বাজিয়ে ডিস্ক মিউজিক আর তার সঙ্গে রঙবেরঙের আলোর ঝলক ; সেই দেখতেই হুড়োহুড়ি । প্রতিমা দর্শন। সে এক অদ্ভুত নাচাগানা। আজ সেখানেই ঘুরে ঘুরে বেড়ানো । কিন্তু আমি আগেই দুহাত তুলে দিয়েছিলাম পারবো না বলে। বলেছিলাম, তোমরা যাও ভাই, আমি তোমাদের বাড়ি পাহারা দিচ্ছি।  
                 কিন্তু না, শ্যালিকা, তার শ্বাশুরি এবং ননদ, ভায়রা, ননদের বর, এরা কেউ ছাড়ে না। শালা বউ, ও কিন্তু যাবে নাই বলেছিল। কিন্তু শেষপর্যন্ত সেও আমাকে আঙটায় ঝুলিয়ে বের করেই ছাড়লো।  
                একটু আলাদা ভাবে ছাদে বসে কাটাতে চেয়েছিলাম। শেষে দেখলাম ছাড়লো না। ছুটল আমাকেও নিয়ে। একেই বলে সময়ের টান !  
                 কিন্তু এই যে একবার একসাথে না যেতে চাওয়ার সিদ্ধান্ত উভয়ের, এটা অন্য মাত্রা নিচ্ছে এই ভেবে শেষে রিক্সায় চেপে বসলাম তারই সাথে। ভেতরে ভেতরে একটা লজ্জা বোধ হচ্ছিল। মনে হলো, বিষয়টা যেন গোপনে গোপনে তার সাথে আমার একটা যৌথ পরিকল্পনার অংশ ।  
                 মনে মনে ভাবলাম এই শেষ হেমন্তের রাতে, কোন্ নিয়রে কথা দিয়েছিলাম এর আগে কাকে যে, নাকি এ কথার শেষ নেই কোনো ? চলো, যেভাবে এই শিশিরে মাখামাখি সংলাপ আওড়াতে হয় তেমনই আউড়ে যাবো। চলো এ পর্বে কথা দিয়েছি যখন কোনো একদিন হয়তো তোমায়ই  ---- তাই আর কিই বা করা, চলো ভিজি এই রাতের নিয়রে , হাজার আলোর মাঝে,  নাকি সে আলো নয়, অন্ধকার, অন্ধকার….? 
                  এসো, দুহাতে হাত রেখে লক্ষবছরের এই অন্ধকারে কর্তাল বাজাই খানিক সময়।

