দ্বিতীয় বর্ষ ।। চতুর্দশ ওয়েব সংস্করণ ।। ৭ কার্তিক ১৪২৮ ।। ২৫ অক্টোবর ২০২১





করোনা পরিস্থিতির মধ্যে ১০০ টাকার সরষে তেলের দাম ২০০ টাকাতে এসে দাঁড়িয়েছে। সেই সঙ্গে তাল মিলিয়ে বেড়েছে অন্যান্য জিনিসপত্রের দাম। সরকারি ঘোষণা না থাকলেও, করোনা পরিস্থিতির আগে যে দূরত্ব অতিক্রম করার জন্য বাসে ১৫ টাকা গুনতে হতো; এখন গুনতে হচ্ছে ৩০ টাকা। সেই হিসেবে ট্রেন ভাড়াও বেড়েছে। বেড়েছে টেক্সও। কারণ ১০০ টাকাতে যেখানে ৫ টাকা দিতে হতো, ২০০ টাকা হওয়াতে দিতে হচ্ছে ১০ টাকা। অর্থাৎ সাধারণ মানুষ যখন কাজ হারিয়ে চরম সমস্যার মধ্যে দিন যাপন করছেন ঠিক সেই মুহূর্তে তাদের উপর বর্ষানো হচ্ছে মরার উপর খাঁড়ার ঘা। 
              শুধু কি তাই? মানুষকে মেরে ফেলার আরও অনেক পথ খোলা আছে সরকারের। ২০২২ সালের মধ্যে ইন্দিরা আবাসের ঘর দিয়ে শেষ করার একটা প্রাথমিক লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। যা এই প্রকল্প শুরুর মুহূর্তে থাকা বাজার মূল্যের হিসেবে ১ লক্ষ ৩০ হাজার নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে বাড়ি নির্মাণের সেই সব  প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছে। মিস্ত্রি এবং শ্রমিকের বেতনও বেড়েছে অনেকাংশে। কিন্তু ইন্দিরা আবাসের জন্য সাধারণ মানুষকে পাঠানো টাকার পরিমাণ থেকে গিয়েছে একই। ফলে সাধারণ মানুষকে পড়তে হচ্ছে চরম সমস্যাতে। ইট কিনতে গেলে বালি কেনার টাকা থাকছে না। আবার বালি কিনলে সিমেন্ট কেনার টাকা থাকছে না। তারপর রয়েছে মিস্ত্রি এবং শ্রমিকের বেতন। ফলে ২০২০ এবং ২১ এ যে সকল মানুষের ইন্দিরা আবাসের টাকা এসেছে, তাদেরকে পড়তে হয়েছে চরম সমস্যায়। যে টাকা দেওয়া হয়েছে তাতে ঘর করা সম্ভব নয়। আবার ঘর না শেষ করলে সরকারি তলব, কেন শেষ করোনি? 
            ইন্দিরা আবাস পেয়ে শাঁকের করাতের মধ্যে পড়েছে এইসব মানুষগুলো। তাদের মুখ থেকে অনিচ্ছা সত্ত্বেও বেরিয়ে আসছে, এমন ঘর না পেলেই ভালো ছিল।



উত্তম মাহাত, সম্পাদক

________________________________________________
যাঁদের লেখায় সমৃদ্ধ হলো এই সংস্করণ
________________________________________________
প্রতুল মুখোপাধ্যায় / বিশ্বজিৎ লায়েক / ডরোথী দাশ বিশ্বাস / উৎপল চট্টোপাধ্যায় / সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায় / অয়ন জোয়ারদার / উজ্জ্বল রায় / মুজিবর আনসারী / পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায় / সুজন পণ্ডা / পিন্টু ভট্টাচার্য / তপন পাত্র /  দীপংকর রায়
________________________________________________



অকবিতার অজুহাত

প্রতুল মুখোপাধ্যায়


লেখার তো নেই কাব্যভাবের লেশ;
লেখকের নাম অনেকেই নেবে চিনে।
এরকম লেখা ছাপানো কি সঙ্গত
পরিচিত এক লিটল ম্যাগাজিনে?
বুঝতে পেরেছি, তুমি কি বলতে চাও।
লেখাটি মোটেই কবিতার মতো নয়।
বাইরে যা দেখি, সবই কি দেখার মতো?
বুঝি বেমানান, তবু মেনে নিতে হয়।
ধরেই নাও না, ও পাতায় কিছু নেই।
পাতা ওল্টালে আপনিই যাবে সবে।
তার পরেই তো আসবে সুকবিতারা;
পাঠকের মন তারাই তো দেবে ভরে।
খুঁত-দেখা চোখ সত্যিই হিতকর;
দূষণ-রোধে তো নিত্য প্রয়োজনীয়।
আমি বলি যদি সজীব থাকতে চাও,
ক্ষমার চশমা মাঝে মাঝে পরে নিও।

বলতে পারি না, কেন এ ভাবনা জাগে।
নিষ্কলুষকে বড়ো কৃত্রিম লাগে।




শরীরই আসল গণিত

বিশ্বজিৎ লায়েক


১.
ঋতুমতী শরীরে তোমার


তুমি জেনে গেছো আস্বাদের গোপনীয়
আমার অকস্মাৎ ভেসে যাওয়া
তোমার নৌকায় 
দেখো আজ ঋতু ছুঁয়েছে তোমার শরীর
জল শুধু জল শরীরে সমুদ্র লবণ
তুমি স্পর্শ না দিলে শুধু রাতের ভেতর
মিশে যাবে হিম আর হিমোগ্লোবিন ভোর

ফাগুন ঋতু চুপচাপ শুয়ে আছে শরীরে তোমার
তুচ্ছ যুবক আমি 
হা ঈশ্বর কোলকাতা থেকে নিভে যাচ্ছে সুপ্ত প্রত্যাশা
ঋতুমতী তুমি এবার মেঘ পাঠাও
সমস্ত আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামুক
শূন্য এ শরীর ভিজিয়ে নেবো



২.
চুপচাপ শুয়ে আছে চিরহরিৎ অরণ্য


তুমি চেনাও অরণ্য, তুমি চেনাও জল
সঙ্গোপনে দীর্ঘ সরলরেখা, মৃদু বাস্প চাপ
আমাদের ছলাৎছল স্তব্ধ আয়োজন
তুমি কি ভাসাতে পারো গোপনে শরীর
                  তীব্র তীব্র জলোচ্ছ্বাস

তুমি শুধু কথোপকথন, কেঁপে ওঠা শৈত্যপ্রবাহ
নীরব বীজের অঙ্কুরণ
তুমি শুধু অরণ্যজীবন
গোপনীয় আকাঙ্খা বল্কল ছেড়ে তুলে আনছ
                          চিরহরিৎ জল



৩.
অরগ্যাজম শরীরে তোমার


মেয়ানো মুড়ির মতো বিস্বাদ প্রেম এখনও লেগে আছে ঠোঁটে
এখনও লেগে আছে বিষণ্ণ আলো দোমড়ানো মানুষের মুখে
পেঁয়াজ শল্কের মতো রাত 
রসায়ন শেষ হলে ফিনফিনে রঙ নিয়ে খেলা করে 
                                         শুয়ে থাকা আলো                                          
ভালোবাসার আগে যে স্বপ্ন শুয়ে থাকে কোমরের নীচে
তারও নীচে নেমে এসে দেখো কে যেন ছড়িয়ে গেছে ভোরের আলো



৪.
বৃষ্টিতে ভেজার গণিত


যারা এখনও শেখেনি বৃষ্টিতে ভেজার গণিত
তাদের ঈশ্বরী মেনোপজ পেরিয়ে
                             নিস্তব্ধ শীতল
শরীরের জল ছাড়া প্রেম অনুভব করার পুরুষ নই আমি

প্রেম তো ছলনা মাত্র
শরীরই আসল গণিত

অতএব
মেজাজ ঠিকঠাক রাখতে শরীর জলে নৌকা ভাসাও
দ্যাখো
প্রেম তো ধারণা মাত্র
শরীরই আসল গণিত
                        আরও কবিতা পড়ুন






জড়িয়ে আছি সোনা রোদের মতো...

ডরোথী দাশ বিশ্বাস


আমি জড়িয়ে আছি সোনা রোদের মতো
শিরশিরে বাতাসের মতো
রুপো গলানো নদীর মতো
ঝিরঝিরে বৃষ্টির মতো
মসলিনের মতো ফিনফিনে কুয়াশার মতো
তোমাকে ....

এ যাবৎকাল সবচেয়ে বেশি ভালোবাসা বোধ হয় তোমাকেই দিয়েছি।

এতো ভালোবাসা পেয়েও তুমি নিশ্চুপ, অবিচল।

তোমার হৃদয়পথ বেয়ে মনের বাঁকে বাঁকে 
মাইলের পর মাইল কত যে হেঁটেছি,
তার হিসেব নেই।

অভ্যর্থনা পেয়েছি, ক্রিপ্টোমেরিয়া, অরোকরিয়ার কাছে।

বিনোদনে নর্তকী তিস্তা চেল ঘিস লিস ....
মেলাস্ট্রোমার হাসিমুখ
  
স্বাধীনচেতা খোশমেজাজী বাতাসে পত্ পত্ করে উড়েছে লাল নীল হলুদ সাদা সবুজ প্রার্থনা পতাকা
প্রতি মুহূর্তে মনে করিয়ে দিচ্ছে আগুন বাতাস পৃথিবী ও জলের কথা।

রঙীন শোভার বিহ্বলতায় অপার মুগ্ধতা 
উত্তর দক্ষিণ পূর্ব পশ্চিম দিক নির্দেশে তোমার মনের উড়াল গলিপথে পথ হারানোর ভয় নেই।

এ এক আত্মিক আন্দোলন
সদর্থক বার্তাবহ।

মসের পশমিনা জড়ানো বৃক্ষ থেকে ঝুলে থাকা অর্কিডের দোলনায় দোল খায় পাহাড়ি ময়না

নীল সবুজে সমাবৃত আদিবাসী গ্রাম ...

তোমার বুকে ছড়ানো এমন হাজার সৌন্দর্য দাগ

ভালোবাসা যে অর্ঘ্য,
ভালোবাসতে হলে তোমার মতো এমন একটি স্থিতধী অবয়ব চাই।





উৎপল চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা

১.
তোমার শোক থেকে...
 
                               
তোমার শোক থেকে আমার শোকের দূরত্ব স্থির
এর জন্য কি আর কোনো বিজ্ঞাপণ প্রয়োজন?
ঢেউ ভাঙে আমার মেঘের গভীরে 
তোমার সব খরস্রোতা, তরঙ্গের মাতন
উত্তরাধিকারে আমরা তিনবার দেশত্যাগী
নিমিত্ত মাত্র সম্পর্কের বিশ্বাসে চিরকৃতজ্ঞ চোখ
তবুও ছিলো, গাছেদের সংসারে 
                         এমন নিসর্গ বেড়ে ওঠা
তোমার দু-গালের  নোনা জলে 
    কেবলই অতীত সংকেতের বুড়ো আঙুল
আমার সব পিছুটান, নিরুদ্দেশ গতি আর 
পাড় ভাঙা অনাদৃত আহ্বান
এত কিছুর পরও দেখেছি তোমার নক্ষত্র বিন্যাস
তোমার শোক থেকে আমার শোকের দূরত্ব 
শুনেছি এখন নাকি আলোকবর্ষে মাপা যায়



২.
বিসর্জন


যতটুকু ছায়া প্রয়োজন
শুকনো পাতা অথবা গাছের বাকলে
আমি তার শ্বাস ছিঁড়ে ঠিক ততটুকুই
বাতাসে রোদ মেশায় 
শীত আসছে আসছে করেও 
শয্যার সিক্ত শিশিরে এ যেন আঘ্রানের আকুল আকুতি 
আমি তার যৌবন ছুঁয়ে 
নীল নদী জলে স্বপ্ন ছুঁড়ে দেখেছি
অশ্বিনের পড়ন্ত আভা 
এখানে  শুকিয়ে আছে কুমারীর 
আধখোলা সোনালী চুল 
এখানেই মিশে আছে তার সমস্ত সংসার ধর্ম
তবুও সত্তা...............
নিরস পেটে জন্ম দেয় পৌরুষ 
তবুও সভ্যতা..............
কুমারীর জীভ কাটে 
মেরুদণ্ডের ভাঙা হাড় ঠেকে 
নিশ্চল পুরুষাঙ্গ 
চারিদিকে ঢাক বাজে 
কাসর আর শঙ্খ ধ্বনিতে দেবীর বোধন 
এবার শুধু বিসর্জনের অপেক্ষা