২০ নভেম্বর,  পাঁচ-ই অঘ্রাণ 

              শুক্রবারের একটি বড় অংশ দেখছি কিছু বলতে চাইছে। জায়গাটি যশোরের খাজুরাহ রোড। খাজুরার কাছেই। শ্যালিকার ননদের শ্বশুরালয়। যেখানে যেতে হলো শ্যালিকার দেওরের অনুরোধে। জায়গাটি যেহেতু খাজুরার পাশে, এমন একটি জায়গা, যেখানে যেতে যেতে বারবার মনে হচ্ছিল, কবে থেকে যেন এখানের সঙ্গে একটা সম্পর্ক ; কিন্তু সেটা কীভাবে ?  
              নাম শতখালি । একাত্তরের কথা মনে পড়ছিল। শরণার্থী হয়ে ছুটে চলেছি মাথায় জামাকাপড়ের পুটুলি। পরনে হাফপ্যান্ট। হ্যাঁ হ্যাঁ, এই পথেই তো, জিজ্ঞাসা করতেই মিলে গেল, 'আসপা বোরোইচাড়া, কুল্লে কুচেমোড়া,' ….সেই স্কুলবাড়ি। জেলেদের আস্তানা। হঠাৎ সিদ্ধান্ত পাল্টে গ্রামে ফিরে যাবার সঙ্কল্প। সকলের অনুরোধ, 'গ্রামে ফিরে গিয়ে কী পাবো !' …. তবু কে শোনে কার কথা, নাছোড় আমি । যদিও রাত ভোর হতে না হতে, আবার ভারতের পথ ধরা। জন-বৃষ্টি-কাদা --- কাঁকর বিছানো পথ। পা ফুলে ওঠা । অনাহার । অনিদ্রা। আতঙ্ক । সবই চলেছে সাথে সাথে। হৃদয়ে আর একটি কথার অনুরণন, কতকাল পরে মা-ভাই-বোনকে দেখতে পাবো যে !   
                 জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলাম। এই তো, এখান থেকে একটা মাঠ পাড়ি দিলেই নাকি কুচেমোড়া স্কুল বাড়ি। আহা ,যদি একবার গিয়ে দেখে আসতে পারতাম, বড় ভালো লাগতো মনে হয়।  
                একাত্তরের সেই স্মৃতি এদের বাড়ির পাশের ফাঁকা মাঠটি যতদূর দৃষ্টি যায় আমায় নিয়ে চললো উড়িয়ে কিছুক্ষণ। তারপর একসময় কোন্ দূর আকাশ ছাড়িয়ে এক চক্কর ঘুরিয়ে এনেই ফিরিয়ে দিল এদের জীবনের বর্তমানের দিকে। সেখানে সেই নষ্টালজিয়া আর যেন একজায়গায় স্থির হতে দেয় না কিছুতেই। মনে হয় তাদের এই অভিযোগ, অনুযোগ, দেশ ভাগের লাভ ক্ষতির হিসাব সবশুদ্ধ নিয়ে কত বেদনার অনুভবের কথার সঙ্গেই না মনখারাপ তৈরি হয় একেকবার। আর একবার যেন মনে হয়, তারপরও কি আমার এই মনটায় যে বিলাস বাসনা এসে ঘিরে ধরে, সে যে চায় প্রতিমুহূর্তে পুনরায় এই দেশেরই নাগরিকত্ব, তার কী হবে?  
                আবার পথের মাঝে যে পরিবারটির সঙ্গে আলাপ হলো, তাদের বিবাহিত জীবনের নানা কথা, সেই সম্পর্কিত শ্রেণী বিভাজনের, জাত ধর্ম নানা কিছুর সমস্যা পেরিয়েও তারা একসঙ্গে ঘর করছে নানা প্রতিকূলতাকে ডিঙ্গিয়ে, সে কি কম কথা ? তার মধ্যেও আবার বিবাহের পরে বউটি লেখাপড়া শেষ করেছে। তাদের একটি সন্তান । স্বামী থানার দারোগা । এইসব গল্প--- তার সারল্য , জটিলতা , সচ্ছন্দ, অসচ্ছন্দ জীবন যা দেখে মনে হলো এইসবের ঘোরের মধ্যে যেন আমার আর একটি জীবন ঘুরে ফিরে এল এক মুহূর্তের মধ্যে।  
                তারা নেমে যাবার সময় তাদের ঠিকানা দিল। বারবার অনুরোধ করলো তাদের ওখানে যেতে। কিন্তু কোনোদিনও কি আর তাদের সঙ্গে আমার দেখা হবে ইহজীবনে ?  

                 আজ শনিবার ।  খুব সকালে সাথীর সঙ্গে কথা হলো । জানালাম আজ তার বাপের বাড়িতে যাবার কথা।  তাদের দুই বোনের সঙ্গে কথা বলিয়ে দিলাম। একজনের চোখের জল দেখতে পাচ্ছি। আর একজনের চোখের জল তো দেখতে পাচ্ছি না ! কেন জানি আমার চোখও জলে ভরে গেল…. ।

                  বাইরে কি হেমন্তের আকাশ? শস্যফুল ফুটে উঠছে। মাঠময় দুলে উঠছে তার সোনা। আমি আকাশের রোদের রঙের সঙ্গে এই হলুদ মিলিয়ে দিয়ে চেঁচিয়ে উঠতে চাইছি যেন এই বাস যাত্রার মধ্যেই। আমার হাতের মধ্যে এখন যে হাতটি তার বয়সের অনন্তে হারিয়ে ঘুরিয়ে আনছে যে অনুভব, তা কি আমার কখনোর আকাঙ্ক্ষিত ধন হতে পারে ? তাহলে আমি কেন এই পথের যাত্রার মধ্যে এমন ভিরমি খেয়ে পড়ছি থেমে থেমেই । শরীর কি শরীরের মূল্য এমন ভাবেই চাখায় ? বড় অসহায় এই জীবনের সকল রসায়ন। বড় অসহায় মানুষের মন ! তা যে কখন কোন্ দিকে, কোনখানে ভিরমি খেয়ে নিঃশব্দে একটি মিথুন মূর্তি চায় অন্তরের বিচিত্র পর্বে, তা যেন কেউ কোনোভাবেই জানে না আগে ভাগে। ওহে অন্তর, ওহে তোমার অনাকাঙ্ক্ষিত না কাঙ্ক্ষিত এই সকল অভিপ্রায় , তা কি তুমি জানতে কখনো ?