৩.
শব্দের জন্য


কতকাল শব্দের জন্য 
চিহ্ন এঁকেছি সহজপাঠে
কতকাল শূন্যতায় জমিয়েছি মেঘ
এমন রোদ আঁকা সময়ে
বাবা বাড়ি ফিরলে
কতবার স্বভাব বিরুদ্ধ
প্রশ্নের হাট বসিয়েছি বারান্দায়
এখন বৃষ্টি নামলে কপালে ভাঁজ
এখন শিশির শব্দে আক্ষেপ জীবন
মরা নদীটির পাড় ধরে 
শুকিয়ে যাওয়া ফুলের ঘেমো গন্ধে
আর কোনো ইতিবাচক শব্দ নেই
তবুও গুছিয়ে রাখি উড়ান
গুছিয়ে রাখি মেঘ রঙ
আর    দুচারটে নীরব মরুদ্যান



৪.
পথের চরিত্র


সিগন্যাল ভাঙার অপরাধে
আমি হেঁটেছি বহুদূর
খালি পা, জেব্রা ক্রসিং
ক্লান্তির আঁচলে পাশ ফিরলেই ঘুম
সিগন্যাল ভাঙার অপরাধে 
আমি আবিষ্কার করেছি 
পায়ের তলার মাটি
এমন হাসি উড়িয়ে ক্ষমা লেগে থাকা
ল্যাম্পপোস্টটির শ্রেণী চরিত্রে
আমার তিনটি বিকেল
জীবন্ত বসে দেখেছি নিষ্প্রাণের প্রেম
বিদেহী অলোটির যান্ত্রিক বিপর্যয়ে 
ধুলোমলিন আমার রঙ
কালপুরুষের সৌজন্যে ত্রিবর্ণ বাৎসল্য
সিগন্যাল ভাঙার অপরাধে 
আমি শেষ করেছি আমার 
                       পথের চরিত্র






দুটি হিপহপ কবিতা


সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়

১.
টা-টো-টে


ফোঁটা ফোঁটা জল,
বোঁটা বোঁটা ফুল।
ফোটা ফোটা চোখ তবু
ল্যাদে মশগুল।

খোঁটা খোঁটা নাক,
পোঁটা গোল গোল। 
ফটো ফটো ফোন দিয়ে
ছবি তোল, তোল!

ছোটা ছোটা ম্যান,
মোটা মোটা পেট। 
গোটা গোটা জীবনটা
মাথা হেঁট হেঁট....

নোটা-নোটা ভোট?
জোটা, জোটা জোট। 
চোতা-চোতা নোটগুলো
টুকে টুকে ফোট!

যা তো, যা তো, ভাগ!
খা তো, খা তো, ঢপ!
ফাটো ফাটো পেট পুরে
খা ঢপের চপ। 

আঁটোসাঁটো শার্ট,
খাটো খাটো লোক। 
খাটো খেটো বাবু তোর
মঙ্গল হোক। 

বাতোঁ বাতোঁ মেঁ
রাতও বিতে যায়। 
জাত ও পাত ও গেরুয়াতে
দেশটাকে খায়। 

মাটো মাটো ব্রেন। 
ঘাঁটা ঘোঁটা হাল। 
ছেঁটে ছেঁটে ঝাঁট, নিচে
কুচি কুচি বাল।



২.
হিপহাপ


খুচরোয় পাপ আছে
টাকাকড়ি ঝাপ আছে
চা-চুমুকে কাপ আছে
ঝোপেঝাড়ে love আছে
লোকশানে লাভ আছে
ফেয়ারের রাফ আছে 
বাবাদেরও বাপ আছে
ডাউনেরও আপ আছে
যারা যায় রেখে যায় ছাপ

ঘুঁসি ঘিপঘাপ আছে
সাতখুন মাফ আছে
টিকিটের হাফ আছে
সিঁড়ি-ভাঙা ধাপ আছে 
ছাদ-ঘেঁসা লাফ আছে
বরে অভিশাপ আছে
গরমের ভাপ আছে
বরফেরও তাপ আছে
কুমিরের অশ্রু-বিলাপ

বাড়িতে অভাব আছে 
আড়িতেও ভাব আছে 
মনে অনুতাপ আছে
সুসু পেচ্ছাপ আছে
ঘরে শীত ও তাপ আছে 
ফোনে ওয়াটস্যাপ আছে
খেজুড়ে আলাপ আছে
রাত্রে প্রলাপ আছে
বিছানায় ফোঁস করে সাপ

নিম্নতে চাপ আছে
চাপ হলে ঠাপ আছে
তলোয়ারে খাপ আছে
চোখা সংলাপ আছে
ঘেঁটে ছয়লাপ আছে
সুখে সন্তাপ আছে 
অচেনায় ঝাঁপ আছে
সময়ের মাপ আছে
বুক বুঝে ছেড়ে যায় হাঁফ






তৈরি একদিন হতেই হবে সবাইকে

অয়ন জোয়ারদার


আমরা দৌঁড়াইনি কখনও, হাঁটতে-হাঁটতে কতদূর এসেছি, ফেরার ভাবনা মাথায় আসেনি কখনো-
আটপৌরে চলনচর্যায় বোঝা যায়নি আমরা পাতা ঝরাতেও পারি!
রিভলবার ধরিনি কখনও কিন্তু স্বপ্নে বহুবার চালিয়েছি শত্রুর কানের পাশ দিয়ে-
শত্রু কে তা সবাই জানে, কিন্তু জানেনা কিভাবে ট্রিগার শক্ত করে স্বপ্নে স্বপ্নে শিখে নিতে হয় রাগ প্রকাশের কৌশল।
প্রেমিকাকে বুঝিয়ে দিতে হয় এই হল আমাদের ভয়ভাঙ্গা নরম মাটি।




অন্যপথ

উজ্জ্বল রায়


অজানা নৌকায় উঠে বসেছি। এই ছো-ঝুমুরিয়ার দেশে, ভাদু-টুসুর ঘাটে নৌকা বেঁধে বেপাত্তা অদেখা মাঝি। কতদিন হয়ে গেল, অযোধ্যা মোড়ের অর্জুন গাছের পাতা কতবার হলুদ আর কতবার সবুজ হয়েছে, গুনতে গুনতে ভুল করে ফেলেছি। এখানে সামনে বইছে রুখা কাঁসাই-কুমারী ধারা।

ও মাঝি, জংধরা লাঙল থেকে জাওয়া করমের গান শুনতে শুনতে ফুটে উঠছে অভুক্ত কাশফুল।





মুজিবর আনসারীর কবিতা

১.
বন্ধন, প্রিয় বন্ধন


এ-ও তো কম কিছু নয়
এই তোমার খড়ো চাল
এই শান্ত প্রেম আচ্ছাদনে এসে
ক্ষণিক বিশ্রাম

ডুগডুগি বেজে উঠছে দেখো
সাজগোজ করে
মাঠভর্তি রোদ্দুরের দিকে
এই যে পাড়ি দিচ্ছো
তুমি আর লাবণ্য তোমার
এ-ও তো কম কিছু নয়

বন্ধন, প্রিয় বন্ধন
কীভাবে জড়িয়ে ধরছে দেখো
কীভাবে আগলে রাখছে
মুক্ত করছে, ঠেলে দিচ্ছে  
মাঝেমধ্যে চুবিয়ে নিচ্ছে  
তোমাদের অনন্ত যাপনে

কী সুখের হাওয়া দিচ্ছে 
মেঘ এসে উঁকি মারছে  
ঘরে ফিরছো
অন্ধকার নেমে আসছে যখন
সাঁঝের তারাটি পেড়ে
গুঁজে দিচ্ছো তুমি ওর চুলের খোঁপায় 

আর কী চাইবার আছে বলো


২.
ওই যে আগুন জ্বলছে দাউদাউ


তুমি কি ওদেশে থাকো 
আমি আর কোনোদিন ওদিকে যাব না

ও দেশ বোঝেনা মন, গলা টিপে ধরতে জানে শুধু 
গাছ থেকে পেড়ে নেয় সমস্ত পাতা ফুল ফল

কোথাও ছায়াটি নেই, পাখিটি নেই
দাঁড়াবো কোথায়

কেবল আগুন জ্বলছে দাউদাউ ঘরে বাইরে
পথেঘাটে, ঝলসে যাচ্ছে শরীর সবার 

এই রাত বারোটা ছয়, হাতে হাত রেখে, দেখো
প্রতিজ্ঞা আমার

ওই যে আগুন জ্বলছে দাউদাউ 
আমি তার কোনোদিন ইন্ধন হবো না






পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের দুটি কবিতা

১.
শেকড়


এভারেস্টকে যদি বলি তার মাথায় চড়বো,
এভারেস্ট বুঝি কষ্ট দেবে সংঘাত দেবে!
কষ্ট করলেই কি সব সময় কেষ্ট মেলে?
সুদামা থাকলেও পঙ্গুর গিরি লঙ্ঘনের কথায় তার বিনয়

সমস্ত বিনয়ী ঠোঁটের কোণাই এইভাবে একদিন সাদা
থেকে বিব্রত সাদা। তাদের কি লাল টুকটুকে আপেল
খেতে দেয়া যায়? নিরন্তর আপেলের কথায় মাধ্যাকর্ষণ
এসে হাজির হলে তাকে বলবো, গিরিগোবর্ধনের মতো
এভারেস্টের ভারও তুলতে দিও বাবা
তার নিচে অনেক আবর্জনা

কে জানে তলায় তলায় হয়ত সেই সব বটবৃক্ষের 
শেকড়বাকড়ও আছে যাদের গৃহীরূপ দেখা যায়
অপরিকল্পিত লোকালয়ে



২.
ইতিকথার পরের কথা


সব রাত্রি কপট নয়, কোনো কোনো বান্ধবীর চোখের কপাট
থাকে খোলা সেই সব রাত্তিরে। তবু আমি কিছু কিছু অন্ধকারে
শত শোক-রহিত টিউশানি করে ফিরি। সিরাজউদোল্লার
কবরের মতো বহু বন্ধ বাড়ির নানা দিক থেকে
হাজার দুয়ার খুঁজে পাই নৈরাজ্যবশত

পৃথিবী টলটলায়মান হয় সেই সেই সন্ধ্যায়--
সবার চেয়ে ছোটো প্রাণ, কনিষ্ঠ মুখ পাই 
নিজেরই কাছে। তাদের সজীব অসহায়তাকে নিয়ে চলি 
ঝড়ঝঞ্ঝা কবলিত রাক্ষসীর সর্বোচ্চ স্তনবৃন্তটির নিচে,
কিন্তু জানি আমার করুণ স্বাদ হতে তাহার বাৎসল্য 
বহুদূরে সংস্থাপিত 

জানি এই মাটির 'পরেই মাত্র বসত করে
তামাম টিউশানিগুলি; তাদের নিয়ে বেঁচে থাকা যায়

এখন, অথবা ইতিকথার পরের কথায়...





ভ্রম

সুজন পণ্ডা


তীব্র শীতে যে কোনো আলোকেই
আগুন বলে ভ্রম হয়....।

তীব্র খিদের অনুভূতিতে
পিঁপড়ের ডিম থেকে উষ্ণ ভাতের ঘ্রাণ আসে।

ভ্রম হয়
ভ্রম হয় 

তুমি যতো বার বলেছ-
"আমি তো আছি...!"
আমি হয়েছি দ্বিধাহীন।
 
যতো বার আঙুল ছুঁয়েছো
মনে হয়েছে শিকড় আঁকড়ে ধরেছে মাটি..