                  বাইরের যে প্রকৃতিকে দিয়ে আড়াল চাইছে এই ঘেমে নেয়ে ওঠা বাস যাত্রার অফুরন্ত চিত্তচাঞ্চল্য ; সেই অলিখিত অনুল্লিখিত উৎসর্গে কে যে কার দিকে যায় বয়ে কুলহারা হয়ে, সে কথা তারাই জানে। এসব প্রেরণা অনুপ্রেরণার মধ্যে দিয়ে আপাত যে শব্দগুলি উচ্চারিত হতে পারে তাকে ভাষায় উল্লেখ করলো তো সেই যেন ----যদিও তা এলেবেলে, সাধারণ শ্রেণীর মানুষ-জনের কথা ----- তাও তুমি কি এত অসাধারণ হলে বাপু, বলেই ফেল না, কে আর মাথার দিব্বি দিল তোমাকে, না বলতে ?  
        ------ থাক থাক, না বলতে পারো তো থাক, কেউ শুনতে চাইছে না ,কেউ দেখতে চাইছে না সে অন্তরের মুহুর্তের কালি ঢালা মুখটি ! যে কিনা নিজেই জ্বাললো ধুনি, সেই বলছে কিনা, তুমিই বারিয়ে দিলে লোহা---? 
                ওহে ছলনাময়  ,ওহে নিদারুণ বেদনা- বিরহ , তোমার অন্তর পথে কার যে কখন এমন যাত্রাপথ খুলে দিয়ে তুমি নিজেই হও রক্তাক্ত, তা বোঝা দায়, এতটাও পারো দু'হাত ভরে গ্রহণ করতে ? 
                  মোক্ষম ঘাই খেয়ে একেবারে মুষড়ে পড়েছো ? কী আর সমাধানে আসবে ? মাথাটা বেশ ঘুরতে লাগলো। কিছুক্ষণ একা থাকতে চাইছে মন ? তাও তো কই , তাও তো না ! আবারও ভাবনা এসে অন্য এক আঙ্গিকে প্রসঙ্গ পাড়তে শুরু করলো। গৌরদের তুচ্ছামি ; বলা, খান, খান, খুব করে খান ব্যানসন….. 
                  সে একপ্যাকেট উপহার করে হয়তো ভাবছে, আহা, কেন যে দেড়শো খসিয়ে দিলাম ? শালা তো বোঝে না, ওই দেশে শালাকে কাজে লাগে যে প্রতিমুহূর্তে ; এইটুকু না করলি তো, একপাও নড়বেনানে। কবেনে , ও হারামী, শালা, গেছিলাম তো ওই দেশে, সকলেই কত কিছু দিলে, তোমরা শালা  একপ্যাকেট  সিগারেট দিয়েও তো ঠেঙাওনি !-----  এই জন্যিই শালা পেছন মারলো, আমরাও পাইতে দিছি…… !  
                 আমি জানি, এই ভাষাতেই ওর মুখ না বললেও ওদের অন্তর বলেছে, যা ওর ঐ ভাষার মধ্যেও  লুকোনো ছিল । 
                 ভাবছি, ঢাকায় যাবো কিনা। নাকি এখান থেকেই ফিরে যাবো ? 

                 সিগারেট ধরিয়ে এদের দু'বিঘের বাঁশ জঙ্গলের সরু পথ ডিঙিয়ে ঘাটের কাছে যাওয়া। মৃদু বেগবতীর ঢেউ দেখা । আবার ঝোপ-জঙ্গল একটু ফাঁকা যে জায়গায় এ বাড়ির গোরুগুলি বাঁধা আছে, সেখানকার বকনা বাছুরটি, সদ্য গাইগোরু  হয়ে উঠেছে যে,  সে যেন মাথা ঝাঁকিয়ে আহ্লাদ করে বলে উঠল, কি জামাইবাবু , আমাদের দিদিটারে নিয়ে এলে না কেন ? বেশ মজা মারছো তো একা একা, পারো তুমি, ধেড়ে কেষ্ট হয়ে এখনো কিরকম চালিয়ে যাচ্ছ মাইরি …..!  
                 নিজের মনে নিজেই গোরুটা এবং আমি। কাউকেই বোঝাতে পারি না। আচ্ছা বলো, আমি কি চেয়েছি এই অস্থিরতা ? অথচ ভাগ্যের কি পরিহাস, আমার কপালেই জোটে যত দুর্বিপাক……

                                                চলবে…..








মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ছবি প্রদর্শ-শালা ।। আলোকচিত্র ।। মোহন পরামানিক

ছবি প্রদর্শ-শালা ।। আলোকচিত্র ।। শঙ্কর মন্ডল

ছবি প্রদর্শ-শালা ।। আলোকচিত্র ।। সন্দীপ কুমার