সুতীব্র আকুতি থেকে আসে ভ্রম
ঠিক যেমন
উত্তপ্ত বালুকণায় মরীচিকা।





পিন্টু ভট্টাচার্যের কবিতা

১.
অমৌলিক ছাই


এক যুগ আনন্দ বা দুঃখ ছাড়া
পৃথিবীতে আর কিছু নেই 
বাকি সব অমৌলিক ঘৃণা ও লালসার ছাই 
তাই মাখে কেউ পরম তৃপ্তিতে 
মুখে দেয় নিহিত অপরাহ্ন 
 পিন্ড 
অলৌকিক সূর্যাস্তের নিচে মানুষের আনন্দ জনপদ 
দুঃখের সমকাল ওড়ে শুধু 
বাকিসব নিখিলের অমীমাংসিত অভিলাষ 
তাই বিকৃত ভ্রূণ কখনো প্রজাপতি হয়না 
যেভাবে সরল মৌলিক আঙুলে আমরা 
অসহায় অন্ধকার রচনা করেছি


২.
মেঘলা সবুজ বিকেল


এখন এই বিকেলে একটা সিগারেট খুব ইচ্ছে করে 
উদ্দেশ্যহীন কিছুটা পথ হাঁটা 
পথে পড়ে থাকা যাবতীয় অনর্থ 
গানের ওপারে তুমিই আমার তীব্র অনুভূতি 
আজ আকাশের রং অবনত মেঘলা সবুজ 

অমোঘ আচ্ছন্নতার ওপারে সোনালি হাওয়া 
একটা সিগারেট আজ খুব প্রিয় হয়ে পড়েছে 
ময়ূরের মতো সারা শরীর ভরিয়েছে সেই কামনা 
উদ্দেশ্যহীনতার ওপারে সেই নরম লিচু বাগান 
আমাদের জন্য দারুন উন্মাদনার বিষয়





জিহুড় : মা লক্ষ্মীর সাধ অন্ন উৎসব


                                তপন পাত্র



মানভূম-পুরুলিয়ার মানুষ শরৎ শেষের দিন অর্থাৎ আশ্বিন মাসের সংক্রান্তির দিনটিকে "জিহুড় দিন" বলে । নানান উৎসব-অনুষ্ঠান, ব্রত, পূজা-পার্বণের মধ্য দিয়ে এই আশ্বিন সংক্রান্তি উদযাপিত হয় । এদিন ফসলের দেবী মা লক্ষ্মীকে সাধভক্ষণ করানোর রীতি রয়েছে ।  দিনটি "নল সংক্রান্তি", "ডাক সংক্রান্তি" ,"শরধরা" , "ডাক সাঁকরাত" ইত্যাদি নামেও পরিচিত ।
                 জিহুড় কৃষিকেন্দ্রিক লোক উৎসব এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই । কিন্তু শব্দটির অর্থ কী ,  একথা কোনো বাংলা অভিধানে উল্লেখ নেই অর্থাৎ শব্দটি বাংলা অভিধানে নেই । সাধারণভাবে "জিউ" শব্দের সংক্ষিপ্ত রূপ "জি" । "জিউ" শব্দের অন্যতম অর্থ "জীবন"। তাহলে "জি" শব্দটিরও অর্থ দাঁড়ায় "জীবন"। আর "হুড়" শব্দটি দ্বারা বোঝায় "অনেকগুলির সমাবেশ"। "হুড়"কে "হ'ড়" বলারও রেওয়াজ আছে মানভূমে । তাই কেউ কেউ "জিহুড়"কে উচ্চারণ করে  -- "জিহ'ড়"। "হ'ড়" শব্দটির আবার মানভূমে একাধিক অর্থ রয়েছে । অবশ্যই একটি অর্থ হলো "গাদা" , "প্রচুর", "অনেক", "ঢের", "বহুৎ", "গু'টেক" আবার "থাক দেওয়া", "জড়ো করে গুছিয়ে রাখা" অর্থেও ব্যবহৃত হয় । শব্দটি ধানের আঁটি জড়ো করে রাখার ক্ষেত্রে,  কাঁচা বা পাকা ইঁট সারিবদ্ধ ভাবে জড়ো করে রাখার ক্ষেত্রে এতদঞ্চলের লোকভাষায় ব্যবহৃত হয়ে থাকে । তাহলে লৌকিক ভাষার দিক থেকে জিহুড় শব্দের ভাবার্থটি হল --অনেকগুলি প্রাণ বা জীবন একত্রিত হয়ে থাকা । বর্ষায় যে ধানের চারা বসানো হয়েছিল , শরতের শেষদিন পর্যন্ত সেই ধানগাছ যুবতী, গর্ভবতী ।

                    কাচথোড় ধানে সাদা দুধ জমে উঠছে, সারিবদ্ধভাবে সজ্জিত হয়ে আছে মায়ের পেটে শিশুর মতো গর্ভস্থ ধানগুলি । আর ক'দিন পরেই মা লক্ষ্মী প্রসব করবেন । আমাদের ভারতীয় দৈবীভাবনায় এবং লোকায়ত দেবী ভাবনাতেও দেবী ঘরের কণ‍্যা, আদরিণী দুলালি। তাই দশপ্রহরণধারিণী , দনুজদলনী মা দুর্গা হয়ে যান আমাদের মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত , গরিব বাঙালি পরিবারের ঘরের মেয়ে উমা । 
            
                      একারণেই ছন্দের জাদুকর কবি সত্যেন্দ্রনাথ বলেছেন ---
 "দেবতারা মোরা আত্মীয় জানি আকাশে প্রদীপ জ্বালি ,
 আমাদের এই কুটিরে দেখেছি মানুষের ঠাকুরালি।"
       আর বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ বললেন--- 
      "দেবতারে প্রিয় করি, প্রিয়েরে দেবতা"।

               সমাজ-সংসারে যেমন গর্ভবতী কন্যাকে প্রাক্ প্রসবকালে, গর্ভের সাত মাস বা ন'মাসের সময় ঘটা করে সাধভক্ষণ করানোর রীতি রয়েছে, ঘরের মেয়ে মালক্ষ্মীকেও সেই সংস্কার থেকে বাদ দিতে পারেনি সাধারণ কৃষিনির্ভর লোকসমাজ । বাংলা কাব্য কবিতায় অলংকারের ডালায় "সমাসোক্তি" নামে একটি অলংকার আছে । অচেতন বিষয়ের উপর চেতন বিষয়ের ধর্ম আরোপিত হলে এই অলংকারের সৃষ্টি হয় । এই অঞ্চলের মানুষের জীবনধারাও কাব্যসুষমামণ্ডিত । তাই সারা বছর জুড়ে নানান অচেতন বিষয়ের উপর সচেতন প্রাণের আরোপ করে অসংখ্য উৎসব উদযাপিত হয় । এগুলি কৃতজ্ঞতাবোধের পরিচায়ক ; স্নেহ-ভালোবাসা, প্রেম- প্রীতি , আদর-আপ্যায়ন ইত্যাদি হৃদয়ের সূক্ষ্ম মধুবৃত্তির পরিচায়ক।

                   আশ্বিন সংক্রান্তির আগমনের কয়েকদিন পূর্ব থেকেই জিহুড়ের প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায় । খামারের ঘাস ,ঝোপঝাড় কোদাল, কুড়ুল দিয়ে কেটে,চেঁছে পরিষ্কার করা হয় ।  প্রয়োজন হলে লাঙ্গল দিয়ে মাটিকে জলে ভিজিয়ে মই দিয়ে সমতল করা হয় । তারপর লাল মাটি ও গোবর দিয়ে গু'ছাটি দেওয়ার পালা । স্থানীয় ভাষায় এর নাম "খামার বাঁধা" । কৃষিকাজে বলদ এর অবদান যথেষ্ট । তাই এ সময় গরুর শিঙে সরষের তেল মাখিয়ে দেওয়া হয় । খামার বাঁধা হয়ে গেলে খামারে ডালপালার বেড়া দিয়ে একটি নির্দিষ্ট স্থানে দরজা রেখে ডালপালা ও দড়ি দিয়ে অস্থায়ী আগুড়(কপাট) তৈরি করা হয়। দরজার দু'পাশে রাখা হয় মাটির ভাঁড়; সেই ভাঁড়ে থাকে জল এবং আম পল্লব ,একটি করে কড়ি, তামা পয়সা ,একটি নতুন ঝাঁটা ও এক মুঠো দূর্বাঘাস ।

                  সংক্রান্তির দিন মা-বোনেরা আতপ চালের গুঁড়ি জলে গুলে সাদা দুধের প্রতীক হিসাবে এক ধরনের তরল তৈরি করে দেয় । পরিবারের পুরুষ সদস্যরা সেই  সাদা রঙের গুঁড়ি জল ধানক্ষেতে,  গৃহের নানা আসবাবপত্রে , রান্নাঘরের বাসনপত্রে এবং খামারে ও গবুর কুড়ে ছড়িয়ে দেয় । খামারে ,বাড়ির উঠোনে এবং গৃহের অভ্যন্তরে যেখানে লক্ষ্মীর ঘট বা লক্ষ্মীর হাঁড়ি থাকে সেই সকল স্থানে খড়িমাটি গুলে আলপনা দেওয়া হয় । আলপনার মাঝে মাঝে থাকে একটি সিঁদুরের লাল টিপ ।  ঘরের সদর দরজা থেকে লক্ষ্মীর হাঁড়ির স্থান পর্যন্ত মা লক্ষ্মীর পদচিহ্ন আঁকা হয় । 

                এই আলপনা দেওয়া ও লক্ষ্মীর পদচিহ্ন অঙ্কনের সময় মেয়েরা মনে মনে বিড়বিড় করে  সাধারণ বাংলা ভাষায় লৌকিক মন্ত্র উচ্চারণ করে , যা অনেকটাই ব্রতপ্রার্থনার মতো---

           "জাগো গো, জাগো মা দেবী
            জাগো লক্ষ্মী ঠাকুরাণী,
            বন্দনা জানাই গো মা     
            বাগবাদিনীর ভগিনী ।
            অর্চনা করি গো তোমায়
            আবাহন করি , 
            আরতি করি গো তোমায়
             চরণে ধরি । 
            অচলা হয়ে থাকো মাগো
            আলোকিত করে ,
            আমাদের ছোট-মোটো
            এই কুঁড়ে ঘরে ।
            জাগো গো, জাগো মা দেবী
            লক্ষ্মী ঠাকুরাণী,
            আমাদের করো কৃপা
            ওগো নারায়ণী ।"

                    জিহুড় সংক্রান্তি বা নল সংক্রান্তির দিন গ্রামে গ্রামে উৎসবের সাজো সাজো রব । সকালবেলায় গ্রামের কোন বিষ্ণু মন্দির , শিব মন্দির অথবা অন্য কোন দেবস্থান কিংবা গাঁয়ের মোড়লের খোলা মাঠের মতো উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে গ্রামের সকলে শরকাঠি বাঁধতে আসে । বিভিন্ন পরিবারের নিজের নিজের প্রয়োজন মতো শরগাছগুলিতে এবং একটি শাল ডালে পুঁটলি বা বরজ বাঁধা হয় ।

                    গ্রামের মধ্যে কয়েকজন উদ্যোগী যুবক মানকচু, ওল, চিড়চিড়ি, কুমড়া, অঙ্গাডঙ্গা,কাঁচা হলুদ, ঘেঁটু পাতা কুচি কুচি করে কেটে জড়ো করে । গ্রামের প্রায়  সকল  পরিবার থেকে লোকজন এসে সরকাঠি ও শালডালের মাঝামাঝি জায়গায় বট পাতা, বচ পাতা অথবা শালপাতায় ঐ সমস্ত কুটে রাখা দ্রব্যগুলি নিয়ে তার সাথে অল্প পরিমাণ ধান ও সরষে দানা মিশিয়ে পুটলি করে চেলাট বা পাট অথবা তা থেকে তৈরি শন দিয়ে বেঁধে দেয় । বাঁধা হলে নিজের নিজের বাড়িতে ফিরে যায় ।

                     প্রত্যেক বাড়ির একজন পুরুষ মানুষ সংক্রান্তির আগের দিন থেকে নিরামিষ ভোজন করে শুদ্ধসত্ত্ব হয়ে থাকেন । এদিন সকাল সকাল স্নান সেরে ধুতি ও সাদা সেন্ডো গেঞ্জি পরে গায়ে নামাবলি , নিদেনপক্ষে গেরুয়া অথবা লাল রঙের গামছা গায়ে নিয়ে ওই বিশেষ পুঁটুলি বাধা শরকাঠি ও শাল ডাল নিয়ে বা'দ, বহাল ও কানালির নির্দিষ্ট খেতে গিয়ে সেই সকল ক্ষেতের ঈশান কোণে অথবা পশ্চিম দিকের আ'ড়কোল থেকে পূর্ব দিকে মুখ করে একটি নির্দিষ্ট স্থানে মান পাতার উপরে মা লক্ষ্মীর উদ্দেশ্যে তৈরি করে নিয়ে যাওয়া সাধ অন্ন নিবেদন করা হয় । সাধ অন্নের মধ্যে থাকে দুধ দিয়ে ভেজানো আতপ চাল, চিনি, ছোট ছোট আঁখ খন্ড, পাকা মাদাল, আদার টুকরো ইত্যাদি । এই সমস্ত উপাদানে প্রস্তুত দ্রব্যের নিবেদনে  ধান গাছের পুষ্টির সহায়ক হিসেবে ক্ষেতের কোন উর্বরতা বৃদ্ধি পাবে না জানি, কিন্তু এর মধ্যে রয়েছে এক অবিচ্ছেদ্য বন্ধন ও ভালোবাসার টান এবং কৃতজ্ঞতা বোধ । এই নৈবেদ্য নিবেদনের পর কৃষক মা লক্ষ্মীর অর্থাৎ কাচথোড় ধানের পালাগুলির উপর শর ডালের বাতাস দিতে দিতে বলে ---

      "ওল গোল গোল মানের পাত,
      ভোজ মা লক্ষ্মী দুদু ভাত।
       লোকের ধান আলথাল,
       আমার ধানে শুধুই চাল ।"

                আবার কোন কোন অঞ্চলের কৃষক এ সময় বলে ---

           " ওল,সরিষা, কাঁকু'ড়, নাড়ি,
             যারে পোকা ধানকে ছাড়ি।
             এতে আছে শুকতা ,
             ধান ফলবে মুক্তা ।
             এতে আছে হলদি ,
           ধান ফলবে জলদি । 
           এতে আছে ঝোটপাট 
           সব পোকার মাথা কাট ।"

                 এ প্রসঙ্গে একটি কথা উল্লেখ করার দরকার রয়েছে । মূলত হিন্দু বর্ণের কৃষকদের এই অনুষ্ঠানের অনুকরণে কোন কোন গ্রামের মুসলিম কৃষকরাও মা লক্ষ্মীর সাধ ভক্ষণ এর এই উৎসব উদযাপন করে থাকেন । একই রকম আচার বিধি পালন করেন । তাঁরা জমিতে এই শরকাঠি স্থাপনের সময় বলেন ----

        " হিন্দু ভাইয়া যোহি বোল,
          হামরা ভি ওহি বোল ।
          ধান ফৌল ,
          ধান ফৌল ‌।"

               মা লক্ষ্মীকে সাধভক্ষণ করাতে যাবার ও আসার পথে কৃষক মুখে কথা বলেন না । যাতায়াতের পথে কিশোর, বালকেরা নানান ছড়া কেটে তাঁকে হাসানোর এবং কথা বলানোর চেষ্টা করে । তবু তাঁকে নির্বাক থাকতে হয় । সে সময় তাঁর হাসতে নেই , কথা বলতে নেই ।

             ক্ষেতের মতো খামারের মধ্যস্থলে, গোবর কুড়ে এবং নিজেদের পুকুর থাকলে পুকুর ঘাটের একপাশে সরকাঠি পুঁতে দেবার রেওয়াজ আছে  । সবশেষে কৃষক যখন বাড়ির সদর দরজায় এসে পৌঁছান, তখন কৃষক বউ তাঁর উদ্দেশ্যে ঘুরেফিরে তিনবার একটিই প্রশ্ন করেন এবং তিনি সেই প্রশ্নের উত্তর দেন ।
      প্রশ্ন: মা লক্ষ্মী কী ব'লল ?
              উত্তর: খামার খোলা চাঁছতে ব'লল ।
  প্রশ্ন: মা লক্ষ্মী কী ব'লল ?
             উত্তর :বড় ,বিচাল পাকাতে ব'লল ।
   প্রশ্ন: মা লক্ষ্মী কী ব'লল ?
            উত্তর: আউড়ি-মরাইয়ের বেদী বাঁদতে ব'লল ।
    
                স্থান ভেদে অবশ্য প্রশ্নের ও উত্তরের ইতরবিশেষ লক্ষ্য করা যায় । তবে মূল ভাবনা একই ।
           
                এই প্রশ্নোত্তর পর্বের পর কৃষক-বধূ জলধারা দিয়ে লক্ষীর ঘট যেখানে পাতা রয়েছে ধীরে ধীরে সেখানে এগিয়ে যান । পিছনে পিছনে চলেন কৃষক এবং সেখানেই একটি শরকাঠি ও শালডাল এবং শেষ যে ক্ষেতে শরকাঠি প্রোথিত করা হয়েছে তার আল থেকে কেটে আনা কিছু ঘাস যেগুলি নামাবলি অথবা নতুন বস্ত্রে ঢেকে মা লক্ষ্মীর ঘটের কাছে নামিয়ে দিয়ে সকলে মিলে ভূমিষ্ঠ প্রণাম জানান । সেখানে প্রদীপ জ্বলে, শঙ্খধ্বনি ও উলুধ্বনি করা হয় ।

                     পরিবারের যে সদস্য এই কর্ম সম্পাদন করেন তিনি সেদিন সম্পূর্ণ নিরামিষ ভোজন করেন । সাধারণত আলু পোস্ত, নিরামিষ ডাল, ভাত , ওল সেদ্ধ এবং ২১ টি শাকের পাতা দিয়ে শাক রান্না করে খাওয়ার রীতি আছে । এই ২১ টি শাক হল --- কুলেখাড়া, কলমি, কুদ্রুম বা কুদ্রুং, কালমেঘ , কাল কাসুন্দে, নিম, সরিষা, কেঁউ , ওল , জয়ন্তী, সজনে , গুলঞ্চ , ভাঁটপাতা, শুশনি , বাসক ,থানকুনি , হিলঞ্চ, পলতা , বেথো এবং ব্রাহ্মী । ২১ রকম জোগাড় করতে না পারা গেলে অন্তত ন'রকম জোগাড় করতেই হয় ।

                  এই নল সংক্রান্তি উৎসব এর সাথে আর একটি বিশেষ ধরনের উপাচারও পালন করা হয় । এটি হলো "আলুই খাওয়া" । যে খাবার তৈরীর প্রস্তুতি নিতে হয় সংক্রান্তির আগের দিন সন্ধ্যেবেলাতেই । একটি চুবড়িতে নিমপাতা , চাল কুমড়ার ডাঁটা, কালমেঘ , নটে শাক , অঙ্কুরিত তাল বীজের শাঁস  , পুঁই লতের ডগা এবং কাঁচা হলুদ । এগুলির সাথে কিছু আতপ চাল । জিহুড়ের দিন এই সবকিছু বেটে প্রস্তুত করা হয় "আলুই" । পরিবার সকলে এটি মা লক্ষ্মীর প্রসাদ হিসেবে গ্রহণ করেন । 

               এই উৎসবকে ঘিরে একটি সংস্কার রয়েছে আজও । অতি বৃদ্ধরা বলেন জিহুড় সংক্রান্তির রাতে হালকা হলেও বৃষ্টিপাত হবেই এবং সেই বৃষ্টির জল মাথায় নিলে, মুখে নিলে সৌভাগ্য লাভ হয় । এটি নিছক সংস্কার নাকি বলতে চাওয়া হচ্ছে মা লক্ষ্মীর সাধান্নের সময়,  যখন কাছথোড় ধান , তখন বৃষ্টিপাত নিতান্ত জরুরি ,-তা কে জানে ? যেমন শর গাছকে এই লক্ষ্মী বন্দনার উপাদান হিসাবে গ্রহণের কারণ , এর মধ‍্যে শরের  মতো প্রচুর ধান ঝাড় উৎপাদনের বাসনা লুকিয়ে আছে ।

                   জিহুড়ের দিন লক্ষ্মী বন্দনার পাশাপাশি আরেকটি পূজার কথা উল্লেখ করতেই হয় । সেটি হল মনসা পূজা । মানভূম-পুরুলিয়ায় ১৩ জ্যৈষ্ঠ, রোহিনীর দিন সর্পদেবী মনসার পূজার সূচনা । কেননা সেই সময় থেকে সাপেরা  গর্ত থেকে বেরিয়ে আসতে শুরু করে । আর শরৎ পেরিয়ে হেমন্তের আগমনের সাথে সাথে তারা শীতঘুমে চলে যায় । সর্পের আতঙ্ক কমে যায়, মনসা পূজাতেও ছেদ পড়ে । কোথাও কোথাও আশ্বিন সংক্রান্তির মনসা পূজা শ্রাবণ সংক্রান্তির মনসা পূজার মতোই জাঁকজমক সহকারে উদযাপিত হয় । সমস্ত দিক বিচার বিশ্লেষণ করলে বেশ বোঝা যায় কৃষিভিত্তিক মানভূমের জীবনে শরতের শেষ দিনটির গুরুত্ব অপরিসীম ।

                          
________________________________________________

ঔপন্যাসিক দীপংকর রায়ের ধারাবাহিক উপন্যাস---
"জলশ্যাওলার বিরহকথা" --- এবার পঞ্চম পর্ব
________________________________

জলশ্যাওলার বিরহকথা

দীপংকর রায়


            যে পথটি গতিদের বাড়ির সঙ্গে 'হৃষিকেশ ভবনের ' সংযোগ রক্ষা করে চলেছে, সেই কাঁচা রাস্তাটিই এবারে পিচ হয়ে গেল। কত দূরে গেছে সেই পথ ? শুনেছে সামনে অনেকটাই এগিয়ে গেছে , যে পথের ঢাল মেঠো আলশুদ্ধ  প্রথম সকালের ছবি তুলেছিল জয় প্রথম দিন এসেই----- সেই পথ যদিও এখোনো তেমনই আছে, শুধু তার বুকের উপরের প্রধানতম পথটিই এবারে পাকা হয়ে গেছে। পথিককে সে পথেই টর্চ জ্বেলে গতির ব্যাঙ্কের উচ্চ পদস্থ দাদা সমীর এগিয়ে দিতে এসেছে 'হৃষিকেশ ভবনের 'দিকে। টর্চের মৃদু আলো। ব্যাটারি হয়তো শেষের পথে তাই টিমটিমে হয়ে গেছে আলো, কখনো জ্বলছে কখনো জ্বলতে জ্বলতেই নিভে যাচ্ছে। সমীর মামা বার বার ঝাঁকাঝাঁকি করে ফের সেটাকে জ্বালাবার চেষ্টা করছে। জ্বলতে চাইছে না বলে সে নানা ভাবে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করছে। পথিক তাই তাকে দেখে বলছে, ছেড়ে দেন না মামা, ও আর জ্বলতে চাইছে না যখন তখন আর দরকার কি ? চলেন না এমনিই যেটুকু দেখা যাচ্ছে তাতেই পথ চলা যাচ্ছে তো, খামোখা ও বেচারাকে আর ঝাঁকিয়েঝুঁকিয়ে বিরক্ত করে কী লাভ? 
         ওবাড়ি থেকে বেরিয়েই পথিক সিগারেট ধরিয়েছিল। তারপর টর্চের এই অবস্থা দেখে থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। ওপাশে কাটা ফসলের যে মাঠ আছে তারও ওপাশে দূরে চাঁদকে উঠে যেতে দেখা গেছে। ক্ষেতের উত্তর পাশে  আরও পড়ুন



আমাদের বই








সম্পাদক : উত্তম মাহাত
সহায়তা : অনিকেতের বন্ধুরা
অলঙ্করণের  ছবি : সন্দীপ কুমার, কল্পোত্তম
যোগাযোগ : হোয়াটসঅ্যাপ - ৯৯৩২৫০৫৭৮০
ইমেইল - uttamklp@gmail.com



মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ছবি প্রদর্শ-শালা ।। আলোকচিত্র ।। মোহন পরামানিক

ছবি প্রদর্শ-শালা ।। আলোকচিত্র ।। শঙ্কর মন্ডল

ছবি প্রদর্শ-শালা ।। আলোকচিত্র শিল্প ।। মুকেশ কুমার মাহাত